দর্পণ ডেস্ক
লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত আজ আরাফার প্রান্তর। আজ ৯ জিলহজ (সৌদি আরবের স্থানীয় সময়) মঙ্গলবার পবিত্র হজ। ইয়াওমুল আরাফা বা আরাফার দিন। এদিন মক্কা নগরীর জাবালে রহমত পাহাড়ের চূড়া থেকে আরাফাতের ময়দানজুড়ে দণ্ডায়মান বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা সাদা-কালো-ধনী গরিব নির্বিশেষে প্রায় ১৮ লাখ হাজি।
সবার রোদনভরা কণ্ঠে একটাই ধ্বনি ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়াননি’ মাতা লাকা ওয়ালমুলক; লা শারিকা লাক’। অর্থাৎ ‘আমি হাজির, হে আল্লাহ, আমি হাজির। তোমার কোনো শরিক নেই।
সব প্রশংসা ও নিয়ামত শুধু তোমারই। সব সাম্রাজ্যও তোমার। ’ শুধু তোমার ক্ষমা ও অনুগ্রহ লাভের জন্য আমরা এখানে সমবেত হয়েছি প্রভু। আজ ফজরের নামাজ আদায় শেষে মিনা থেকে হাজিরা সমবেত হবেন এই আরাফাতের ময়দানে।হাজিদের (পুরুষ) পরনে শুধু সেলাইবিহীন সাদা দুই খণ্ড বস্ত্র (এহরাম)। এখানে তারা সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত অবস্থান করবেন। এই সেই ময়দান যেখানে প্রায় দেড়হাজার বছর আগে দাঁড়িয়ে মুসলিম উম্মাহর উদ্দেশ্য খুৎবা দিয়েছিলেন আল্লাহর প্রিয় হাবিব, নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)। বিদায় হজের খুৎবায় নবীজি ঘোষণা করেছিলেন, আজ থেকে ইসলামকে পরিপূর্ণ ধর্ম ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহতালার কাছে একমাত্র মনোনীত ধর্ম ইসলাম।আজ হাজিদের মননে যেন বিদায় হজের সেই ভাষণের অনুরণন।আজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থিত মসজিদে নামিরা থেকে হজের খুতবা দেবেন মসজিদে নববীর ইমাম ও খতিব শাইখ আলী আল হুজাইফি। সমবেত হাজিরা এখানে হজের খুতবা শুনবেন। আরবি ভাষায় দেওয়া তার এই ভাষণ বাংলাসহ বিশ্বের ২০টি ভাষায় তাৎক্ষণিক অনুবাদ করে শোনানোর ব্যবস্থা করেছে সৌদি হজ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। মসজিদে নামিরাতে নামাজও পড়াবেন তিনি। তার ইমামতিতে হাজিরা একসঙ্গে জোহর ও আসরের নামাজ আদায় করবেন। এরপর মুজদালিফার উদ্দেশে আরাফাতের ময়দান ত্যাগ করবেন হাজিরা। মুজদালিফায় পৌঁছে একসঙ্গে মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করবেন হাজিরা। সেখানে মুজদালিফায় খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন করবেন এবং সেখান থেকে শয়তানকে নিক্ষেপের জন্য ছোট ছোট পাথর সংগ্রহ করবেন। আগামীকাল বুধবার ১০ জিলহজ (সৌদি আরবের স্থানীয় সময়) সেখানে পালিত হবে ঈদুল আজহা। স্থানীয় যারা পবিত্র হজ পালন করেননি তারা ঈদের নামাজ পড়বেন ও কোরবানি করবেন। হাজি সাহেবানরা ফজরের নামাজ শেষে মুজদালিফা থেকে আবার মিনায় ফিরে আসবেন। এরপর রামি আল জামারাহ আল আকাবাহ বা বড় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করবেন। তারপর পশু কোরবানি হয়ে গেলে পুরুষরা মাথা মুণ্ডন করে মক্কা নগরীতে ফিরে পবিত্র কাবা তাওয়াফ করবেন। এটি তাওয়াফ আল ইফাদা বা হজের প্রধান তাওয়াফ হিসেবে গণ্য করা হয়। এরপর আবার মিনায় ফিরে ১২ জিলহজ (সৌদি আরবের স্থানীয় সময়) পর্যন্ত রামি আল জামারাহ ছোট শয়তানদের পাথর মেরে হজের মূল কার্যক্রম শেষ করবেন। পরে পবিত্র কাবা শরিফে বিদায়ি তাওয়াফ করে হজের পূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা শেষ করবেন। সৌদি মুয়াল্লিমরা ১০, ১১ ও ১২ জিলহজের (সৌদি আরবের স্থানীয় সময়) তিন দিনের মধ্যে যেকোনো দিন তাওয়াফ আল ইফাদা সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করে থাকেন। গতকাল সোমবার থেকে শুরু হয়েছে পবিত্র হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা। ৮ জিলহজ (সৌদি আরবের স্থানীয় সময়) জহর থেকে ৯ জিলহজ ফজর পর্যন্ত মিনায় অবস্থান ও কসরের সঙ্গে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া আখেরি নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর সুন্নাত। তবে লাখ লাখ হাজিদের সুষ্ঠুভাবে হজ সম্পাদনের সুবিধার্থে সৌদি হজ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ রবিবার রাতেই হাজিদের মিনায় নিয়ে আসেন। সোমবার সারা দিন ও রাত মিনায় হাজিরা নিজ নিজ তাঁবুগুলোতে অবস্থান করে ইবাদত-বন্দেগি ও নারী পুরুষ নির্বিশেষে গুনাহ মাফ ও পাপ মুক্তির জন্য আল্লাহর দরবারে রোনাজারি করেন। এরপর আজ মঙ্গলবার ফজরের নামাজ পড়ে হাজিরা আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশে রওনা হবেন। ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভের অন্যতম প্রধান হজ। তীব্র গরম উপেক্ষা করে বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা প্রান্তের ১৮ লক্ষাধিক ধর্মপ্রাণ মুসলমান হজ করতে পবিত্র মক্কা নগরীতে সমবেত হয়েছেন। চলতি বছরে বাংলাদেশ থেকে সাড়ে ৭৮ হাজার মানুষ পবিত্র হজ পালন করতে সৌদি আরব যাওয়ার সৌভাগ্যলাভ করেছেন।