ড. মাহরুফ চৌধুরী : শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনে একজন শিক্ষকেরন্যূনতম তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হয়। প্রথমটি হলোশিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা (সেইফ গার্ডিং), দ্বিতীয়টি হলোশিক্ষার্থীর মানসিক ও সামাজিক কল্যাণে সজাগ ও সহানুভূতিশীলথেকে তাকে সাহায্য করা (পাস্টোরাল কেয়ার), এবং তৃতীয়টি হলোশিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত চাহিদা ও সম্ভাবনার প্রতি সংবেদনশীল থেকেশেখার প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা (টিচিং)। এইদায়িত্বগুলো কোনো যান্ত্রিক বা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মতালিকার অংশনয়; বরং তারা একটি অন্তর্গত নৈতিক বন্ধনে আবদ্ধ, যার প্রথমদু‘টির অনুপস্থিতি শেষেরটির কার্যকারিতা ও বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধকরে। এই তিনটি দায়িত্ব একত্রে সামগ্রিক শিক্ষাদান প্রক্রিয়ার ভিত্তিস্থাপন করে। শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা কেবল শারীরিক সুরক্ষায় সীমাবদ্ধনয়, এটি তার মানসিক নিরাপত্তা, পরিচয়ের স্বীকৃতি ও মর্যাদাপূর্ণঅবস্থানকেও নিশ্চিত করাকে বোঝায়। যেখানেই এই নিরাপত্তাব্যাহত হয়, সেখানেই শেখার পরিবেশে বিষ ছড়িয়ে পড়ে। আবারশিক্ষার্থীর সামাজিক–আবেগিক কল্যাণের প্রতি শিক্ষক যদি নিস্পৃহথাকেন, কিংবা তাঁর মধ্যে সহানুভূতির অভাব দেখা দেয়, তবেশিক্ষাদান নিছক তথ্য পরিবেশনের একপেশে প্রয়াসে পরিণত হয়, যারমধ্যে জীবন গঠনের আকাঙ্ক্ষা ও অনুপ্রেরণা অনুপস্থিত থাকে।
প্রখ্যাত ব্রাজিলিয়ান শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ‘নিপীড়িতের শিক্ষা‘ (প্যাডাগোজি অব দ্য অপ্রেসড)–এ বলেছিলেন, ‘পরিচয়ের অনুভূতি ছাড়া, মুক্তির জন্য প্রকৃত সংগ্রাম হতে পারে না’।একজন শিক্ষকের যদি শিক্ষার্থীর অস্তিত্ব, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়েসচেতনতা না থাকে, তবে তাঁর শিক্ষা চর্চা শুধুই প্রভুত্বমূলক হয়ে ওঠে, মুক্তি বা স্বাধীনতার নয়। এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, শিক্ষকের নৈতিকঅবস্থান তাঁর মানবিক প্রতিশ্রুতি দ্বারা নির্ধারিত হয়। তিনি কেবলপাঠদান করেন না, বরং একেকজন শিক্ষার্থীর জীবনে নীরবঅভিভাবকের মতো উপস্থিত থাকেন, বিশেষ করে একজনআশ্রয়দাতা, পথপ্রদর্শক ও সহযাত্রী হিসেবে। তাই, শিক্ষকতার এইতিনটি মৌলিক দায়িত্বের যে কোনো একটি অবহেলার অর্থ শিক্ষকহিসেবে শুধু পেশাগত ব্যর্থতা নয়, বরং নৈতিক বৈকল্যও বটে। যেখানেনৈতিক দায়বদ্ধতা অনুপস্থিত, সেখানে শিক্ষা নয়, বরং ক্ষমতারঅনুশীলনই মুখ্য হয়ে ওঠে। শিক্ষকতার প্রকৃত মূল্যবোধ তাইনির্ধারিত হয় এই প্রশ্নে যে, আমি আমার ছাত্রের নিরাপত্তা, কল্যাণ ওউন্নয়নের জন্য কতটা দায় অনুভব করি?
শিক্ষকের দায়িত্ব কখনোই কেবল শ্রেণিকক্ষের পাঠদানে সীমাবদ্ধ থাকেনা। বরং তা শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের বাইরে বিস্তৃত এক মানবিকজগতেও তাঁর দায়িত্বের পরিধি প্রসারিত হয়। পাঠদান শিক্ষকতারএকটি মৌলিক উপাদান হলেও, তা কেবল বাহ্যিক কাঠামোর দৃশ্যমানকর্মকান্ড। অন্তরের পরিসরে, একজন শিক্ষক হয়ে ওঠেন এক ‘নিরাপদমানুষ’ ও ‘আশ্রয়স্থল‘ যার উপস্থিতিতে একজন শিক্ষার্থী নিজেরঅস্তিত্ব, কৌতূহল, ভুল এবং স্বপ্ন নিয়ে নির্ভয়ে আশ্রয় নিতে পারে। এইবিশ্বাস ও নির্ভরতার জগতেই গড়ে ওঠে এক সুস্থ শিক্ষক–শিক্ষার্থীসম্পর্ক, যার ভিত্তি শুধুই একতরফা জ্ঞানের স্থানান্তর নয়, বরংপারস্পরিক সম্মান, সহানুভূতি ও মানবিক সংযোগ। যখন শিক্ষার্থীতার শিক্ষকের মধ্যে কেবল একজন ‘জ্ঞানদাতা’ নয়, বরং একজনশ্রোতা, একজন সহানুভূতিশীল অভিভাবক, এবং একজন আত্মারদার্শনিক বন্ধুকে আবিষ্কার করে, তখন তার মধ্যে শেখার ইচ্ছা প্রকৃতঅর্থেই জাগ্রত হয়। আত্মবিশ্বাসের যে আলো তার মধ্যে তখন উজ্জ্বলহয়ে ওঠে, তা শুধু পরীক্ষার ফলাফলে নয়, বরং তার আত্মপরিচয়, মূল্যবোধ ও সামাজিক বোধে প্রতিফলিত হয়। সে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠেধ্যানে, জ্ঞানে ও মননে এমন এক নাগরিক হিসেবে, যে শুধু নিজেরজন্যই নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণের দিকেও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
এই প্রসঙ্গে আলবার্ট আইনস্টাইনের অভিমত বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁর মতে, সৃজনশীল প্রকাশ এবং জ্ঞানের মধ্যে আনন্দ জাগ্রত করাশিক্ষকের সর্বোচ্চ শিল্প। একজন প্রকৃত শিক্ষক সেই শিল্পী, যিনিকেবল শিক্ষার্থীর মস্তিষ্ক নয়, তার হৃদয় ও কল্পনাশক্তিকেও জাগিয়েতোলেন। সেই জাগরণেই জন্ম নেয় মুক্ত চিন্তা, ন্যায়বোধ এবংবিবেকের সক্রিয়তা যা একটি সমাজের সজাগ, দায়িত্বশীল ওপ্রগতিশীল নাগরিক তৈরির পূর্বশর্ত। শিক্ষকের এই ভূমিকাকে কেউকেউ ‘অদৃশ্য কারিগর’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। কারণ তিনি যেবীজ বপন করেন, তাৎক্ষণিকভাবে তার ফল দৃশ্যমান না হলেও, ভবিষ্যতের একটি ন্যায্য ও মানবিক সমাজ নির্মাণে তার প্রভাবঅপরিসীম। এই অদৃশ্য শ্রমের ফলাফল পেতে হয়তো সময় নেয়, কিন্তুএকজন শিক্ষার্থীর জীবন যখন আলোর দিকে এগিয়ে যায়, তখনতার প্রতিটি পদক্ষেপেই থাকে তার শিক্ষকের অদৃশ্য ছায়া।
তবে এই মূল্যবান কথাগুলো এখন আর কেবল পাঠ্যসূচির অন্তর্গতনীতিনির্দেশ বা শিক্ষকতা সংক্রান্ত তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যেইসীমাবদ্ধ রাখার সময় নয়। এগুলো অনুসরণ করে কর্মকান্ডপরিচালনা করা আজ এক কঠোর বাস্তবতা, সময়ের জোরালো দাবি।কারণ আজ যখন আমরা দেখি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যা একসময়শিক্ষার্থীর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল, তা নানা কারণেনিরাপত্তাহীনতার ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। যখন কিছু কিছু ঘটনায়শিক্ষকদের নীরবতা, নির্লিপ্ততা বা ক্ষেত্রবিশেষে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষসংশ্লিষ্টতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে, তখন কেবল কণ্ঠে শিক্ষার মূল্যবোধজপে যাওয়ায় আর কোনো মুক্তি নেই। প্রয়োজন নতুন করেদায়বদ্ধতার পুনর্মূল্যায়ন, নৈতিক অবস্থানের সাহসী পুনর্নির্মাণ।আজকের দিনে, যখন শিক্ষার্থীরা শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নেরশিকার হয়, যখন প্রতিষ্ঠানগুলো অভ্যন্তরীণ ন্যায্যতা ও মানবিকআচরণের জায়গায় কখনও ক্ষমতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়, তখনএকজন শিক্ষক হিসেবে চোখ বুজে থাকা মানে শুধু দায়িত্ব এড়ানোনয় বরং তা মানবিক মূল্যবোধের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার নামান্তর।নীতিগতভাবে নিরপেক্ষ থাকা এই পরিস্থিতিতে আসলে এক ধরনেরসক্রিয় নীরবতা, যা অন্যায়ের পক্ষে পক্ষপাত তৈরি করে।
ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, সমাজের যেকোনো সংকটকালেশিক্ষকগণ ছিলেন মূল্যবোধের ধারক ও বাহক। প্রাচীন গ্রীসেসক্রেটিস যেমন তরুণদের যুক্তি ও নৈতিক প্রশ্নবোধে জাগ্রত করেআত্মিক মুক্তির পথ তৈরি করেছিলেন, তেমনি ভারতীয় উপমহাদেশেঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাদর্শনেও মানবিকতাছিল শিক্ষা প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দু। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি একথাই শিক্ষা দেয়যে, একজন শিক্ষক কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেই দায়িত্ব শেষকরেন না, তিনি সমাজের বিবেক হিসেবে কাজ করেন। আজকেরসময়ে এই ভূমিকার পুনরুজ্জীবন একান্ত প্রয়োজন। এখন শিক্ষকতামানেই শুধু পেশাগত দক্ষতা নয়, বরং সামাজিক ও নৈতিক নেতৃত্বেরদাবিও বহন করা। কারণ শিক্ষকদের অবস্থান একটি সমাজে কেবলবিদ্যাদানের নয়, বরং ন্যায়–অন্যায়, মানবিকতা– পাশবিকতারপার্থক্য শেখানোর অনন্য সুযোগও। এই মুহূর্তে সেই ভূমিকার সাহসীপুনর্নির্মাণ, নতুনভাবে আত্মস্থ করা এবং যথাযোগ্য অনুশীলনএকান্ত জরুরি। তা না হলে শিক্ষকতা তার নৈতিক জ্যোতি হারিয়েফেলবে, যা একটি জাতির জন্য গভীর অন্ধকার ডেকে আনবে।
আপনি যদি শিক্ষক হন, কিংবা নিজেকে শিক্ষক ভাবেন, তাহলেনিজেকে জিজ্ঞেস করুন: আপনি কি সত্যিই আপনার পেশাগতজীবনে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ও অতীতের ঘটনাগুলোর দিকে চোখফিরিয়ে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন? ভেবেছেন কি, যে সকলঘটনাপরম্পরায় শিক্ষার্থীরা আহত, অবমানিত বা নিপীড়নের শিকারহয়েছে, সেই ঘটনাগুলোর নেপথ্যে আপনি কোথায় ছিলেন? আপনিকি একজন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন, না নিছক একজন দূরদর্শী পর্যবেক্ষক, যিনি নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে কেবল মাথা নেড়ে ঘটনাপ্রবাহের সাক্ষীহয়ে থেকেছেন? আপনি কি তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, যারাঅন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিল, নাকি নিজের অবস্থান ‘নিরপেক্ষতা’ বলে আড়াল করে নিয়েছিলেন সুবিধাজনক এক নির্লিপ্ততার মধ্যে?যদি এমন কোনো মুহূর্তে আপনি এমন এক জায়গায় ছিলেন, যেখানেঅন্যায়ের ছায়া দীর্ঘ হয়েছিল, যেখানে কণ্ঠরোধের আতঙ্ক ভরকরেছিল, অথচ আপনি চুপ থেকেছেন তাহলে আপনাকে শিক্ষকহিসেবে বিবেচনা করার আগে, নিজের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়তেহবে। কারণ শিক্ষকতা শুধু পাঠ্যবই পড়ানো নয়, এটি একটি নৈতিকঅবস্থান, এক ধরনের মূল্যবোধ–ভিত্তিক নাগরিক দায়িত্ব।
এই প্রসঙ্গে মার্কিন লেখক জেমস বোল্ডউইনের কথা স্মরণ করা যেতেপারে। তিনি বলেছেন, ‘আমরা যা কিছুর মুখোমুখি হই তার সবকিছুইপরিবর্তন করা যায় না; কিন্তু যতক্ষণ না আমরা কোনকিছু মোকাবেলাকরি, ততক্ষণ কিছুই পরিবর্তন করা যায় না’। শিক্ষক হলেন তাঁরশিক্ষার্থীদের কাছে জীবন্ত উদাহরণ ও প্রেরণার উৎস। সবকিছু হয়তোএকা একজন শিক্ষক বদলে দিতে পারবেন না, কিন্তু অন্যায়েরমুখোমুখি না হয়ে, তাকে উপেক্ষা করে, শিক্ষা কখনোই মুক্তির দিশাদেখাতে পারে না। তখন শিক্ষা হয়ে পড়ে প্রথার চর্চা, আর শিক্ষক হয়েওঠেন কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্বকারী মুখপাত্র যার মধ্যেমানবিকতা, প্রতিবাদ কিংবা নৈতিক অবস্থান বলে কিছুই থাকে না।তাই শিক্ষক হিসেবে আমাদের আত্মপরিচয়ের পরীক্ষা হয় সংকটেরসময়েই। যে শিক্ষক অন্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারেন না, শিক্ষার্থীরযন্ত্রণার ভাষা শুনতে পারেন না, অথবা প্রতিষ্ঠানিক স্বার্থরক্ষারমোড়কে মৌনতার আশ্রয় নেন, তিনি শিক্ষা নামক পবিত্র দায়িত্বেরবিপরীতে আত্মসমর্পণ করেন ক্ষমতার কাছে কিংবা নিজের স্বার্থেকাছে। ফলে তাঁকে নিজের পরিচয়, নিজের ভূমিকা ও নিজের নীরবতানিয়ে প্রশ্ন করতেই হবে। নইলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জেগে ওঠা ‘শিক্ষারউপর বিশ্বাস’ নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
একজন শিক্ষক কেবল তথ্যের বাহক নন; তিনি হলেন বিবেকেরদীপশিখা। সেই আলো নিভে গেলে সমাজ অন্ধকারে ডুবে যায় আরসেই দায় কার, তা নির্ধারণের জন্য খুব বেশি দূরে তাকাতে হয় না।তাকাতে হয় কেবল আয়নায়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, শিক্ষকতানিছক একটি পেশা নয়; এটি একটি আদর্শিক অবস্থান, এক গভীরমানবিক অঙ্গীকার। এটি এমন কোনো পেশাগত পথ নয়, যেখানেকেবল নির্দিষ্ট সময়ের বিনিময়ে নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করে দায়িত্ব শেষহয়। বরং এটি এমন এক অভিযাত্রা, যেখানে একজন মানুষআরেকজন মানুষের মনের দরজায় কড়া নাড়ে, তাকে জাগিয়ে তোলে, এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের বীজ বপন করে। শিক্ষকতামানে শুধু পাঠ্যবই পড়ানো নয়; এর অর্থ জীবন সম্পর্কে পড়ানো তথাআত্মমর্যাদা, সংবেদনশীলতা ও বিবেকের পাঠ শেখানো। এখানেপ্রতিটি পাঠের অন্তরালে থাকে মানবিকতা, প্রতিটি উত্তরের অন্তর্নিহিতথাকে প্রশ্ন করার সাহস, আর প্রতিটি সংলাপের মধ্যে লুকিয়ে থাকেভবিষ্যতের ন্যায়পরায়ণ নাগরিক গড়ার প্রেরণা। যে শিক্ষক তাঁরশিক্ষার্থীদের কেবল পরীক্ষায় পাস করাতে চান, তিনি শিক্ষকতারবাইরের খোলসটাকে ছুঁয়ে যান মাত্র। কিন্তু যিনি তাঁদের মনে প্রশ্নজাগাতে চান, তাঁদের হৃদয়ে প্রতিবাদের আগুন জ্বালাতে চান, তাঁদেরআত্মায় মানবিকতার বীজ রোপণ করতে চান তিনিই তো প্রকৃতশিক্ষক।
শিক্ষকতার এই পেশাগত শিক্ষাদর্শনের রূপকাররা ইতিহাসেঅগণিত। সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর কবিতায় বলেছিলেন, ‘শিক্ষা মানেশুধু পরীক্ষা নয়, শিক্ষা মানে যুদ্ধ’। এ যুদ্ধ অজ্ঞতার বিরুদ্ধে, নিপীড়নের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। একজন শিক্ষক তাঁরশ্রেণিকক্ষকে একটি মুক্ত আলোচনার মঞ্চে পরিণত করেন, যেখানেছাত্র শুধু শুনতে, বলতে, পড়তে ও লিখতে শিখে না, সাথে সাথেভাবতে শেখে; শুধু বোঝে না, প্রশ্ন তোলে; শুধু অনুসরণ করে না, নিজউদ্যোগে পথ খুঁজে নেয়। এইভাবে শিক্ষকতা হয়ে ওঠে এক মহৎপ্রতিশ্রুতি যা শুধু বিদ্যাদানের নয়, বরং ন্যায় ও মানবিকতার পক্ষেদাঁড়াবার প্রতিশ্রুতি। একজন শিক্ষক তাঁর নিজের অস্তিত্ব দিয়েশিক্ষার্থীদের শেখান কিভাবে সবলের বিপরীতে দুর্বলের পক্ষে দাঁড়াতেহয়, কিভাবে নিজের কণ্ঠকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সজীব রাখতে হয়, কিভাবে নিপীড়নের মুখেও মানবিক অটলতা ধরে রাখতে হয়। এইপ্রতিশ্রুতি ব্যক্তিগত ঝুঁকির মধ্যেও আদর্শকে অগ্রাধিকার দিতেশেখায়; এটিই শিক্ষকতার মর্মবস্তু। বর্তমান সময়ের অস্থির, বৈষম্যপূর্ণসমাজে, যেখানে তথ্যের আধিক্য আছে কিন্তু নীতির সংকট প্রকট, সেখানে একজন শিক্ষক তাঁর বিবেক, সাহস ও সহানুভূতির মাধ্যমেনতুন প্রজন্মকে শুধু পথ দেখান না, শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি হয়েওঠেন আলো বহনকারী, নীরব বিপ্লবের নেতৃত্বদানকারী।
একজন প্রকৃত শিক্ষক তাঁর উপস্থিতিকে শিক্ষার্থীদের জন্য কেবলপাঠদানের মাধ্যম নয়, বরং একটি আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে তোলেন।এই আশ্রয় নিছক শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।এটি এক ধরনের মানসিক, মানবিক ও নৈতিক নিরাপত্তাবোধ, যাশিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদা এবং স্বপ্নের ভিত্তি নির্মাণ করে।শিক্ষার্থীরা যখন তাঁর চোখের দিকে তাকায়, তখন তারা খুঁজে পায়এক ধরণের নিশ্চিন্ত ভরসা; তাঁর কণ্ঠে শুনতে পায় ন্যায়বোধের একস্থির, অবিচল উচ্চারণ; আর তাঁর অবস্থানে তারা দেখতে পায় একদৃঢ় নৈতিক অবস্থান, যা কোনো চাপে, কোনো সুবিধার মোহে বিচলিতহয় না। এই বিশ্বাস, এই নির্ভরতা একদিনে জন্মায় না, এবংপাঠদানের নিপুণতা দিয়ে একে অর্জনও করা যায় না। এর জন্যপ্রয়োজন হয় হৃদয়ের প্রশস্ততা, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী তার পরিচয়, প্রেক্ষাপট, দুর্বলতা ও সম্ভাবনা নিয়ে সমান মর্যাদায় স্থান পায়।প্রয়োজন হয় নৈতিক বোধের দৃঢ়তা, যা শিক্ষককে ন্যায়ের পক্ষেঅবিচল রাখে, এমনকি যখন তা অসুবিধাজনক বা জনপ্রিয় নয়।এবং সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় মানবিক সহানুভূতির গভীর চর্চা যারমাধ্যমে একজন শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীর অদৃশ্য যন্ত্রণা, নিঃশব্দসংকট এবং নিগূঢ় আকাঙ্ক্ষাকে অনুভব করতে পারেন।
এই প্রসঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলারকথাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছেন. ‘শিক্ষা হল সবচেয়েশক্তিশালী অস্ত্র যা ব্যবহার করে তুমি পৃথিবী পরিবর্তন করতেপারো‘। কিন্তু এই ‘অস্ত্র’ যদি একজন শিক্ষকের হাতেই থাকে, তবেতাঁর হৃদয় না থাকলে, তাঁর নৈতিকতা না থাকলে, তা আরপরিবর্তনের অস্ত্র নয় বরং তা হয়ে ওঠে নিছক তথ্য সঞ্চালনের যন্ত্র।একজন প্রকৃত শিক্ষক তাই জ্ঞানের বাহক নন শুধু, তিনি হয়ে ওঠেনকরুণা, ন্যায় ও স্বপ্নের ধারক। শিক্ষার্থীরা শিক্ষককে যখন কেবলপাঠদাতা হিসেবে নয়, বরং এক মানবিক সত্তা হিসেবে দেখতে শেখেযিনি তাঁদের পাশে দাঁড়ান, তাঁদের মতামতকে মূল্য দেন, এবং তাঁদেরসত্যিকার সম্ভাবনার খোঁজ করেন, তখনই গড়ে ওঠে শিক্ষা নামকসম্পর্কের গভীরতম বন্ধন। এই সম্পর্কের বুননেই জন্ম নেয় ভবিষ্যতেরদায়িত্বশীল, নৈতিক ও মননশীল নাগরিক। প্রকৃতপক্ষে একটি জাতিরভবিষ্যৎ নির্মিত হয় তার শিক্ষকদের হাত ধরে। সে কারণেই বলা হয়েথাকে, ‘শিক্ষকেরাই জাতির কারিগর‘। তারা কেবল ছাত্র নয়, গড়েতোলেন ভবিষ্যতের নাগরিক, চিন্তক, নেতা, শিল্পী, নীতিনির্ধারক ওসমাজ–পরিবর্তক। তাই একজন শিক্ষক যখন সত্যিকার অর্থেদায়িত্বশীল হন, তখন তাঁর কর্মক্ষেত্র কেবল শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ থাকেনা; বরং তাঁর স্নেহ, ন্যায়বোধ এবং নৈতিক অবস্থান দিয়েই তিনিসমাজের ভিত গড়ে তোলেন। একটি শিক্ষার্থী যদি তাঁর শিক্ষকেরমধ্যে সাহস দেখে সত্যের পক্ষে দাঁড়াবার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখখোলার, ন্যায় ও মানবিকতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকার সাহসতাহলে সেই শিক্ষার্থীও সাহসী হয়ে ওঠে। সাহস তখন সংক্রামিত হয়; শিক্ষা হয়ে ওঠে প্রতিবাদের, প্রতিবিম্বনের এবং প্রয়োজনে ক্ষমতাবানেরবিপরীতে দাঁড়ানোর ভাষা।
শিক্ষক যদি ভালোবাসা দেন, যেটা নির্বাচনহীন, নিঃস্বার্থ ও আত্মিকভালোবাসা, তাহলে শিক্ষার্থীর মধ্যে গড়ে ওঠে এক প্রকার বিশ্বাস, যাতাকে মানুষ হতে শেখায়। সেই ভালোবাসা থেকে জন্ম নেয় সহানুভূতি, ভ্রাতৃত্ব, পরোপকার এবং দায়িত্ববোধ। যেমন রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘শিক্ষা সেই, যা মানুষকে শুধু তথ্য দেয় না, মানুষ করে’। এই ‘মানুষকরে তোলা’র পেছনে সবচেয়ে বড় হাত একজন শিক্ষকেরই যিনিনিজে মানুষ হয়ে ওঠেন, এবং তাঁর ছাত্রদের মানুষ করে তোলেন। আরযখন একজন শিক্ষক ন্যায়বোধ শেখান তা শুধু কথায় নয়, তাঁরনিজের অবস্থানে, ব্যবহারে এবং নীরব প্রতিরোধে। তখন শিক্ষার্থীরাঅনুধাবন করে সমাজ কেবল নিয়ম বা আইন দিয়ে চলে না; এরপ্রাণশক্তি আসে ন্যায়, বিবেক ও সহানুভূতির মতো নৈতিক গুণাবলিথেকে। তখন শিক্ষার্থীরা বড় হয়ে শুধু পেশাজীবী নয়, ন্যায়নিষ্ঠনাগরিক হয়ে ওঠে যারা নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তরকল্যাণের কথা ভাবে।
পারস্যের দার্শনিক সুফি কবি ও গণিতজ্ঞ রুমি এক জায়গায়লিখেছিলেন, ‘তুমি কি এখনও জানো না? তোমার আলোই পৃথিবীকেআলোকিত করে’। এই আলো, এই অন্তর্জাগতিক দীপ্তিই একজনশিক্ষক থেকে শিক্ষার্থীর হৃদয়ে প্রবাহিত হয়। আর সেখান থেকেইআলোকিত হয় একটি সমাজ, একদিন আলোকিত হয় একটি জাতি।এই কারণেই শিক্ষকতা কোনো চাকরি নয়, এটি একটি দায়িত্ব, একটিত্যাগ, একটি নৈতিক অভিযাত্রা। সেই অভিযাত্রায় একজন শিক্ষকযখন তাঁর পথটিকে সত্য, সাহস ও ভালোবাসার আলোয় আলোকিতকরেন, তখন তাঁর ছাত্রেরা শুধু পাস করে না, উত্তীর্ণ হয় মানুষ হয়েওঠার পরীক্ষায়। এই সময় যখন সমাজ নানা প্রতিকূলতা, বিভ্রান্তি ওঅনিশ্চয়তার মধ্যে পথ খুঁজছে, যখন মূল্যবোধের সংকট, বিভাজনেররাজনীতি ও নিঃসংগত অন্যায় ঘনীভূত হয়ে উঠছে ঠিক তখনইএকজন শিক্ষকের ভূমিকা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেকবেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ এই অস্থির সময়ে শিক্ষকই হতেপারেন স্থিরতার প্রতীক, নৈতিক পথপ্রদর্শক এবং মানবিক সংলাপেরসূচনাকারী।
বর্তমান সময় আমাদের শিক্ষকতাকে কেবল পেশাগত দক্ষতা দিয়েবিচার করতে দিচ্ছে না। এখন প্রয়োজন প্রতিটি শিক্ষকের নিজেরভূমিকা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা। তাঁর অবস্থান, নীরবতা, কিংবাঅবস্থানহীনতাকে নৈতিক আত্মসমালোচনার চোখে নতুন করে দেখা।আত্মসমালোচনা ও আত্মপর্যালোচনার এই দায় এড়ানোর সুযোগনেই, কারণ শিক্ষার্থীরা আর শুধু পাঠ শিখতে চায় না। তারাশিক্ষককে দেখে, বুঝতে চায় তাঁর অবস্থান, অনুধাবন করতে চায়তিনি সত্যের পক্ষে আছেন কিনা। শিক্ষকতার মূল হৃদয়ে রয়েছে একধরণের নৈতিক সাহস যা প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের চাপকে অগ্রাহ্য করে, সামাজিক প্রতিকূলতার সামনে দাঁড়ায়, এবং প্রতিটি অসহায়শিক্ষার্থীর কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে। এই সাহসই শিক্ষককে শিক্ষক করেতোলে, নাহলে তিনি হয়ে ওঠেন কেবল একজন পাঠদাতা, যিনি পঠিতপাঠদানের বাইরে শিক্ষার্থীদের জন্য আদর্শ হয়ে ওঠতে পারেন না।
এই প্রসঙ্গে স্মরণ করা যায় ভারতীয় শিক্ষাবিদ জে. কৃষ্ণমূর্তির একটিগভীর উপলব্ধির কথা। তাঁর মতে, ‘প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব বন্ধহয়ে গেলেই প্রকৃত শিক্ষা লাভ হয়’। যেখানে প্রতিযোগিতা থেমে যায়, সেখানে শুরু হয় প্রকৃত শিক্ষা। এই শিক্ষা শুরু হয় তখনই, যখনএকজন শিক্ষক নিজেকেই প্রশ্ন করতে শেখেন, নিজেকে বিবেকেরমুখোমুখি দাঁড়ান: আমি যা বলছি, তা কি আমি নিজেই পালন করছি? আমি কি শিক্ষার্থীদের সামনে এমন এক মানবিক প্রতিমূর্তি তুলেধরছি যা তারা অনুসরণ করতে পারবে? শিক্ষকতা তাই শুধুই শেখানোনয়, এটি প্রতিনিয়ত এই প্রশ্নগুলোর সম্মুখীন হওয়া যে, আপনি কিসত্যিই শিক্ষকের মতো আচরণ করছেন? আপনি কি কেবল একজনপ্রতিষ্ঠান–নির্ভর পেশাজীবী, নাকি একজন আদর্শ–বাহক মানুষ? আপনি কি নীরব দর্শক, নাকি অন্যায়ের বিরুদ্ধে অতন্ত্রপ্রহরী ওঅটল কণ্ঠস্বর? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা কষ্টদায়ক হতে পারে, কিন্তু এগুলোর মুখোমুখি হওয়া ছাড়া শিক্ষকতা পূর্ণতা পায় না। বরংএখান থেকেই শিক্ষকতার পুনর্জাগরণ শুরু হয় যেখানে সাহস, সহানুভূতি এবং ন্যায়বোধ মিলিয়ে গড়ে ওঠে এমন এক ভূমিকা, যাবদলে দিতে পারে শুধু শ্রেণিকক্ষ নয়, পুরো সমাজকেও।
শিক্ষকতা কখনোই কেবল পেশাগত দায়িত্ব পালনের আরামদায়কছায়াতলে আশ্রয় নেওয়া নয়; এটি একটি সচেতন নৈতিক অবস্থান, একটি জীবন্ত মানবিক প্রতিশ্রুতি, যা প্রতিনিয়ত আত্মসমালোচনারআয়নায় নিজেকে যাচাই করে। শিক্ষক কেবল সেই মানুষটি নন, যিনিশ্রেণিকক্ষে পাঠ দেন; তিনি সেই মানুষ, যাঁর উপস্থিতি একজনশিক্ষার্থীর জীবনবোধ, ন্যায়ের অনুভব এবং মানবিকআত্মসচেতনতার ভিত গড়ে তোলে। আজকের বাস্তবতায়, যখনসমাজ জর্জরিত বৈষম্য, সহিংসতা ও মানবিক বিচ্যুতিতে, তখনএকজন শিক্ষকই পারেন সেই আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতে, যিনিশিক্ষার্থীদের শুধু পেশার জন্য নয়, জীবনের জন্য প্রস্তুত করেন।সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, সাহসের সঙ্গে প্রতিবাদ জানানো, এবংনিপীড়িতের পাশে থাকা র মত এই প্রতিটি মানবিক গুণ একজনশিক্ষকের নিকট শুধু বিকল্প নয়, বরং অনিবার্য। কারণ শিক্ষকতামানেই ভবিষ্যৎ গড়ার শপথ এবং সেই ভবিষ্যৎ শুধু সনদের সংখ্যা বাপাসের হার দিয়ে নয়, পরিমাপ হয় বিবেকবান, ন্যায়পরায়ণ এবংমানবিক নাগরিক তৈরির ক্ষমতা দিয়ে। তাই বর্তমান সময়ের একজনশিক্ষককে নতুন করে ভাবতে হবে নিজেকে নিয়ে; নিজের নীরবতা, নিজের অবস্থান এবং নিজের সাহসিকতা নিয়ে। কারণ একমাত্রতিনিই পারেন সেই অদৃশ্য কারিগরের ভূমিকায় উত্তীর্ণ হয়ে সমাজেরভিত্তি নতুন করে নির্মাণ করতে। তাই শিক্ষক হিসেবে আপনার কাছেপ্রশ্ন রইলো, আপনি কি সত্যিই শিক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রস্তুতকরছেন? যদি না করে থাকেন, আপনি কি এখন নিজেকে তৈরি করতেইচ্ছুক? তাহলে আজই আপনার নৈতিক অবস্থান ও মানবিকপ্রতিশ্রুতির অঙ্গীকার বাস্তবায়নে যাত্রা শুরু করুন।
ড. মাহরুফ চৌধুরী, ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটিঅব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য। Email: mahruf@ymail.com









