ঢাকা ০৪:৪০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
বালাগঞ্জের হাফিজ মাওলানা সামসুল ইসলাম লন্ডনের university of central Lancashire থেকে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করলেন বালাগঞ্জে সাংবাদিকদের সাথে উপ-নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হাজী রফিক আহমদ এর মতবিনিময় দেওয়ানবাজার ইউপি চেয়ারম্যান নাজমুল আলমের পক্ষ থেকে বন্যার্তদের মাঝে খাবার বিতরণ জনকল্যাণ ডেভেলপমেন্ট এসোসিয়েশন ইউকের পক্ষ থেকে উপহার সামগ্রী বিতরণ প্যারিসে অনুষ্ঠিত হলো, ‘রৌদ্র ছায়ায় কবি কন্ঠে কাব্য কথা’ শীর্ষক কবিতায় আড্ডা ফ্রান্স দর্পণ – কমিউনিটি-সংবেদনশীল মুখপত্র এম সি ইন্সটিটিউট ফ্রান্সের সুধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত বিএনপি চেয়ারপারসনের “স্পেশাল এসিস্ট্যান্ট টু দ্য ফরেন এফেয়ার্স” উপদেষ্টা হলেন হাজি হাবিব ইপিএস কমিউনিটি ফ্রান্সের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ‘ফেত দ্যো লা মিউজিক ২০২৪ তরুণ উদ্যোক্তা মাসুদ মিয়া-আয়ুব হাসানের যৌথ প্রয়াসের প্রতিষ্ঠান পিংক সিটি

বিত্তশালীদের ফ্রান্সকে ‘জনগণের রাষ্ট্র’ বানাতেই ইয়োলো ভেস্ট আন্দোলন?

  • আপডেট সময় ০৮:৪৪:৩৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৯ জানুয়ারী ২০১৯
  • ৩০০ বার পড়া হয়েছে

Warning: Attempt to read property "post_excerpt" on null in /home/u305720254/domains/francedorpan.com/public_html/wp-content/themes/newspaper-pro/template-parts/common/single_two.php on line 117

জ্বালানি তেলের ওপর ২০ শতাংশ কর বৃদ্ধির সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত বছর নভেম্বরে রাস্তায় নামে ফরাসি জনতা। ‘ইয়োলো ভেস্ট’ পরিচয়ে সংগঠিত ওই বিক্ষোভ একদিকে সহিংস হতে থাকে, অন্যদিকে নতুন নতুন দাবির সমন্বয়ে রূপ নিতে থাকে আন্দোলনের। এক পর্যায়ে জ্বালানি তেলের কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার পাশাপাশি অবসরভাতা ও ওভারটাইম থেকে কর প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। ন্যূনতম মজুরিও বাড়িয়েছেন তিনি। তা সত্ত্বেও রাস্তা ছাড়েনি ফরাসি জনতা। এর নেপথ্য কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে যে বিক্ষোভের সূচনা তা রূপান্তরিত হয়েছে সুদীর্ঘকালের অর্থনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে ফ্রান্সের সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র জনগণের আন্দোলনে। বিত্তশালীদের পক্ষে থাকা ফ্রান্সের অর্থনৈতিক বাস্তবতার বিরুদ্ধে ‘ইয়োলো ভেস্ট’ ব্যানারে সংগঠিত ফরাসিরা নতুন ধারার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ডাক দিয়েছেন। সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মধ্য দিয়ে তারা এমন এক ‘জনগণের রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নকে সামনে এনেছেন, যার চরিত্র হবে ‘কল্যাণমূলক’।
ফ্রান্সের মোটরযান আইন অনুযায়ী, বেশি আলো প্রতিফলিত করে এমন এক ধরনের বিশেষ নিরাপত্তামূলক জ্যাকেট গাড়িতে রাখতে হয় চালকদের। এর রঙ সবুজাভ হলুদ (ইয়োলো)। আন্দোলনকারীরা এই জ্যাকেট (ভেস্ট) পরে বিক্ষোভের সূচনা করেছিল বলে আন্দোলনটি পরিচিতি পায় ‘ইয়োলো ভেস্ট’ নামে। এই আন্দোলনের কোনও ঘোষিত কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নেই। গত নভেম্বরে শুরু হওয়া তাদের কর্মসূচিতে উত্তাল হতে শুরু করে প্যারিসসহ ফ্রান্সের বড় বড় সব শহর। জ্বালানি তেলের ওপর কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে সেইসব মানুষ, অর্থনৈতিক চাপে যারা এমনিতেই পর্যদুস্ত।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ফ্রান্সের চলমান আন্দোলনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক বঞ্চনার ইতিহাস। বিত্তশালীদের সুবিধা অনুযায়ীনীতি প্রণয়ন এবং অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়া মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবীদের উপেক্ষার মতো ঘটনা থেকে সৃষ্ট ক্ষোভ এই আন্দোলনে বারুদের ভূমিকা নিয়েছে। আন্দোলনকারীরা ধনীদের আরও ধনী করে তোলার রাষ্ট্রীয় নীতির বিলোপ চায়। গত শনিবারেও (০৫ জানুয়ারিও) উত্তাল বিক্ষোভে তাই সরকারি ভবন আর বিত্তশালীদের অঞ্চলকে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে দেখা যায়। পুলিশের সঙ্গে অনেকগুলো শহরে তাদের সরাসরি সংঘর্ষ হয়েছে। এক পর্যায়ে তারা প্যারিসে মন্ত্রণালয় ভবনের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। বিত্তশালীদের বসবাস, এমন একটি এলাকায় গিয়েও তারা রাস্তায় থাকা মোটরসাইকেল ওগাড়ি ভাঙচুর করেছে। রাস্তায় থাকা ব্যারিকেডে জ্বালিয়েছে আগুন।

গত বছর ১০ ডিসেম্বর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দেন। জ্বালানির কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের পাশাপাশি অবসরভাতা ও ওভারটাইমের অর্থের ওপর থেকে কর প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন ম্যাক্রোঁ। সেই সঙ্গে নূন্যতম মজুরি সাত শতাংশ বৃদ্ধিও করেন। উদ্যোক্তাদের বছর শেষে করমুক্ত বোনাস দেওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি তিনি অভিবাসীদের নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে আলোচনার আশ্বাস দেন। তা সত্ত্বেও থামছে না আন্দোলন। আল-জাজিরায় প্রকাশিত এক কলামে ফরাসি সাংবাদিক ও লেখক রকহায়া ডিয়ালো মন্তব্য করেছেন, জ্বালানি কর একটি উপলক্ষ মাত্র। সাধারণ মানুষের মূল ক্ষোভ রাষ্ট্রের কাছে অচ্ছ্যুত হয়ে পড়া নিয়ে। ক্ষোভটি সম্পদের অসম বণ্টন ও বৈষম্য থেকে উদ্ভূত। বিত্তশালীরা যেখানে হ্রাসকৃত করের সুবিধা ভোগ করছে , সাধারণ মানুষ সেখানে জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ যোগাড়ে হিমশিম খাচ্ছে।

১৯৮৩ সাল থেকে তৎকালীন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতেরা সেবাখাতে ব্যয় সংকোচন নীতি অনুসরণ করতে শুরু করেন। পরবর্তীতে সেই ধারাই কমবেশি সবগুলো ফরাসি সরকার অনুসরণ করেছে। তারা ক্রমেই ফ্রান্সকে একটি ‘কল্যাণ রাষ্ট্রের’ ধারা থেকে দূরে নিয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফ্রান্সের মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষ। ক্রমেই তারা ডান-বাম উভয় পক্ষের প্রতি বিশ্বাস হারাতে থাকে। ফ্রান্সের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বিত্তশালী শ্রেণির পাহারাদার হিসেবে চিনতে থাকে তারা। এমন প্রেক্ষাপটে ২০১৭ সালে ‘নতুন বিশ্ব গড়ার’ প্রত্যয় ঘোষণা দিয়ে নতুন দলের আত্মপ্রকাশ ঘটান এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। এককালে রথচাইল্ডদের বিনিয়োগ ব্যাংকার ও পরে সাবেক প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাদের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ম্যাক্রোঁ যখন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হন তখন ফরাসিদের অনেকেই তাকে নতুন প্রজন্মের রাজনীতিবিদ হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। ডানপন্থীদের ক্ষমতায় যাওয়া ঠেকাতে তার বিজয় প্রত্যাশিত ছিল ফ্রান্সের উদারপন্থীদের কাছেও। তবে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পর ‘নতুন ধারার রাজনীতি’র প্রতিশ্রুতি দানকারী প্রেসিডেন্টের বিষয়ে মোহভঙ্গ হতে থাকে ফ্রান্সের সাধারণ মানুষের।

২০১৭ সালে ম্যাক্রোঁ বলেছিলেন, ট্রেন স্টেশনগুলো এমন জায়গা যেখানে সফল হতে পারা মানুষ ও কোনও কিছুই হয়ে উঠতে না পারা মানুষদের একসঙ্গে দেখতে পাওয়া যায়। ২০১৭ সালের অক্টোবরে অ্যালুমিনিয়াম কারখানার অসন্তুষ্ট শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলার তিনি মন্তব্য করেছিলেন,‘বিশৃঙ্খলা তৈরীর বদলে আপনাদের উচিত অন্য কোথাও গিয়ে দেখা, এর চেয়ে ভাল চাকরি পেতে পারেন কিনা।’ ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি একজন বেকার ফরাসিকে বলেছিলেন, ‘একটু খোঁজাখুঁজি করলেই কাজ পেতে পারতেন। আমি তো যেখানেই যাই, সবাই বলে নিয়োগ দেওয়ার মতো লোক পাচ্ছি না।’ সাধারণ মানুষের প্রতি সহানুভূতির অভাব ও বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান স্বার্থের সহায়ক নীতি প্রণয়ন করার প্রবণতা দেখে ফরাসিদের অনেকের এখন ধারণা হয়েছে, ম্যাক্রোঁ একজন উদ্ধত রাজনীতিবিদ যিনি শুধু ধনী ও শক্তিশালীদের বন্ধু।

আল-জাজিরায় প্রকাশিত এক কলামে ফরাসি সাংবাদিক ও লেখক রকহায়া ডিয়ালো মন্তব্য করেছেন, ম্যাক্রোঁ ঠিক সেরকম অর্থনৈতিক নীতিই অনুসরণ করে গেছেন, আশির দশক থেকে তার পূর্বসূরিরা যে নীতি অনুসরণ করেছেন। সেই নীতি যেমন ফ্রান্সের সবচেয়ে দরিদ্রদেরই ভুগিয়েছে, তেমনি ধনীদের আরও ধনী হতে সহায়তা করছে। তার মতে, ইয়োলো ভেস্ট আন্দোলন শুধুমাত্র জ্বালানি কর বৃদ্ধির প্রতিবাদে হওয়া আন্দোলন নয়। এ আন্দোলনের দাবি সামাজিক ন্যায় বিচার। মনের ভেতর তীব্র মাত্রায় অসন্তুষ্টি থাকা ফ্রান্সের সাধারণ মানুষ মনে করে, তারা এমন একবিশ্বের হেরে যাওয়া মানুষ, যে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করে আন্তর্জাতিক অভিজাতরা।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টে প্রকাশিত নিবন্ধে ফরাসি বিশ্লেষক ও অ্যাকিটিভিস্ট অ্যারলি ডায়নারা লিখেছেন, শুধু অর্থনৈতিক বঞ্চনার প্রতিবাদ নয়, ফরাসি আন্দোলনকারীরা রাষ্ট্র পরিচালনায় চায় আরও বেশি অংশগ্রহণ, চায় আরও বেশি নীতি নির্ধারনী ক্ষমতা। ইয়োলো ভেস্ট আন্দোলন শুধুমাত্র অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতিবাদই নয়, একইসঙ্গে তা গণতন্ত্রের দাবিতে হওয়া আন্দোলনও। নীতি প্রণয়নে আরও বেশি মাত্রায় অংশগ্রহণের সুযোগ ও নিজেদের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে ফিরে পেতে রাস্তায় নেমেছেন আন্দোলনকারীরা।

আল জাজিরাতে রকহায়া ডিয়ালো লিখেছেন, জাতীয় ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা থেকে শুরু করে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা করার মতো যেসব সহিংস আচরণ আন্দোলনকারীদের করতে দেখা গেছে, তার পেছনে রয়েছে তাদের নিজেদেরই সহিংসতার ভুক্তভোগী হওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস। তারা যে সহিংসতার ভুক্তভোগী, তা দৃষ্টির আড়ালে থাকা এক নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। সে সহিংসতা উপেক্ষিত হওয়ার, অবিচারের শিকার হওয়ার। বেকারত্ব, বঞ্চনা ও দারিদ্রে নিত্যদিন হেনস্থা হওয়া সাধারণ ফরাসিদের ক্ষোভ কাজ করেছে ইয়োলো ভেস্ট আন্দোলনের পেছনে।

রকহায়া ডিয়ালো দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের নিবন্ধে লিখেছেন, ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতিতে ম্যাক্রোঁকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে আর কোনও পথ খোলা নেই বলে মনে করছেন ফরাসিরা। রাজপথে আন্দোলনকারীদের মিছিল ও অবস্থান গ্রহণ এখন আবর্তিত হচ্ছে জনগণের দ্বারা এমন শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করার দাবিতে যা সত্যিকার অর্থে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবে, সংহত করবে জনগণের ক্ষমতা। যে ক্ষমতা কাঠামো পুরাতন আইন বাতিল করতে পারবে, নতুন আইন প্রস্তাব করতে পারবে, সংবিধান সংশোধন করতে পারবে, প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে এমপি-মেয়র পর্যন্ত যে কোনও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করতে পারবে, জনগণের দ্বারা প্রস্তাবিত সেরকম এক ক্ষমতা কাঠামোর উদ্বোধনের জন্য আন্দোলনকারীদের রাস্তাতেই থাকতে হচ্ছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

লক ডাউন পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় ফ্রান্সে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি

যুক্তরাজ্যে করোনার মধ্যেই শিশুদের মাঝে নতুন রোগের হানা

বালাগঞ্জের হাফিজ মাওলানা সামসুল ইসলাম লন্ডনের university of central Lancashire থেকে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করলেন

বিত্তশালীদের ফ্রান্সকে ‘জনগণের রাষ্ট্র’ বানাতেই ইয়োলো ভেস্ট আন্দোলন?

আপডেট সময় ০৮:৪৪:৩৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৯ জানুয়ারী ২০১৯

জ্বালানি তেলের ওপর ২০ শতাংশ কর বৃদ্ধির সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত বছর নভেম্বরে রাস্তায় নামে ফরাসি জনতা। ‘ইয়োলো ভেস্ট’ পরিচয়ে সংগঠিত ওই বিক্ষোভ একদিকে সহিংস হতে থাকে, অন্যদিকে নতুন নতুন দাবির সমন্বয়ে রূপ নিতে থাকে আন্দোলনের। এক পর্যায়ে জ্বালানি তেলের কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার পাশাপাশি অবসরভাতা ও ওভারটাইম থেকে কর প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। ন্যূনতম মজুরিও বাড়িয়েছেন তিনি। তা সত্ত্বেও রাস্তা ছাড়েনি ফরাসি জনতা। এর নেপথ্য কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে যে বিক্ষোভের সূচনা তা রূপান্তরিত হয়েছে সুদীর্ঘকালের অর্থনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে ফ্রান্সের সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র জনগণের আন্দোলনে। বিত্তশালীদের পক্ষে থাকা ফ্রান্সের অর্থনৈতিক বাস্তবতার বিরুদ্ধে ‘ইয়োলো ভেস্ট’ ব্যানারে সংগঠিত ফরাসিরা নতুন ধারার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ডাক দিয়েছেন। সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মধ্য দিয়ে তারা এমন এক ‘জনগণের রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নকে সামনে এনেছেন, যার চরিত্র হবে ‘কল্যাণমূলক’।
ফ্রান্সের মোটরযান আইন অনুযায়ী, বেশি আলো প্রতিফলিত করে এমন এক ধরনের বিশেষ নিরাপত্তামূলক জ্যাকেট গাড়িতে রাখতে হয় চালকদের। এর রঙ সবুজাভ হলুদ (ইয়োলো)। আন্দোলনকারীরা এই জ্যাকেট (ভেস্ট) পরে বিক্ষোভের সূচনা করেছিল বলে আন্দোলনটি পরিচিতি পায় ‘ইয়োলো ভেস্ট’ নামে। এই আন্দোলনের কোনও ঘোষিত কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নেই। গত নভেম্বরে শুরু হওয়া তাদের কর্মসূচিতে উত্তাল হতে শুরু করে প্যারিসসহ ফ্রান্সের বড় বড় সব শহর। জ্বালানি তেলের ওপর কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে সেইসব মানুষ, অর্থনৈতিক চাপে যারা এমনিতেই পর্যদুস্ত।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ফ্রান্সের চলমান আন্দোলনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক বঞ্চনার ইতিহাস। বিত্তশালীদের সুবিধা অনুযায়ীনীতি প্রণয়ন এবং অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়া মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবীদের উপেক্ষার মতো ঘটনা থেকে সৃষ্ট ক্ষোভ এই আন্দোলনে বারুদের ভূমিকা নিয়েছে। আন্দোলনকারীরা ধনীদের আরও ধনী করে তোলার রাষ্ট্রীয় নীতির বিলোপ চায়। গত শনিবারেও (০৫ জানুয়ারিও) উত্তাল বিক্ষোভে তাই সরকারি ভবন আর বিত্তশালীদের অঞ্চলকে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে দেখা যায়। পুলিশের সঙ্গে অনেকগুলো শহরে তাদের সরাসরি সংঘর্ষ হয়েছে। এক পর্যায়ে তারা প্যারিসে মন্ত্রণালয় ভবনের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। বিত্তশালীদের বসবাস, এমন একটি এলাকায় গিয়েও তারা রাস্তায় থাকা মোটরসাইকেল ওগাড়ি ভাঙচুর করেছে। রাস্তায় থাকা ব্যারিকেডে জ্বালিয়েছে আগুন।

গত বছর ১০ ডিসেম্বর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দেন। জ্বালানির কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের পাশাপাশি অবসরভাতা ও ওভারটাইমের অর্থের ওপর থেকে কর প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন ম্যাক্রোঁ। সেই সঙ্গে নূন্যতম মজুরি সাত শতাংশ বৃদ্ধিও করেন। উদ্যোক্তাদের বছর শেষে করমুক্ত বোনাস দেওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি তিনি অভিবাসীদের নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে আলোচনার আশ্বাস দেন। তা সত্ত্বেও থামছে না আন্দোলন। আল-জাজিরায় প্রকাশিত এক কলামে ফরাসি সাংবাদিক ও লেখক রকহায়া ডিয়ালো মন্তব্য করেছেন, জ্বালানি কর একটি উপলক্ষ মাত্র। সাধারণ মানুষের মূল ক্ষোভ রাষ্ট্রের কাছে অচ্ছ্যুত হয়ে পড়া নিয়ে। ক্ষোভটি সম্পদের অসম বণ্টন ও বৈষম্য থেকে উদ্ভূত। বিত্তশালীরা যেখানে হ্রাসকৃত করের সুবিধা ভোগ করছে , সাধারণ মানুষ সেখানে জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ যোগাড়ে হিমশিম খাচ্ছে।

১৯৮৩ সাল থেকে তৎকালীন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতেরা সেবাখাতে ব্যয় সংকোচন নীতি অনুসরণ করতে শুরু করেন। পরবর্তীতে সেই ধারাই কমবেশি সবগুলো ফরাসি সরকার অনুসরণ করেছে। তারা ক্রমেই ফ্রান্সকে একটি ‘কল্যাণ রাষ্ট্রের’ ধারা থেকে দূরে নিয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফ্রান্সের মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষ। ক্রমেই তারা ডান-বাম উভয় পক্ষের প্রতি বিশ্বাস হারাতে থাকে। ফ্রান্সের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বিত্তশালী শ্রেণির পাহারাদার হিসেবে চিনতে থাকে তারা। এমন প্রেক্ষাপটে ২০১৭ সালে ‘নতুন বিশ্ব গড়ার’ প্রত্যয় ঘোষণা দিয়ে নতুন দলের আত্মপ্রকাশ ঘটান এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। এককালে রথচাইল্ডদের বিনিয়োগ ব্যাংকার ও পরে সাবেক প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাদের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ম্যাক্রোঁ যখন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হন তখন ফরাসিদের অনেকেই তাকে নতুন প্রজন্মের রাজনীতিবিদ হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। ডানপন্থীদের ক্ষমতায় যাওয়া ঠেকাতে তার বিজয় প্রত্যাশিত ছিল ফ্রান্সের উদারপন্থীদের কাছেও। তবে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পর ‘নতুন ধারার রাজনীতি’র প্রতিশ্রুতি দানকারী প্রেসিডেন্টের বিষয়ে মোহভঙ্গ হতে থাকে ফ্রান্সের সাধারণ মানুষের।

২০১৭ সালে ম্যাক্রোঁ বলেছিলেন, ট্রেন স্টেশনগুলো এমন জায়গা যেখানে সফল হতে পারা মানুষ ও কোনও কিছুই হয়ে উঠতে না পারা মানুষদের একসঙ্গে দেখতে পাওয়া যায়। ২০১৭ সালের অক্টোবরে অ্যালুমিনিয়াম কারখানার অসন্তুষ্ট শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলার তিনি মন্তব্য করেছিলেন,‘বিশৃঙ্খলা তৈরীর বদলে আপনাদের উচিত অন্য কোথাও গিয়ে দেখা, এর চেয়ে ভাল চাকরি পেতে পারেন কিনা।’ ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি একজন বেকার ফরাসিকে বলেছিলেন, ‘একটু খোঁজাখুঁজি করলেই কাজ পেতে পারতেন। আমি তো যেখানেই যাই, সবাই বলে নিয়োগ দেওয়ার মতো লোক পাচ্ছি না।’ সাধারণ মানুষের প্রতি সহানুভূতির অভাব ও বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান স্বার্থের সহায়ক নীতি প্রণয়ন করার প্রবণতা দেখে ফরাসিদের অনেকের এখন ধারণা হয়েছে, ম্যাক্রোঁ একজন উদ্ধত রাজনীতিবিদ যিনি শুধু ধনী ও শক্তিশালীদের বন্ধু।

আল-জাজিরায় প্রকাশিত এক কলামে ফরাসি সাংবাদিক ও লেখক রকহায়া ডিয়ালো মন্তব্য করেছেন, ম্যাক্রোঁ ঠিক সেরকম অর্থনৈতিক নীতিই অনুসরণ করে গেছেন, আশির দশক থেকে তার পূর্বসূরিরা যে নীতি অনুসরণ করেছেন। সেই নীতি যেমন ফ্রান্সের সবচেয়ে দরিদ্রদেরই ভুগিয়েছে, তেমনি ধনীদের আরও ধনী হতে সহায়তা করছে। তার মতে, ইয়োলো ভেস্ট আন্দোলন শুধুমাত্র জ্বালানি কর বৃদ্ধির প্রতিবাদে হওয়া আন্দোলন নয়। এ আন্দোলনের দাবি সামাজিক ন্যায় বিচার। মনের ভেতর তীব্র মাত্রায় অসন্তুষ্টি থাকা ফ্রান্সের সাধারণ মানুষ মনে করে, তারা এমন একবিশ্বের হেরে যাওয়া মানুষ, যে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করে আন্তর্জাতিক অভিজাতরা।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টে প্রকাশিত নিবন্ধে ফরাসি বিশ্লেষক ও অ্যাকিটিভিস্ট অ্যারলি ডায়নারা লিখেছেন, শুধু অর্থনৈতিক বঞ্চনার প্রতিবাদ নয়, ফরাসি আন্দোলনকারীরা রাষ্ট্র পরিচালনায় চায় আরও বেশি অংশগ্রহণ, চায় আরও বেশি নীতি নির্ধারনী ক্ষমতা। ইয়োলো ভেস্ট আন্দোলন শুধুমাত্র অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতিবাদই নয়, একইসঙ্গে তা গণতন্ত্রের দাবিতে হওয়া আন্দোলনও। নীতি প্রণয়নে আরও বেশি মাত্রায় অংশগ্রহণের সুযোগ ও নিজেদের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে ফিরে পেতে রাস্তায় নেমেছেন আন্দোলনকারীরা।

আল জাজিরাতে রকহায়া ডিয়ালো লিখেছেন, জাতীয় ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা থেকে শুরু করে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা করার মতো যেসব সহিংস আচরণ আন্দোলনকারীদের করতে দেখা গেছে, তার পেছনে রয়েছে তাদের নিজেদেরই সহিংসতার ভুক্তভোগী হওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস। তারা যে সহিংসতার ভুক্তভোগী, তা দৃষ্টির আড়ালে থাকা এক নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। সে সহিংসতা উপেক্ষিত হওয়ার, অবিচারের শিকার হওয়ার। বেকারত্ব, বঞ্চনা ও দারিদ্রে নিত্যদিন হেনস্থা হওয়া সাধারণ ফরাসিদের ক্ষোভ কাজ করেছে ইয়োলো ভেস্ট আন্দোলনের পেছনে।

রকহায়া ডিয়ালো দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের নিবন্ধে লিখেছেন, ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতিতে ম্যাক্রোঁকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে আর কোনও পথ খোলা নেই বলে মনে করছেন ফরাসিরা। রাজপথে আন্দোলনকারীদের মিছিল ও অবস্থান গ্রহণ এখন আবর্তিত হচ্ছে জনগণের দ্বারা এমন শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করার দাবিতে যা সত্যিকার অর্থে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবে, সংহত করবে জনগণের ক্ষমতা। যে ক্ষমতা কাঠামো পুরাতন আইন বাতিল করতে পারবে, নতুন আইন প্রস্তাব করতে পারবে, সংবিধান সংশোধন করতে পারবে, প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে এমপি-মেয়র পর্যন্ত যে কোনও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করতে পারবে, জনগণের দ্বারা প্রস্তাবিত সেরকম এক ক্ষমতা কাঠামোর উদ্বোধনের জন্য আন্দোলনকারীদের রাস্তাতেই থাকতে হচ্ছে।