
- আব্দুল হাই চৌধুরী শানু
১) জুলাই ২০২৪—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ। যৌক্তিক কারনেই এটি বোঝার জন্য আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ১৯৭১ ও ১৯৯০-এর দিকে—দুটি ঐতিহাসিক জনআকাঙ্ক্ষার মুহূর্ত, যা সাধারন মানুষের বিপুল ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হলেও শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা পায়নি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি স্বাধীন, শোষণমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্নের সূচনা। কিন্তু স্বাধীনতার পর বাকশাল করে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দুর্নীতি ও সামরিক শাসনের কারণে সেই স্বপ্ন ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যায়। আবার এরশাদের বিরুদ্ধে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান আমাদের জন্য গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি করলেও, পরবর্তীতে দলীয় দ্বন্দ্ব, প্রতিহিংসা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতায় সেই সম্ভাবনাও ভেঙে পড়ে। ফলে গণতন্ত্র টিকে থাকলেও তার মূল চেতনা দুর্বল হয়ে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে, জুলাই ২০২৪—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন সন্ধিক্ষণ, এক নির্ধারণী মুহূর্ত হয়ে আসে। এটি কোনো ক্ষণিক আবেগের বিস্ফোরণ নয়; এটি রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে দীর্ঘদিনের বিকৃতি, বঞ্চনা ও অবিচারের বিরুদ্ধে জনগণের সংগঠিত, সচেতন ও ত্যাগী প্রতিরোধ ছিল। প্রায় ১৪০০ ছাত্র-জনতার আত্মদান এবং ৩০,০০০-এরও বেশি মানুষের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে এক নির্মম সত্য উন্মোচন করেছে—এই রাষ্ট্রকে আর কোন “সংশোধন” করে চালানো যাবে না; একে নতুন করে “সংস্কার” করতেই হবে।
২) এই বাস্তবতায় “সংশোধন” ও “সংস্কার” শব্দদ্বয় কেবল ভাষাগত পার্থক্যের বিষয় হিসাবে জন্ম হয়নি বরং এটি নতুন রাজনৈতিক অবস্থান, দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার প্রশ্ন হিসাবে এসেছে। আমরা জানি যে, বাংলা একাডেমির অভিধান অনুযায়ী, সংশোধন বলতে বোঝায় কোনো ভুল, ত্রুটি বা অসঙ্গতি দূর করে তাকে শুদ্ধ বা সঠিক করা—অর্থাৎ মূল কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখে সীমিত পরিসরে পরিবর্তন করা।
অন্যদিকে, সংস্কার বলতে বোঝায় পরিমার্জন বা পুনর্গঠনের মাধ্যমে কোনো কিছুকে আরও শুদ্ধ, কার্যকর ও সময়োপযোগী করে তোলা—যেখানে প্রয়োজনে পুরোনো কাঠামোকেও নতুনভাবে বিন্যস্ত করা হয়। এই সংজ্ঞাগত পার্থক্যই মূলত আজকের রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। সংশোধন যেখানে ত্রুটি সারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ, সংস্কার সেখানে পুরো ব্যবস্থাকে ঢেলে পুনর্নির্মাণের সাহসী প্রয়াস। কিন্তু দুঃখজনক হলো, আমাদের সংবিধান-বিশেষজ্ঞ সেজে থাকা কিছু জ্ঞানপাপী বিতর্কিত ১৯৭২ সালের সংবিধানের দোহাই দিয়ে সংবিধান সংশোধন ও সংস্কারের পার্থক্যের মূল স্পিরিটকে ইচ্ছাকৃতভাবে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছেন।
৩) ১৯৭২ সালের সংবিধান আমাদের স্বাধীনতার গুরুত্বপূর্ন দলিল—এটি অস্বীকারের কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু গত পাঁচ দশকের বাস্তবতা প্রমাণ করেছে, বারবার সংশোধনের মাধ্যমে এই সংবিধানকে একটুও সময়োপযোগী করা যায়নি; বরং অনেক ক্ষেত্রে তা ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বিশেষ করে পতিত শেখ হাসিনা এই সংবিধানকে মনের মতো করে কাটাছেড়া করে এবং সংবিধানের বিভিন্ন ধারার দোহাই দিয়ে বিগত ১৭ বছর ধরে বাংলাদেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। ফলে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত দুর্বল হয়েছে, বিচার বিভাগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, প্রশাসনের সর্বস্তরে দলীয়করণ গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে, এবং নাগরিক অধিকার ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবতায় সংশোধনের রাজনীতি মূলত একটি স্থিতাবস্থার রাজনীতি—যা পরিবর্তনের ভান সৃষ্টি করে, কিন্তু প্রকৃত কোনো পরিবর্তন আনতে পারে না।
৪) এই সংশোধন-নির্ভর রাজনীতির ক্ষতিকর প্রভাব অতীতে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় নগ্নভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। যেমন—
১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসন (বাকশাল) প্রতিষ্ঠার চেষ্টা রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করে এবং বড় পরিবর্তনের পথ তৈরি করে। পরবর্তীতে পঞ্চম সংশোধনী সামরিক শাসনকে বৈধতা দিলেও গণতান্ত্রিক ভিত্তি শক্ত না করে বিভাজনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। ১৯৯৬ সালের ত্রয়োদশ সংশোধনীর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সাময়িক আস্থা ফিরিয়ে আনলেও, এর ওপর অতিনির্ভরতা রাজনৈতিক সক্ষমতা উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে এবং ২০০৬–০৭ সালের সংকটে এর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়। ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীতে এ ব্যবস্থা বাতিলের পর নির্বাচনী আস্থার সংকট আরও গভীর হয়, যা ২০১৪ এর বিনাভোট , ২০১৮ এর রাতের ভোট ও ২০২৪ সালের আমি ডামি নির্বাচনকে ঘিরে দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক সৃষ্টি করে। তাই, এটা ইতোমধ্যে প্রমানিত যে, শুধু সংবিধান সংশোধন রাষ্ট্রীয় সংকটের স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে তা সমস্যাকে দীর্ঘায়িত করেছে।
৫) একই ধারাবাহিকতায় বিগত জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর ভূমিকাও কঠোর সমালোচনার দাবি রাখে। দলটির রাস্ট্র মেরামতের ৩১ দফার ১ম দফাতে সংস্কারের কথা বলা হলেও নির্বাচন পরবর্তী দলটি বহু সময় মৌলিক রাষ্ট্রসংস্কারের পরিবর্তে সংশোধনকেন্দ্রিক অবস্থান নিয়েছে—যা হয়তো দলের তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে গ্রহণযোগ্য ছিল, কিন্তু সময়ের আবর্তে আজ তা এক গভীর কৌশলগত দুর্বলতায় পরিণত হয়েছে। জুলাই-পরবর্তী বাস্তবতায় যখন “জুলাই সনদ”, গণভোট, বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা, গুম-সংক্রান্ত কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও পুলিশ কমিশনের মতো মৌলিক প্রস্তাব সামনে এসেছে, তখন এগুলোকে দীর্ঘসূত্রতায় ঝুলিয়ে রাখা বা স্পষ্ট অবস্থান না নেওয়া জনগণের কাছে একটি নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। এটি প্রমাণ করে, সংশোধনের পুরনো রাজনীতি এখনো দলটির চিন্তার ভেতরে প্রভাব বিস্তার করছে। নইলে যেভাবে ব্যাংক রেগুলেশন অধ্যাদেশটি সামান্য পরিবর্তন করে আইনে রুপান্তর করা হয়েছে বাকীগুলিও সেভাবে করা হতো। তাহলে আর সন্দেহের অবকাশ থাকতো না।
৬) আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সিভিল সোসাইটিতে এ বিষয়ে ক্রমবর্ধমান সমালোচনা দেখা যাচ্ছে। বিশেষত বিএনপি-ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অনেক বুদ্ধিজীবীও এই প্রশ্নে দৃঢ়, সুসংহত ও বিশ্বাসযোগ্য অবস্থান নিতে পারছেন না। যেমন—দিলারা চৌধুরী, মাহফুজ উল্লাহ, শাখাওয়াত হোসেন শায়ন্ত—এদের মতো ব্যক্তিত্বদের কাছ থেকেও সংস্কার ইস্যুতে বিএনপির পক্ষে শক্তিশালী ও সুস্পষ্ট যুক্তি উঠে আসছে না। অন্যদিকে, বিএনপির এই অবস্থানের প্রতিবাদ জানিয়ে সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হল শাখার এক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছাত্রদল ও বিএনপির রাজনীতি থেকে পদত্যাগ করেছেন—যা পরিস্থিতির গভীরতা ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার একটি তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে। তাই বলা যায়, এটি কেবল একটি রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়; বরং একটি স্পষ্ট নীতিগত শূন্যতা, যেখানে দলীয় অবস্থান ও বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যাখ্যার মধ্যে একটি প্রকট বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে। এছাড়া আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বডি ল্যাঙ্গুয়েজেও এমন একটি দ্বিধাগ্রস্ততা প্রতীয়মান হচ্ছে, যেন বিষয়টি তাদের সুস্পষ্ট নীতিগত অবস্থানের পরিবর্তে ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতিফলন। মনে রাখা জরুরি, একটি সমাজের ছাত্র সমাজ ও সিভিল সোসাইটি কেবল মতামত প্রদানকারী গোষ্ঠী নয়; বরং রাষ্ট্র ও রাজনীতির নৈতিক দিকনির্দেশনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
৭) আজকের বাস্তবতা অত্যন্ত স্পষ্ট—১৪০০ প্রাণের আত্মত্যাগ কোনো সংশোধনের জন্য নয়; বরং এটি একটি নতুন রাষ্ট্রচিন্তার জন্য। ৩০,০০০ মানুষের রক্তক্ষরণ হয়েছে কোনো আংশিক পরিবর্তনের জন্য নয়; এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক, সমতাভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক এবং অংশগ্রহণমূলক কল্যাণ রাষ্ট্রব্যবস্থার দাবিতে। এই ত্যাগের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানাতে হলে রাষ্ট্রকে এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে, যেখানে বিচার বিভাগ সত্যিকারের স্বাধীন হবে, মানবাধিকার নিশ্চিত হবে, প্রশাসন জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য বাস্তব অর্থে প্রতিষ্ঠিত হবে। এই ইতিহাসের রক্তাক্ত অধ্যায়ে আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম ও আনাসসহ অসংখ্য তরুণের আত্মদান কেবল শোকের নাম নয়; এটি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের নৈতিক ভিত্তি। তাঁদের জীবনদানের মধ্য দিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠে এসেছে, তা আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই—এটি এখন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের প্রশ্ন।
৮) অতএব, আজকের প্রশ্নটি আর তাত্ত্বিক নয়; এটি রাজনৈতিক সাহসের প্রশ্ন। আমরা কি সংশোধনের পুরনো, ব্যর্থ ও সীমাবদ্ধ পথেই হাঁটব, নাকি ইতিহাসের এই নির্মম শিক্ষা থেকে উঠে এসে একটি মৌলিক রাষ্ট্রসংস্কারের পথে এগিয়ে যাব? বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক শক্তির জন্যই এটি একটি নির্ণায়ক পরীক্ষা—তারা কি জনগণের ত্যাগের মর্যাদা দেবে, নাকি আবারও আপসকামী সংশোধনের আড়ালে বাস্তব পরিবর্তনকে এড়িয়ে যাবে। বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনীতি এই সংস্কারকে ঘিরেই পরিচালিত হবে। যে রাজনৈতিক দল এটি ঠিকভাবে বুঝতে ও ধারণ করতে পারবে না, তারা বাস্তবতাই বাংলাদেশের আগামীর রাজনীতিতে বাতিলের খাতায় চলে যাবে। এর বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
৯) ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো—রক্তের বিনিময়ে অর্জিত পরিবর্তন কখনোই অর্ধেক পথে থেমে থাকে না। সেটি শেষ পর্যন্ত একটি নতুন রাষ্ট্র, নতুন রাজনীতি এবং নতুন ভবিষ্যতের ভিত্তি নির্মাণ করেই থামে। সমাজতাত্ত্বিক Theda Skocpol তার ‘social revolution’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, যখন রাষ্ট্র ও সামাজিক কাঠামোর গভীর সংকট রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মাধ্যমে বিস্ফোরিত হয়, তখন সেই প্রক্রিয়া কেবল শাসক পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ থাকে না—বরং রাষ্ট্রের কাঠামো, শ্রেণি সম্পর্ক এবং ক্ষমতার ভিত্তিকে মৌলিকভাবে পুনর্গঠন করে। ফলে এমন পরিবর্তন স্বভাবতই পূর্ণাঙ্গ রূপান্তরের দিকে অগ্রসর হয়, মাঝপথে থেমে থাকার সুযোগ থাকে না।
১০) তাই বলা যায়, সংস্কারের কাংখিত লক্ষ্য কখনোই মাঝপথে থেমে থাকার নয়। ইতিহাসের গতি ও জনআকাঙ্ক্ষার চাপ বারবারই প্রমাণ করেছে—যে পরিবর্তন একবার সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তায় গভীরভাবে প্রোথিত হয়, তা শেষ পর্যন্ত তার গন্তব্যে পৌঁছাতেই বাধ্য। হয়তো তার মূল্য দিতে হতে পারে আরও ১৪০০ কিংবা ১৪,০০০ প্রাণের বিনিময়ে—তবুও ইতিহাসের নির্মম ও অনিবার্য সত্য হলো, সেই কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর একসময় অর্জিত হবেই। সময় হয়তো দীর্ঘায়িত হতে পারে, পথ হয়তো জটিল ও রক্তাক্ত হতে পারে; কিন্তু জনগণের আকাঙ্ক্ষা, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব মিলিয়ে বাংলাদেশ হয়তো ধীরে ধীরে সেই অনিবার্য পথেই এগিয়ে যাচ্ছে। এটি কোনো সরল যাত্রা নয়—বরং টানাপোড়েন, সংঘাত ও পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলার এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া।
(চলবে)





















