মেশকাতুন নাহার : যে মুহূর্তে শুদ্ধতা অবসন্ন দেহে নৈঃশব্দ্যের শয্যায় শায়িত হয়, ঠিক সেই মুহূর্তেই অশুদ্ধতা রণতূর্য হাতে নগর পরিভ্রমণে নামে। ইতিহাসের এই উপাখ্যান নতুন নয়; কেবল মুখোশের নকশা বদলায়, চরিত্রের কণ্ঠস্বর পাল্টায়, অথচ নাট্যরসের গঠন একই থাকে। শুদ্ধতা, এক নির্বাক তপস্বিনী—অগ্নিশিখার মতো অন্তর্মুখী; আর অশুদ্ধতা, এক চৌকস জাদুকর—ধোঁয়ার বৃত্তে আকাশ ভরিয়ে দেয়, যেন ধোঁয়াই সূর্য।
শুদ্ধতার ক্লান্তি আসলে পরাজয় নয়; এটি অন্তর্দীর্ঘ যাত্রার অবসাদ। সে পথ চলে শিলাস্তরের ওপর দিয়ে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে রক্তের অক্ষরে লিখিত হয় দায়বোধ। কিন্তু এই রক্তলিপি কে পড়ে? বাজারের চোখ তো রঙিন ব্যানার দেখে, শিরোনামের ঝলক দেখে। তাই শুদ্ধতা যখন ধ্যানমগ্ন হয়ে আত্মার আঙিনায় ফিরে যায়, অশুদ্ধতা তখন মঞ্চের আলো কুক্ষিগত করে ঘোষণা করে—“আমিই আলোর উৎপাদক!”
অশুদ্ধতার কৌশল সূক্ষ্ম, অথচ প্রকাশ্য। সে শব্দের আভরণ পরে; নৈতিকতার অভিধান তার হাতে খেলনা। “স্বচ্ছতা”, “দায়িত্ব”, “মানবতা”—এই শব্দগুলোকে সে এমন দক্ষতায় উচ্চারণ করে, যেন শব্দগুলো তার জন্মগত সম্পত্তি। কিন্তু শব্দের দেহে অর্থের আত্মা থাকে; অশুদ্ধতা সেই আত্মা নির্বাসিত করে কেবল দেহটুকু প্রদর্শন করে। যেন মৃত পাখিকে রঙিন পালকে সাজিয়ে উড়ন্ত বলার চেষ্টা।
যখন শুদ্ধতা নিদ্রিত, তখন সমাজের প্রান্তর জুড়ে এক অদ্ভুত প্রতিধ্বনি জন্ম নেয়। উচ্চকণ্ঠতা সাহসের প্রতিরূপ হয়ে ওঠে, আর নীরবতা সন্দেহের। অশুদ্ধতা জানে—কোলাহলই তার রক্ষাকবচ। সে তর্ক করে না, সে তর্জন করে; সে যুক্তি নির্মাণ করে না, সে আবেগের ঢেউ তোলে। তার ভাষা ঝড়ো, কিন্তু গভীর নয়। অগভীর জলের মতো সে কলরবে ভরিয়ে রাখে প্রান্তর, যাতে গভীর নদীর মৃদু স্রোত আর শোনা না যায়।
এই দৃশ্যপটে ব্যঙ্গের একটি গোপন রেখা আছে। অশুদ্ধতা যখন নৈতিকতার বক্তৃতা দেয়, তখন তার কণ্ঠে এমন এক অভিনয় থাকে, যা রঙ্গমঞ্চের অভিজ্ঞ অভিনেতাকেও লজ্জা দিতে পারে। সে কান্না চর্চা করে, ক্রোধ রপ্ত করে, বিনয় অনুশীলন করে—সবই প্রপস। যেন বিবেক একটি পোশাক, প্রয়োজনমতো পরে নেওয়া যায়, প্রয়োজন ফুরোলেই খুলে ফেলা যায়। দর্শক করতালি দেয়; কারণ করতালি দেওয়া সহজ, প্রশ্ন তোলা দুরূহ।
শুদ্ধতার আরেকটি দুর্বলতা—তার দীর্ঘ সহিষ্ণুতা। সে বিশ্বাস করে, সময়ই তার সাক্ষ্য দেবে। কিন্তু সময় নিরপেক্ষ স্রোত নয়; সময়কে যারা কৌশলে বাঁকাতে জানে, তারাই সেতু নির্মাণ করে। অশুদ্ধতা সময়ের ভাঁজে ভাঁজে স্বার্থের বীজ বপন করে, এবং ফল ফললে ঘোষণা করে—“দেখুন, এই বাগান আমার।” অথচ বাগানের মাটি ছিল সকলের, বীজ ছিল প্রাচীন নৈতিকতার।
দার্শনিক বিশ্লেষণে এই দ্বন্দ্ব বাহ্য জগতের নয়; এটি মানবমনের অন্তর্গত প্রদেশে সংঘটিত। প্রত্যেক সত্তার ভেতরে একটি শুদ্ধ তপোবন আছে, যেখানে সত্য নীরবে অঙ্কুরিত হয়; এবং একটি কোলাহলময় বাজারও আছে, যেখানে আপসের মুদ্রা বিনিময় হয়। ক্লান্তি এলে আমরা বাজারের দিকে ঝুঁকি, কারণ তপোবনের পথ দুর্গম। “অল্প আপস”—এই শব্দবন্ধই অশুদ্ধতার রাজদ্বার। একবার প্রবেশ করলে, সে আমাদের যুক্তিকে নিজের ভাষায় অনুবাদ করে দেয়।
তবে শুদ্ধতার নিদ্রা চিরস্থায়ী নয়। তার ঘুম ধ্যানের মতো; সে ফিরে আসে, আরও তীক্ষ্ণ, আরও স্বচ্ছ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—অশুদ্ধতার বিকট উল্লাস যত উচ্চকিত হয়েছে, ততবার কোনো এক প্রান্তে নীরব প্রদীপ জ্বলে উঠেছে। সেই প্রদীপের আলো প্রথমে ক্ষীণ, কিন্তু তার স্থায়িত্ব গভীর। কারণ ধার করা আলোর আয়ু সীমিত; অশুদ্ধতার নিজস্ব সূর্য নেই, আছে কেবল প্রতিফলিত ঝিলিক।
অশুদ্ধতার উৎসবের একটি বৈশিষ্ট্য হলো—সে নিজেকে অনিবার্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সে বলে, “এটাই বাস্তবতা।” যেন নৈতিকতা কোনো কাব্যিক বিলাস, আর আপসই একমাত্র প্রজ্ঞা। কিন্তু এই তথাকথিত বাস্তবতা আসলে ভয় থেকে জন্ম নেয়। শুদ্ধতার পথ ঝুঁকিপূর্ণ; তাই অশুদ্ধতা নিরাপত্তার প্রলোভন দেখায়। সে বলে, “সামান্য বক্রতা ছাড়া সরলরেখা টিকে না।” অথচ সত্যের জ্যামিতি ভিন্ন—সে বক্রতাকে দীর্ঘস্থায়ী হতে দেয় না।
রূপকের ভাষায় বলা যায়, শুদ্ধতা একটি গভীর অরণ্য—নিবিড়, প্রশান্ত, কিন্তু প্রবেশে শ্রমসাধ্য। অশুদ্ধতা একটি মেলা—রঙিন, কোলাহলমুখর, সহজলভ্য। মানুষ ক্লান্ত হলে মেলায় যায়; কিন্তু শান্তি খুঁজলে অরণ্যে ফিরতে হয়। সমস্যা তখনই, যখন মেলার শব্দ এত প্রবল হয় যে অরণ্যের পাখির ডাক আর শোনা যায় না।
এই প্রবন্ধের মর্মবাণী তাই সতর্কবার্তা—শুদ্ধতার ক্লান্তিকে দীর্ঘায়িত হতে দেওয়া বিপজ্জনক। কারণ সেই শূন্যতায় অশুদ্ধতা কৌশলে প্রাসাদ নির্মাণ করে। আমাদের দায়িত্ব, শুদ্ধতার তপোবনে জলের সিঞ্চন করা; তাকে কেবল পূজা নয়, চর্চা করা। নৈতিকতা যেন কেবল বক্তৃতার অলংকার না হয়, বরং দৈনন্দিন অভ্যাসের শ্বাসপ্রশ্বাস হয়।
অবশেষে বলা যায়, বিকট উচ্চারণ কখনো স্থির সত্যের সমতুল নয়। শব্দের উচ্চতা শক্তির প্রমাণ নয়; গভীরতা শক্তির প্রমাণ। শুদ্ধতা হয়তো নীরব, কিন্তু তার নীরবতা শূন্য নয়—সে সম্ভাবনায় পূর্ণ। আর অশুদ্ধতা যতই কৌশলী হোক, তার বিজয় ক্ষণস্থায়ী; কারণ সে আলো ধার করে বাঁচে, আর ধার করা আলো একদিন নিভেই যায়।
শুদ্ধতার নিদ্রা তাই এক অন্তর্বিরতি, অন্তিম নয়। প্রশ্ন কেবল—আমরা কি তার জাগরণের সহযাত্রী হবো, নাকি অশুদ্ধতার মেলার সাময়িক আতশবাজিতে মুগ্ধ দর্শক হয়ে থাকব? সিদ্ধান্ত আমাদের; ইতিহাস কেবল তার ফলাফল লিখে রাখবে।
লেখক : প্রভাষক সমাজকর্ম
কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ
কচুয়া, চাঁদপুর।।





















