উপাধ্যক্ষ, মোশাররফ হোসেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ
কাঁচপুর,সোনারগাঁও, নারায়নগঞ্জ
একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনশীল। প্রযুক্তি, অর্থনীতি, কর্মবাজার এবং সামাজিক কাঠামোর এই রূপান্তরের সঙ্গে তাল মিলিয়েশিক্ষার ধারণাও আমূল বদলে যাচ্ছে। এখন শিক্ষা মানে কেবলপরীক্ষায় ভালো ফল নয়, শিক্ষা মানে জীবনের জন্য প্রস্তুতি, মানসিকসুস্থতা, সৃজনশীলতা, মানবিকতা ও বৈশ্বিক নাগরিকত্ব। এই বাস্তবতায়বিশ্বজুড়ে শিক্ষাবিদদের কাছে যে ধারণাটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, তা হলো আনন্দদায়ক শিক্ষা।
উন্নত ও উন্নয়নশীল বহু দেশ এখন পরীক্ষাকেন্দ্রিক, মুখস্থনির্ভরশিক্ষাব্যবস্থা থেকে সরে এসে শিশুকেন্দ্রিক ও আনন্দমুখর শিক্ষার দিকেঝুঁকছে। ফিনল্যান্ড, কানাডা, জাপান, সিঙ্গাপুরের মতো দেশে শিক্ষারগুণগত মান নিশ্চিত করতে শ্রেণিকক্ষে আনন্দ, স্বাধীন চিন্তা ও অনুসন্ধানভিত্তিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। গবেষণায় দেখাগেছে, শিশুরা যখন ভয়মুক্ত ও আনন্দদায়ক পরিবেশে শেখে, তখনতাদের শেখার গভীরতা বাড়ে, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তৈরি হয় এবংআজীবন শেখার মানসিকতা গড়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক শিক্ষাসূচকগুলোও প্রমাণ করে—শুধু দীর্ঘ পাঠ্যক্রম নয়, বরং শিশুর আনন্দ ও আগ্রহকে কেন্দ্র করে গড়া শিক্ষাই টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি।
শিক্ষার গুণগত মান বলতে আমরা প্রায়ই পাঠ্যসূচি, ফলাফল বাঅবকাঠামোর কথা বলি। অথচ গুণগত শিক্ষার অন্যতম প্রধান শর্তহলো—শিশু কি শেখার আনন্দ পাচ্ছে? আনন্দদায়ক শিক্ষা মানেখেলাধুলা করেই সব শেখা নয় বরং এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা যেখানেশিশুর কৌতূহলকে মূল্য দেওয়া হয়, প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করা হয়, ভুলকে শাস্তিযোগ্য নয় বরং শেখার অংশ হিসেবে দেখা হয়, শিক্ষকভয়ের উৎস নয় বরং পথপ্রদর্শক এই ধরনের শিক্ষায় শিশুরা শুধুবিষয়ভিত্তিক জ্ঞান অর্জন করে না, তারা শিখে কিভাবে চিন্তা করতে হয়, কিভাবে সহযোগিতা করতে হয়, কিভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে হয়। এভাবেই শিক্ষার গুণগত মান বাস্তবে অর্জিত হয়।
আজকের শিশুরাই আগামী দিনের বৈশ্বিক নাগরিক। তাদের সামনে শুধুজাতীয় নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরও উন্মুক্ত। তাই শিক্ষার লক্ষ্য হওয়াউচিত এমন মানুষ তৈরি করা যারা মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধে বিশ্বাসীভিন্ন সংস্কৃতি ও মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতেসক্ষম প্রযুক্তি ব্যবহার জানে, কিন্তু প্রযুক্তির দাস নয়। আনন্দদায়কশিক্ষা শিশুর মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। আত্মবিশ্বাসী শিশুই পারেনেতৃত্ব দিতে, নতুন কিছু ভাবতে এবং বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান তৈরিকরতে। ভয়, চাপ ও প্রতিযোগিতার অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দিলে শিশুহয়তো পরীক্ষায় পাস করবে, কিন্তু বিশ্বমানের নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠাকঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইতিবাচক অগ্রগতিহলেও এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। অতিরিক্ত পাঠ্যভার, কোচিংনির্ভরতা, পরীক্ষাভীতি ও অভিভাবকদের অতি প্রত্যাশা শিশুরশৈশবকে অনেক সময় ভারাক্রান্ত করে তোলে। বাংলাদেশের মতো তরুণজনসংখ্যার দেশে আনন্দদায়ক শিক্ষা শুধু একটি পছন্দ নয় বরং একটিজাতীয় প্রয়োজন। আমাদের প্রেক্ষাপটে আনন্দদায়ক শিক্ষার কয়েকটিগুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে—শ্রেণিকক্ষে বন্ধুত্বপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশ, গল্প, কাজ, আলোচনা ও বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে শেখানো। খেলাধুলা, শিল্পকলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের যথাযথ গুরুত্ব। শিক্ষকদের পেশাগতপ্রশিক্ষণ ও মানসিকতা উন্নয়ন। অভিভাবকদের সচেতন অংশগ্রহণ। শিশু যদি স্কুলে এসে নিজেকে নিরাপদ ও মূল্যবান মনে করে, তাহলেই সেপ্রকৃত অর্থে শিখতে আগ্রহী হবে।
আনন্দদায়ক শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক অগ্রগতি, শিক্ষার গুণগত মান এবং বিশ্বমানের নাগরিকতৈরির লক্ষ্য—এই তিনটি পথই এক জায়গায় এসে মিলেছে শিশুরআনন্দে। বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে উন্নত, মানবিক ও টেকসই রাষ্ট্রগড়তে চায়, তবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রে রাখতে হবে শিশুকে তারমন, তার আনন্দ ও তার সম্ভাবনাকে। শিশু যখন আনন্দ নিয়ে শেখে, তখনই শিক্ষা হয় জীবনের আলো।








