মুহাম্মদ শরীফুজ্জামান: দুদিনের এডিনবরা সফর। সময়ের হিসাবে খুব বেশি নয়, কিন্তু অভিজ্ঞতার ঝুলিতে জমা হওয়া স্মৃতি আর অনুভূতির বিচারে যেন দীর্ঘ এক ভ্রমণ। প্রিয়ভাজন চাচা অ্যাডভোকেট শাহনুর চৌধুরীর আমন্ত্রণেই এই সফর। তাঁর সঙ্গে ঘুরে ঘুরে স্কটল্যান্ডের রাজধানী এডিনবরা ও আশপাশের ঐতিহ্যময় স্থাপনা, দর্শনীয় স্থান এবং ইতিহাসের নানা অধ্যায় দেখার সুযোগ হয়েছে।
এডিনবরা যেন সত্যিই পাথরের গায়ে লেখা এক পুরোনো কবিতা—যে কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তিতে ইতিহাস, প্রতিটি শব্দে স্থাপত্য আর প্রতিটি বিরতিতে মিশে আছে নীরব সৌন্দর্য।
পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে থাকা দুর্গ, ঝিরঝিরে বাতাসে ভরা নিরিবিলি সরু গলি, শতবর্ষী অট্টালিকা, গির্জার ঘণ্টাধ্বনি আর দূরে ফার্থ অব ফোর্থের নীল রেখা—সব মিলিয়ে শহরটি যেন ইতিহাসের বুক থেকে উঠে আসা কোনো দীর্ঘশ্বাস। অথচ সেই দীর্ঘশ্বাসের ভেতরেও আছে কবিতা, কল্পনা আর এক ধরনের মায়াময় বিষণ্নতা।

ইতিহাসের অলিগলি ধরে
হপ-অন হপ-অফ বাসে ওয়াটারলু প্লেস থেকে আমাদের যাত্রা শুরু। বাসের জানালার বাইরে তাকালেই একে একে খুলে যেতে লাগল ইতিহাসের পুরোনো পাতা।
দূরে চোখে পড়ল এডিনবরা ক্যাসেল—আগ্নেয়শিলার ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এক নীরব প্রহরী। শত শত বছরের ইতিহাসের সাক্ষী এই দুর্গ যেন পুরো শহরের ওপর আজও তার প্রাচীন ছায়া বিস্তার করে রেখেছে।
তার নিচে রয়্যাল মাইল। পাথর-বিছানো এই ঐতিহাসিক পথ ধরে হাঁটলে মনে হয়, সময় যেন হঠাৎ পেছনের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে। দুই পাশে পুরোনো ভবন, গলিপথ আর স্থাপত্যের নানা নিদর্শন—সবকিছু মিলে পথটি যেন জীবন্ত ইতিহাসের বই।
সেন্ট জাইলস ক্যাথেড্রালের গাম্ভীর্য, গ্রেফ্রিয়ার্স ববির ছোট্ট অথচ অমলিন ভালোবাসার গল্প, হলিরুডহাউস প্রাসাদের রাজকীয় স্মৃতি আর তার পাশেই মাথা তুলে থাকা আর্থার’স সিট—সব মিলিয়ে এডিনবরা যেন ইতিহাসের এক দীর্ঘ উপন্যাস।
এই শহরে পুরোনোর পাশে নতুনও আপন স্বরে কথা বলে। হলিরুডহাউসের কাছেই আধুনিক স্কটিশ পার্লামেন্ট ভবন দাঁড়িয়ে আছে। স্থাপত্যের ভাষা আলাদা, সময়ের পরিচয়ও আলাদা; তবু পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তারা যেন অতীত ও ভবিষ্যতের এক আশ্চর্য সংলাপ রচনা করেছে।

আর ক্যালটন হিলে উঠলে তো পুরো এডিনবরা এক মুহূর্তে চোখের সামনে এসে ধরা দেয়। নিচে পুরোনো নগরী, দূরে পাহাড়, তারও ওপারে জলের নীল রেখা। সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে যখন শহরের ওপর নেমে আসে, তখন এডিনবরাকে আর শুধু শহর বলে মনে হয় না—মনে হয়, কোনো শিল্পী যেন পাথর, পাহাড়, আলো আর আকাশ দিয়ে একটি বিশাল ক্যানভাস এঁকেছেন।
রাজকীয় স্মৃতির দরজায়
সময় হাতে থাকায় এক পর্যায়ে পথ গড়াল লেইথের দিকে। সেখানে রয়্যাল ইয়ট ব্রিটানিয়া। রাজপরিবারের একসময়ের সমুদ্রযাত্রার স্মৃতি বহন করা এই রাজকীয় ইয়ট যেন ইতিহাসের আরেকটি দরজা। তার ভেতরে প্রবেশ করলে উঁকি দেওয়া যায় এক হারিয়ে যাওয়া রাজকীয় সময়ে—যেখানে সমুদ্রযাত্রা ছিল বিলাসিতা, আর রাজকীয় জীবনযাপন ছিল এক আলাদা জগত।
তবে এডিনবরার সৌন্দর্য শুধু তার বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানগুলোতে নয়; বরং পথ চলার মধ্যেও।
পাথর-বিছানো ঐতিহাসিক রাস্তা, পুরোনো স্থাপত্য, অচেনা সরু গলি, কোনো প্রাচীন ভবনের দেয়াল কিংবা হঠাৎ ভেসে আসা ঘণ্টাধ্বনি—প্রতিটি দৃশ্য যেন অতীতের কোনো গল্পের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। বাসের জানালায় ভেসে ওঠা পাথরের দেয়াল কিংবা পাহাড়ের গায়ে জমে থাকা কুয়াশার দিকে তাকিয়ে মনে হয়, শহরটি আপনাকে কোনো পুরোনো গল্পের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
প্রবাসে এক টুকরো বাংলাদেশ
প্রথম দিনের শেষে শহরের সৌন্দর্য পেছনে ফেলে প্রায় ছয় মাইল দূরে ডালকিথের পথে যাত্রা। সেখানে অপেক্ষা করছিল ‘ইতিহাস’ বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টে নৈশভোজ।
চমৎকার সাজসজ্জা, আন্তরিক পরিবেশ এবং সুস্বাদু খাবারে জায়গাটি যেন দূর প্রবাসে এক টুকরো বাংলাদেশ। রেস্টুরেন্টটির স্বত্বাধিকারী মতিন খান—অ্যাডভোকেট শাহনুর চৌধুরী চাচার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাঁর আন্তরিক আতিথেয়তায় সন্ধ্যাটি আরও আপন হয়ে উঠেছিল।
ককমিউনিটির বেশ কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তির উপস্থিতিতে নৈশভোজ পরিণত হয় প্রাণবন্ত এক আড্ডায়। হাসি, গল্প, স্মৃতি আর সৌহার্দ্যে কখন যে সময় কেটে গেল, টেরই পাওয়া গেল না।
কথার ফাঁকে ফাঁকে বারবার ফিরে এলো প্রিয় বাংলাদেশ। বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়েও মাতৃভূমির প্রতি সেই গভীর টান যেন সবাইকে অদৃশ্য এক বন্ধনে বেঁধে রেখেছিল। তখন মনে হলো, ভৌগোলিক দূরত্ব যতই হোক, মানুষের শেকড়ের কাছে ফিরে আসার পথ কখনো হারিয়ে যায় না।
হ্যারি পটারের শহরে
দ্বিতীয় দিনটিও কেটে গেল এডিনবরাকে আরও একটু কাছ থেকে আবিষ্কারের আনন্দে।
দিনের এক পর্যায়ে গেলাম দ্য এলিফ্যান্ট হাউসে—জে. কে. রাউলিং এবং হ্যারি পটার সিরিজের সঙ্গে সম্পৃক্ত সেই বিখ্যাত কফিশপে। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে জমে উঠল আড্ডা। ইতিহাস, সাহিত্য, ভ্রমণ আর নানা স্মৃতির গল্পে সাধারণ একটি মুহূর্তও হয়ে উঠল বিশেষ।
এরপর দেখা হলো এডিনবরা সেন্ট্রাল মসজিদের সঙ্গে। একসঙ্গে এক হাজারেরও বেশি মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন। ইউরোপের ঐতিহাসিক এক শহরের বুকের মধ্যে এমন একটি মুসলিম উপাসনালয় দেখে প্রবাসী মুসলিম সমাজের উপস্থিতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কথাও নতুন করে মনে হলো।
ইতিহাসের শহরে হাসির উৎসব
এডিনবরার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের আরেকটি দিক ধরা পড়ল এডিনবরা ফেস্টিভ্যাল ফ্রিঞ্জে। সেখানে ডেভিড ম্যাগিডফের কমেডি শো দেখার সুযোগ হলো।
দিনভর ইতিহাসের গাম্ভীর্য, স্থাপত্যের সৌন্দর্য আর অতীতের স্মৃতির ভেতর ঘোরাঘুরির পর হাসি-আনন্দে ভরা এই আয়োজন ছিল একেবারেই ভিন্ন স্বাদের। মনে হলো, এডিনবরা শুধু তার প্রাচীন ইতিহাসকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে নেই; বরং শিল্প, সাহিত্য, অভিনয় ও রসবোধের মধ্য দিয়েও প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করছে।
দিন শেষে আবারও প্রবাসের মাটিতে বাঙালিয়ানার স্বাদ। শহরের আরেকটি বাঙালি রেস্তোরাঁ ‘ইগনাইট’-এ খাবারের আয়োজন ছিল। এর স্বত্বাধিকারী ইয়াহইয়া খান। তাঁর বাবা মরহুম বাসিত খান ছিলেন এডিনবরায় বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট ব্যবসার পথিকৃৎদের একজন। ফরেস্ট রোডের ‘রয়েল বেঙ্গল রেস্টুরেন্ট’-এর মাধ্যমে তিনি এডিনবরায় বাংলাদেশি খাবারের পরিচিতি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
তাঁর গল্প শুনতে শুনতে মনে হলো, প্রবাসে একটি রেস্টুরেন্ট কখনো শুধু খাবারের জায়গা হয়ে থাকে না। অনেক সময় তা হয়ে ওঠে একটি সম্প্রদায়ের স্মৃতি, সংগ্রাম, সাফল্য এবং শেকড়ের অংশ।
বিদায়ের জানালায় এডিনবরা
সময় যতই ভালো কাটুক, ঘরে তো ফিরতে হয়। তাই শেষ হলো এডিনবরার দুদিনের মুগ্ধতা।
ফিরতি ট্রেনে জানালার বাইরে ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে লাগল শহরের আলো, পাথরের দেয়াল আর পাহাড়ের অবয়ব। মনে হচ্ছিল, এ শহরটি বিদায়ের মুহূর্তেও তার কোনো অদৃশ্য কবিতা সঙ্গে করে দিয়ে যাচ্ছে।
দুদিন—সময়ের হিসাবে সামান্য। কিন্তু এডিনবরা যে অনুভূতি দিয়ে গেল, তা হয়তো দীর্ঘদিনের।
এডিনবরা তাই শুধু একটি শহরের নাম নয়; এ এক অনুভূতি। পাথরে যার ইতিহাস, বাতাসে যার কবিতা, পাহাড়ে যার নীরবতা; আর প্রবাসের মাটিতেও যার অলিগলিতে খুঁজে পাওয়া যায় নিজের মানুষ, নিজের ভাষা, নিজের দেশের গন্ধ।
দুদিনের সফর শেষ হয়েছে। ট্রেন অনেক দূরে চলে এসেছে। তবু মনে হয়, এডিনবরার সেই পুরোনো কবিতাটি এখনও শেষ হয়নি। মনের ভেতর ধীরে ধীরে তার পঙ্ক্তিগুলো পড়ে চলেছি—পাথরের শহর, কুয়াশার পাহাড়, ইতিহাসের গলি আর প্রবাসে আপনজনের উষ্ণতা মিলিয়ে।
হয়তো এ কারণেই কিছু শহর ভ্রমণ শেষে শুধু স্মৃতিতে থাকে না—থেকে যায় মনের ভেতর।
এডিনবরা তেমনই এক শহর।
লেখক: কবি ও সম্পাদক















