মেশকাতুন নাহার : বাংলাদেশের ইতিহাসে দুর্যোগ কোনো নতুন শব্দ নয়। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করেই এই দেশের মানুষ টিকে আছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে এমন এক দুর্যোগ ধীরে ধীরে রাষ্ট্র ও সমাজের ভেতরে বিস্তার লাভ করছে, যার উৎস প্রকৃতিতে নয়, মানুষের আচরণে। সেই দুর্যোগ হলো দুর্নীতি। এটি এমন এক মানবসৃষ্ট বিপর্যয়, যার কোনো শব্দ নেই, কোনো দৃশ্যমান ধ্বংসস্তূপ নেই—তবুও এটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি, প্রশাসন এবং নৈতিক কাঠামোকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দিচ্ছে।দুর্নীতির প্রকৃতি বোঝার জন্য এটিকে কেবল আইনি অপরাধ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি একটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট। যখন ক্ষমতা, দায়িত্ব ও সম্পদের ব্যবস্থাপনার মধ্যে ব্যক্তিগত স্বার্থ অগ্রাধিকার পায়, তখন দুর্নীতি জন্ম নেয়। আর এই জন্ম কোনো একক স্তরে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং নিম্নস্তর থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।দুর্নীতির প্রথম অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষ লাভ করে রাষ্ট্রের নিম্নস্তরের প্রশাসনিক কাঠামোতে। একটি জন্মসনদ, জমির খতিয়ান, নামজারি, ট্রেড লাইসেন্স কিংবা কোনো সরকারি সেবা পেতে অনেক সময় নাগরিকদের অঘোষিত অর্থ ব্যয় করতে হয়। এই ধরনের দুর্নীতি অনেক সময় এতটাই প্রাত্যহিক হয়ে উঠেছে যে তা যেন এক ধরনের অলিখিত প্রথায় পরিণত হয়েছে।
এই দুর্নীতি পরিমাণে ছোট হলেও এর প্রভাব গভীর। কারণ এটি নাগরিকদের মনে রাষ্ট্র সম্পর্কে এক ধরনের হতাশা সৃষ্টি করে। যখন মানুষ দেখে যে আইন বা নিয়মের চেয়ে অর্থের বিনিময়ই দ্রুত ফল দেয়, তখন তার মধ্যে ন্যায়বোধের প্রতি আস্থা কমে যায়। ধীরে ধীরে নাগরিকের মধ্যে এমন ধারণা জন্ম নেয় যে সিস্টেমের ভেতরে সততা দিয়ে টিকে থাকা কঠিন।এই মানসিকতার পরিবর্তন সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। কারণ এটি নাগরিকদের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে এবং দুর্নীতিকে একটি সামাজিক বাস্তবতায় পরিণত করে।
বাংলাদেশ গত দুই দশকে অবকাঠামোগত উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু এই উন্নয়নের ভেতরেই অনেক সময় দুর্নীতির অভিযোগ উঠে আসে।অনেক প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে কিংবা অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প অনুমোদনের অভিযোগ দেখা যায়। এই পরিস্থিতি উন্নয়নের উদ্দেশ্যকে দুর্বল করে দেয়। একটি প্রকল্পের অর্থ যদি যথাযথভাবে ব্যবহৃত না হয়, তবে সেই প্রকল্প জনকল্যাণে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারে না।এই ধরনের দুর্নীতি উন্নয়নের গতি কমিয়ে দেয়। কারণ রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদ অপচয়ের মাধ্যমে হারিয়ে যায়। যে অর্থ দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা দারিদ্র্য বিমোচনে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব ছিল, তা অনেক সময় অদক্ষতা ও অনিয়মের কারণে অকার্যকর হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো ব্যাংকিং ব্যবস্থা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাংক খাতে বিভিন্ন অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির ঘটনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করা, রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের সুপারিশে অযোগ্য ঋণ অনুমোদন কিংবা তদারকির দুর্বলতা—এসব বিষয় ব্যাংকিং খাতকে দুর্বল করে তোলে। ব্যাংক খাতের এই দুর্বলতা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এটি সমগ্র অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলে। কারণ ব্যাংকগুলো জনগণের আমানত এবং বিনিয়োগের একটি প্রধান মাধ্যম। যদি এই ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে যায়, তবে অর্থনৈতিক কার্যক্রমও ধীর হয়ে পড়তে পারে।ফলে দুর্নীতির এই রূপটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকিতে পরিণত হয়।
দুর্নীতির সবচেয়ে জটিল ও বিপজ্জনক রূপটি দেখা যায় তখন, যখন এটি উচ্চপর্যায়ের ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করে। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা দুর্বল হয়, তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের সম্পদ বণ্টন, উন্নয়ন পরিকল্পনা কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোতে জনস্বার্থের পরিবর্তে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ প্রাধান্য পেতে পারে। এর ফলে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে,উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতি সমাজে একটি নেতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেয়—যেন ক্ষমতা থাকলে জবাবদিহিতার প্রয়োজন নেই। এই ধারণা সমাজের ভেতরে গভীর হতাশা তৈরি করে এবং আইনের শাসনের প্রতি মানুষের বিশ্বাসকে ক্ষুণ্ণ করে।
দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করে না; এটি সমাজের নৈতিক কাঠামোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। যখন মানুষ দেখে যে অসৎ উপায়ে দ্রুত সম্পদ অর্জন করা সম্ভব, তখন সততা ও নৈতিকতার মূল্য কমে যায়। এই পরিস্থিতি নতুন প্রজন্মের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তরুণেরা যদি মনে করে যে মেধা ও পরিশ্রমের চেয়ে প্রভাব ও অনিয়মই সফলতার পথ খুলে দেয়, তবে তাদের মধ্যে আদর্শের সংকট সৃষ্টি হয়।ফলে সমাজে একটি নৈতিক বিভ্রান্তি জন্ম নেয়, যেখানে সৎ মানুষ নিজেকে অসহায় মনে করে এবং অসৎ ব্যক্তি সুবিধাভোগী হয়ে ওঠে।দুর্নীতিকে অনেক সময় একটি প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এর প্রভাব বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে এটি একটি মানবসৃষ্ট দুর্যোগ। কারণ এটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি দুর্বল করে, উন্নয়নের গতি কমিয়ে দেয় এবং সামাজিক আস্থাকে ধ্বংস করে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ হঠাৎ আঘাত হানে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার ক্ষত মুছে যায়। কিন্তু দুর্নীতি দীর্ঘমেয়াদে সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এটি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি ক্ষয় করে, যার প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করতে হয়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েরই সচেতন ভূমিকা প্রয়োজন। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ দুর্নীতি প্রতিরোধের প্রধান শর্ত। একই সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার ও ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতির সুযোগ কমাতে পারে।তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামাজিক সচেতনতা। একটি সমাজ যদি দুর্নীতিকে ঘৃণা করতে শেখে এবং সততাকে সম্মান দেয়, তবে দুর্নীতির বিস্তার স্বাভাবিকভাবেই কমে আসতে পারে।
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সামাজিক সূচকে অগ্রগতি দেশের সম্ভাবনাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার পথে দুর্নীতি একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।এটি এমন এক মানবসৃষ্ট দুর্যোগ, যা চোখে দেখা যায় না কিন্তু রাষ্ট্রের ভিতকে দুর্বল করে দেয়। যদি এই দুর্যোগকে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে উন্নয়নের অর্জনগুলোও একসময় প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
অতএব, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি একটি জাতীয় প্রয়োজন। কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার অর্থনৈতিক সম্পদে নয়, বরং তার সততা, ন্যায়বোধ এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতিতে নিহিত। আর সেই সংস্কৃতিই পারে বাংলাদেশকে এই নীরব মানবসৃষ্ট দুর্যোগ থেকে মুক্তির পথে এগিয়ে নিতে।
লেখক : প্রভাষক সমাজকর্ম
কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ,
কচুয়া, চাঁদপুর।


















