ড. মো: বিল্লাল হোসেন: শিক্ষাব্যবস্থা বরাবরই ক্রমাগত পরিবর্তনশীল এবং উন্নয়নশীল। শিক্ষারতিনটি মূল স্তর—প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার মধ্যে মাধ্যমিকস্তরকে এক অর্থে বলা হয় শিক্ষার “মেরুদণ্ড”। কেননা, এটি একজনশিক্ষার্থীর শিশু থেকে তরুণ হয়ে ওঠার রূপান্তরকালীন স্তর, যেখানে সেতার ভবিষ্যৎ শিক্ষা, কর্মজীবন ও জীবনদর্শনের ভিত্তি রচনা করে। অথচ দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের মাধ্যমিক শিক্ষা প্রশাসনিকভাবে উচ্চশিক্ষার সাথে একই অধিদপ্তরের আওতায় পরিচালিত হয়ে আসছে। বিষয়টি নিছক প্রশাসনিক কাঠামোর প্রশ্ন নয়, এটি বরং বাংলাদেশেরভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও মানবসম্পদ বিকাশের প্রশ্ন।
মাধ্যমিক স্তর অতিক্রম করে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করে।মাধ্যমিক স্তরই শিক্ষার্থীর জীবনধারার মোড় পরিবর্তনের প্রধান ধাপ।মাধ্যমিক শিক্ষা কেবল পরীক্ষাভিত্তিক নয়, এটি হলো চরিত্রগঠন, সামাজিক মূল্যবোধ, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং সৃজনশীলতা বিকাশেরউপযুক্ত সময়। শিক্ষা মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সহচ্ছে মানবজীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়। এই বয়সে শিক্ষার্থীরাসঠিক দিকনির্দেশনা না পেলে ভবিষ্যতে তারা বিভ্রান্ত ও অপ্রস্তুত হয়েপড়ে। মাধ্যমিক শিক্ষার মান ও কাঠামো সরাসরি দেশের মানবসম্পদউন্নয়নের সাথে সম্পর্কিত। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG-4) অর্জনের জন্য একটি শক্তিশালী ও মানসম্মত মাধ্যমিক শিক্ষাঅপরিহার্য।
বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর আলাদাভাবে পরিচালিত হয়। ৯ হাজার ৬৫৬ প্রতিষ্ঠান নিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষার এবং ১হাজার ২৬৪ প্রতিষ্ঠান নিয়ে কারিগরি শিক্ষার রয়েছে নিজস্ব অধিদপ্তর। অথচমাধ্যমিকে শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেকবেশি। “ব্যানবেইস” এর ২০২৩ সালের জরিপ অনুযায়ী দেশে ২০ হাজারের অধিক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে,৩ লাখের বেশি শিক্ষক এবংপ্রায় ১ কোটি শিক্ষার্থী রয়েছে। তবুও মাধ্যমিক শিক্ষা এখনওআলাদা অধিদপ্তর পায়নি।এতে নীতিনির্ধারণে মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রয়োজনীয় অগ্রাধিকার পায় না। বিশেষ করে শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি, অবকাঠামো উন্নয়ন, পাঠ্যক্রম সংস্কার ইত্যাদিক্ষেত্রে এককভাবে মাধ্যমিক শিক্ষা নীতি বাস্তবায়নের শক্তি দেখাতেপারে না। মাধ্যমিক শিক্ষার বিশাল কাঠামো ও ভূমিকা বিবেচনায়একটি স্বতন্ত্র অধিদপ্তর প্রয়োজন। আলাদা অধিদপ্তর থাকলেপ্রতিনিয়ত পরিবর্তিত বিশ্ব বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে পাঠ্যক্রমহালনাগাদ ও সৃজনশীল করা সহজ। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ও উন্নত রাষ্ট্রগুলো শিক্ষা খাতে সহায়তা দিতে চায় নির্দিষ্টখাতভিত্তিকভাবে। মাধ্যমিক শিক্ষা আলাদা হলে আন্তর্জাতিক প্রকল্প, অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা গ্রহণ আরও সহজ হবে।
বাংলাদেশে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেলেও মাধ্যমিক স্তরে ঝরেপড়ার হার এখনও উদ্বেগজনক। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলেশিক্ষার্থীদের টিকে থাকা বড় চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে আলাদা অধিদপ্তরথাকলে মাধ্যমিক স্তরের সমস্যাগুলো আলাদাভাবে চিহ্নিত ও সমাধানকরা সম্ভব হবে। অন্যদিকে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে মাধ্যমিক স্তরেরশিক্ষার্থীদের তথ্যপ্রযুক্তি, বিজ্ঞান, গণিত, কারিগরি দক্ষতা, এবং ভাষাশিক্ষা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
জার্মানিতে শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রাজ্যের অধীনে। ফলেপ্রতিটি রাজ্য তার নিজ নিজ প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। অধিকাংশ উন্নত দেশেই মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা রাজ্য সরকারেরঅধীনে বিশেষ ব্যবস্থায় আলাদাভাবে অধিক গুরুত্ব দিয়েপরিচালিত। আলাদা প্রশাসন থাকলে স্বচ্ছ মনিটরিং ব্যবস্থার সুযোগতৈরি হয়। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে কাজের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্রমাধ্যমিক অধিদপ্তর থাকলে নির্দিষ্ট ফোকাস, পরিপাটি যোগাযোগ ও প্রজেক্ট বাস্তবায়ন সহজ হয়। এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছেমাধ্যমিক শিক্ষার মান বৃদ্ধি ও বিস্তারে শারীরিক, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত স্বার্থে পরিপক্ক প্রশাসনিক মনোযোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেনিয়ার একটি গবেষণায় দেখা যায় স্বতন্ত্র প্রশাসন শিক্ষারফলাফল উন্নয়নে সহায়ক।
মাধ্যমিক শিক্ষা অবহেলিত হলে জাতীয় উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত গতিতেএগোবে না। অতএব, আলাদা মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর গঠন এখনআর বিলম্ব করার মতো বিষয় নয়। বাংলাদেশকে দক্ষ মানবসম্পদেসমৃদ্ধ, জ্ঞানভিত্তিক সমাজে রূপান্তরিত করতে হলে মাধ্যমিক শিক্ষাকেসর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশে মাধ্যমিক শিক্ষাকে যথার্থ গুরুত্বদিতে এবং জাতীয় উন্নয়নের সহায়ক করতে একটি স্বতন্ত্র মাধ্যমিকঅধিদপ্তর গঠন আবশ্যিক ও সময়োপযোগী।
লেখক : উপাধ্যক্ষ,মোশাররফ হোসেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ
কাঁচপুর,সোনারগাঁও,নারায়নগঞ্জ

















