ঢাকা ১০:২৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৬ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
আন্দ্রে বেতেই: মানবিক সমাজবোধের অনন্য উত্তরাধিকারী কারিগরি শিক্ষার প্রসার হোক নির্বাচিত সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার ইউকে বাংলা রিপোর্টার্স ইউনিটির অভিষেক অনুষ্ঠিত ফ্রান্সের পৌর নির্বাচনে ডেপুটি এবং কাউন্সিলর পদে লড়ছে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ফরাসীরা সত্যিকার অর্থেই দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে: ইইউ পর্যবেক্ষণ মিশন বিএনপির ভূমিধস জয় অনিয়ম ও জাল ভোট: প্রতিকার পেতে কোথায় অভিযোগ করবেন? যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ: শাবানা মাহমুদ কি হচ্ছেন সম্ভাব্য উত্তরসূরি? স্বতন্ত্র মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি শেষ মুহূর্তের জরিপে নির্বাচনের সম্ভাব্য চিত্র: কে কত আসনে এগিয়ে?

কারিগরি শিক্ষার প্রসার হোক নির্বাচিত সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার

  • আপডেট সময় ০১:৫১:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১২ বার পড়া হয়েছে

ড. মো: বিল্লাল হোসেন : একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে তার শিক্ষা ব্যবস্থার ভিতের ওপর। আর সেই ভিত যদি বাস্তবমুখী, কর্মসংস্থানভিত্তিক ও সময়োপযোগী না হয়, তবে উন্নয়নের স্বপ্ন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য কারিগরি শিক্ষা তাই কোনো বিলাসিতা নয়—এটি সময়ের দাবি, রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা। সে কারণেই কারিগরি শিক্ষার প্রসার হতে পারে নির্বাচিত সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।

বাংলাদেশ আজ জনসংখ্যাগতভাবে একটি সম্ভাবনাময় দেশের নাম। আমাদের মোট জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ। এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী যদি উপযুক্ত দক্ষতা অর্জন করতে পারে, তবে তারা হবে উন্নয়নের চালিকাশক্তি। কিন্তু বাস্তবতা হলো—প্রথাগত সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত অনেক তরুণই আজ কর্মসংস্থান পাচ্ছে না। অন্যদিকে শিল্প-কারখানা, নির্মাণ, আইটি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি—প্রায় প্রতিটি খাতে দক্ষ জনশক্তির সংকট বিদ্যমান। এই বৈপরীত্য দূর করার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো কারিগরি শিক্ষার বিস্তৃতি।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো তাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভিত্তি গড়ে তুলেছে শক্তিশালী কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে। সেখানে স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কাজ শেখানো হয়, শিল্পখাতের সঙ্গে শিক্ষার নিবিড় সংযোগ থাকে, এবং কারিগরি শিক্ষাকে সামাজিকভাবে মর্যাদাসম্পন্ন হিসেবে দেখা হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু সনদপ্রাপ্তই হয় না, তারা কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত হয়, দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হয়।

বাংলাদেশেও কারিগরি শিক্ষার উদ্যোগ রয়েছে, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় এখনও খুবই সীমিত। মোট শিক্ষার্থীর একটি ছোট অংশ মাত্র কারিগরি শিক্ষার আওতায় আসে। গ্রামীণ অঞ্চল, দরিদ্র পরিবার ও নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ আরও কম। এর পেছনে রয়েছে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতা, অবকাঠামোর ঘাটতি, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পাঠক্রমের স্বল্পতা। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নীতিগত অঙ্গীকার অপরিহার্য।

নির্বাচিত সরকার মানে জনগনের সরকার, জনগনের জন্য সরকার। যদি সরকার কারিগরি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে তা হবে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। কারিগরি শিক্ষা বিস্তারে সুস্পষ্ট লক্ষ্য, বাজেট বরাদ্দ, নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন, বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান আধুনিকায়ন এবং শিল্পখাতের সঙ্গে অংশীদারিত্ব—এসব বিষয়গুলি অগ্রাধিকার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া জরুরি।

কারিগরি শিক্ষার প্রসার সরাসরি কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত। দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে একজন তরুণ নিজ দেশে যেমন কাজের সুযোগ পায়, তেমনি বৈদেশিক শ্রমবাজারেও সে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে। প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় স্তম্ভ। যদি আমরা দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মী বিদেশে পাঠাতে পারি, তবে রেমিট্যান্সের পরিমাণ যেমন বাড়বে, তেমনি শ্রমিকদের মর্যাদা ও আয়ও বাড়বে।

শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, কারিগরি শিক্ষা সামাজিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, উদ্যোক্তা হওয়ার পথ খুলে দেয়। একজন দক্ষ কারিগর, টেকনিশিয়ান বা প্রযুক্তিবিদ নিজের কাজের মাধ্যমে পরিবার ও সমাজে সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করতে পারে। নারীদের জন্য কারিগরি শিক্ষা অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও কারিগরি শিক্ষার ভূমিকা অনস্বীকার্য। মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন ও উদ্ভাবন—এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে দক্ষ মানবসম্পদ অপরিহার্য। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, সবুজ প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দক্ষতা অর্জনের জন্যও আধুনিক কারিগরি শিক্ষার বিকল্প নেই।

তাই নির্বাচিত সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা, কারিগরি শিক্ষা যেন রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। কারিগরি শিক্ষার প্রসার মানেই কেবল কিছু নতুন প্রতিষ্ঠান নয় বরং এটি একটি মানসিক পরিবর্তন, একটি উন্নয়ন দর্শন। এই দর্শনকে যদি আমরা রাষ্ট্রীয় নীতিতে রূপ দিতে পারি, তবে বাংলাদেশ কেবল উন্নয়নশীল দেশ হিসেবেই নয়—একটি দক্ষ, মর্যাদাশীল ও আত্মবিশ্বাসী জাতি হিসেবে বিশ্বে নিজের স্থান করে নিতে পারবে।

লেখিক : উপাধ্যক্ষ,মোশাররফ হোসেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কাঁচপুর,সোনারগাঁও, নারায়নগঞ্জ।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

লক ডাউন পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় ফ্রান্সে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি

যুক্তরাজ্যে করোনার মধ্যেই শিশুদের মাঝে নতুন রোগের হানা

আন্দ্রে বেতেই: মানবিক সমাজবোধের অনন্য উত্তরাধিকারী

কারিগরি শিক্ষার প্রসার হোক নির্বাচিত সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার

আপডেট সময় ০১:৫১:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ড. মো: বিল্লাল হোসেন : একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে তার শিক্ষা ব্যবস্থার ভিতের ওপর। আর সেই ভিত যদি বাস্তবমুখী, কর্মসংস্থানভিত্তিক ও সময়োপযোগী না হয়, তবে উন্নয়নের স্বপ্ন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য কারিগরি শিক্ষা তাই কোনো বিলাসিতা নয়—এটি সময়ের দাবি, রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা। সে কারণেই কারিগরি শিক্ষার প্রসার হতে পারে নির্বাচিত সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।

বাংলাদেশ আজ জনসংখ্যাগতভাবে একটি সম্ভাবনাময় দেশের নাম। আমাদের মোট জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ। এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী যদি উপযুক্ত দক্ষতা অর্জন করতে পারে, তবে তারা হবে উন্নয়নের চালিকাশক্তি। কিন্তু বাস্তবতা হলো—প্রথাগত সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত অনেক তরুণই আজ কর্মসংস্থান পাচ্ছে না। অন্যদিকে শিল্প-কারখানা, নির্মাণ, আইটি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি—প্রায় প্রতিটি খাতে দক্ষ জনশক্তির সংকট বিদ্যমান। এই বৈপরীত্য দূর করার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো কারিগরি শিক্ষার বিস্তৃতি।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো তাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভিত্তি গড়ে তুলেছে শক্তিশালী কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে। সেখানে স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কাজ শেখানো হয়, শিল্পখাতের সঙ্গে শিক্ষার নিবিড় সংযোগ থাকে, এবং কারিগরি শিক্ষাকে সামাজিকভাবে মর্যাদাসম্পন্ন হিসেবে দেখা হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু সনদপ্রাপ্তই হয় না, তারা কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত হয়, দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হয়।

বাংলাদেশেও কারিগরি শিক্ষার উদ্যোগ রয়েছে, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় এখনও খুবই সীমিত। মোট শিক্ষার্থীর একটি ছোট অংশ মাত্র কারিগরি শিক্ষার আওতায় আসে। গ্রামীণ অঞ্চল, দরিদ্র পরিবার ও নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ আরও কম। এর পেছনে রয়েছে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতা, অবকাঠামোর ঘাটতি, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পাঠক্রমের স্বল্পতা। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নীতিগত অঙ্গীকার অপরিহার্য।

নির্বাচিত সরকার মানে জনগনের সরকার, জনগনের জন্য সরকার। যদি সরকার কারিগরি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে তা হবে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। কারিগরি শিক্ষা বিস্তারে সুস্পষ্ট লক্ষ্য, বাজেট বরাদ্দ, নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন, বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান আধুনিকায়ন এবং শিল্পখাতের সঙ্গে অংশীদারিত্ব—এসব বিষয়গুলি অগ্রাধিকার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া জরুরি।

কারিগরি শিক্ষার প্রসার সরাসরি কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত। দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে একজন তরুণ নিজ দেশে যেমন কাজের সুযোগ পায়, তেমনি বৈদেশিক শ্রমবাজারেও সে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে। প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় স্তম্ভ। যদি আমরা দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মী বিদেশে পাঠাতে পারি, তবে রেমিট্যান্সের পরিমাণ যেমন বাড়বে, তেমনি শ্রমিকদের মর্যাদা ও আয়ও বাড়বে।

শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, কারিগরি শিক্ষা সামাজিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এটি দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, উদ্যোক্তা হওয়ার পথ খুলে দেয়। একজন দক্ষ কারিগর, টেকনিশিয়ান বা প্রযুক্তিবিদ নিজের কাজের মাধ্যমে পরিবার ও সমাজে সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করতে পারে। নারীদের জন্য কারিগরি শিক্ষা অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও কারিগরি শিক্ষার ভূমিকা অনস্বীকার্য। মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন ও উদ্ভাবন—এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে দক্ষ মানবসম্পদ অপরিহার্য। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, সবুজ প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দক্ষতা অর্জনের জন্যও আধুনিক কারিগরি শিক্ষার বিকল্প নেই।

তাই নির্বাচিত সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা, কারিগরি শিক্ষা যেন রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। কারিগরি শিক্ষার প্রসার মানেই কেবল কিছু নতুন প্রতিষ্ঠান নয় বরং এটি একটি মানসিক পরিবর্তন, একটি উন্নয়ন দর্শন। এই দর্শনকে যদি আমরা রাষ্ট্রীয় নীতিতে রূপ দিতে পারি, তবে বাংলাদেশ কেবল উন্নয়নশীল দেশ হিসেবেই নয়—একটি দক্ষ, মর্যাদাশীল ও আত্মবিশ্বাসী জাতি হিসেবে বিশ্বে নিজের স্থান করে নিতে পারবে।

লেখিক : উপাধ্যক্ষ,মোশাররফ হোসেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কাঁচপুর,সোনারগাঁও, নারায়নগঞ্জ।