দর্পণ রিপোর্ট : বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডিসেম্বরের শেষার্ধে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা ও কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরার সম্ভাব্য সময়সীমা সামনে আসতেই অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে একাধিক পক্ষ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে আল জাজিরার অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন শায়ের খান তাঁর সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণধর্মী পোস্টে বাংলাদেশের দক্ষিণপন্থী রাজনীতি, ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং তারেক রহমানের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন।
নিচে জুলকারনাইন সায়ের খানের মূল লেখা (অবিকৃত) জুড়ে দেয়া হলো :
বাংলাদেশের দক্ষিণপন্থীদের দম আছে বলতে হয়! নির্বাচন ঠেকানোর প্রকল্পের গতি কিছুটা পিছিয়ে পড়তেই নতুন টার্গেট শনাক্ত করতে দেরি করেনি তারা। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ ঘিরে নতুন কর্মসূচি সাজাতে শুরু করেছে — ঠিক যখন তারেক রহমান দেশে ফিরছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
তারেক রহমানের দেশে ফেরা কেবল বিএনপির জন্য নয়—দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্যই একটা জরুরি বিষয়, কারণ জটিল সময়ে দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক এবং প্রতিরক্ষা তিন দিক থেকেই শক্ত নেতৃত্ব প্রয়োজন।
সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভর-কেন্দ্রগুলো থেকে দ্রুত তাঁর দেশে ফেরার তাগিদ দেখে তিনিও একরকম ঝুঁকির মুখেই ডিসেম্বরের চতুর্থ সপ্তাহে মাতৃভূমিতে ফিরছেন। সঙ্গত কারণেই এই মুহূর্তটি ব্যাপক কৌতূহল ও ভরসার হওয়ার কথা।
দক্ষিণপন্থীরা ঠিক এই মুহূর্তটিকে টার্গেট করেছে উত্তেজনা তৈরি করতে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কটিকে যুদ্ধংদেহি করে তোলার জন্য এই সময়টিকে বেছে নেয়ার লক্ষ্য মূলত তারেক রহমানের দেশে ফেরার সামাজিক আবেদন কমানো। এই আয়োজনে ভারতের এখনকার শাসকদের দিক থেকেও বহু ধরনের লাভ আছে।
প্রথমত, বিজেপি-আরএসএস বাংলাদেশের পরিস্থিতি ও রাজনীতিকে তার জন্য নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখিয়ে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় ব্যাপক উম্মাদনা তৈরি করতে পারবে। সেটা ইতোমধ্যে শুরুও হয়ে গেছে।
দ্বিতীয়ত, এতে বাংলাদেশের চার পাশে নতুন করে সামরিক আয়োজনও বাড়াবে তারা।
তৃতীয়ত, এর ফলে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী সকল ভারতীয় রাজ্যে মুসলমান বিদ্বেষ নতুন উচ্চতায় উঠছে।
চতুর্থ, ‘নর্থ-ইস্ট ভাগ করে দেবো’, ‘দূতাবাসে ঢুকবো’ এরকম হুমকিগুলো আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের ইদানিংকার ন্যারেটিভকে ন্যায্যতা দিচ্ছে।
ফলে সব মিলিয়ে নয়াদিল্লীর জন্য বাংলাদেশের দক্ষিণপন্থীদের উপহারের যেন কোন শেষ নেই! আবার জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার পর জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে তারেক রহমানকে একচেটিয়া উচ্চ সামাজিক ভাবমূর্তিতে দেখতে চায় না নয়াদিল্লী। তাদের হয়ে সেই কাজটিও করে দিতে চলেছে এখানকার ফার-রাইটরা।
তবে, এটাও সত্য, বাংলাদেশের জনসমাজ বহু চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আজকের এই জায়গায় এসেছে। তাদের নীরব দৃঢ়তা নির্বাচনের রোডম্যাপকে বাস্তব করে তুলেছে।
তাই ভারত-বিরোধিতার আড়ালে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে উদীয়মান ছদ্ম-রাজনৈতিক-যুদ্ধের তাৎপর্যও নিশ্চয়ই তারা বুঝতে পারবে। সব মানুষকে তো সব সময়ের জন্য বার বার বোকা বানানো যায় না!
ভারতের বিরুদ্ধে স্নায়ু-লড়াইয়ের বড় হাতিয়ার হলো রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো, আর এসব প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করার কোন বিকল্প নেই।
আর সেটা বাস্তবায়নে – উৎসবমুখর নির্বাচন এবং জনসমর্থিত শক্ত নেতৃত্ব হলো প্রাথমিক পদক্ষেপ।
কেবল শক্তিশালী জনপ্রতিনিধিরাই ভারতের হাত থেকে অপরাধীদের নিয়ে আসতে এবং বাকিসব ন্যায্য স্বার্থ আদায় করতে পারে।
জুলকারনাইন শায়ের খানের এই বিশ্লেষণ বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, আঞ্চলিক শক্তির সমীকরণ এবং আসন্ন নির্বাচনের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনে দেয়। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা ও বয়ান নির্মাণের চেষ্টা চলছে, তা কেবল দলীয় রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—বরং তা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, জনসমর্থন এবং শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতৃত্ব যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সে কথাই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয় অনুসন্ধানী সাংবাদিকের এই স্টেটাস।










