জেসমিন মনসুর, ওয়েলস :
মুক্তিযুদ্ধকালে প্রবাসে জনমত গঠন ও সংগঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান সহসভাপতি অধ্যাপক আবুল হাশেমের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা এবং যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ ও এর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতারা।
প্রবাসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক, প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক অধ্যাপক আবুল হাশেমকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও অশ্রুসিক্ত নয়নে শেষ বিদায় জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশি কমিউনিটির বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি কমিউনিটির রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা এই প্রবীণ নেতার মৃত্যুতে শোকাহত তাঁর সহকর্মী, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, শুভাকাঙ্ক্ষী ও স্বজনেরা।
গত ২৩ অক্টোবর শুক্রবার লন্ডনের কিংস কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্থানীয় সময় রাত ১২টা ১০ মিনিটে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন অধ্যাপক আবুল হাশেম (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।
পরদিন শনিবার, ২৪ অক্টোবর, বৃষ্টিপাত উপেক্ষা করে লন্ডনে তাঁর জানাজায় অংশ নেন যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারা, বিভিন্ন শহর থেকে আসা রাজনৈতিক ও কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ, ধর্মপ্রাণ মুসল্লি এবং সর্বস্তরের মানুষ। জানাজাকে ঘিরে সেখানে এক শোকাবহ ও আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ব্রিকলেন সেন্ট্রাল মসজিদের ইমাম ও খতিব মুফতি মাওলানা নজরুল ইসলাম জানাজার নামাজে ইমামতি করেন। পরে লন্ডনের এটারনেল গার্ডেনস কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
শেখ হাসিনার শোকবার্তা
অধ্যাপক আবুল হাশেমের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। মরহুমের জীবন ও কর্মের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
শোকবার্তায় শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে উজ্জীবিত অধ্যাপক আবুল হাশেম ছাত্রজীবন থেকেই যুক্তরাজ্যে প্রবাসী বাঙালি সমাজকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে সংগঠিত করা এবং দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৬৮ সালে যুক্তরাজ্য ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন এবং সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাধারণ সম্পাদক ও সহসভাপতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সেমিনার-সিম্পোজিয়ামেও তিনি দলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
শেখ হাসিনা আরও বলেন, অধ্যাপক আবুল হাশেমের মৃত্যুতে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বাঙালিরা তাঁদের প্রিয়জনকে হারিয়েছেন। তিনি নিজেও হারিয়েছেন একজন অভিভাবকতুল্য শুভাকাঙ্ক্ষীকে।
মুক্তিযুদ্ধকালে প্রবাসে জনমত গঠন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন আদায়ে অধ্যাপক আবুল হাশেমের ভূমিকার কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর মতো অভিজ্ঞ ও দক্ষ সংগঠকের অভাব পূরণ হওয়ার নয়। যুক্তরাজ্যের একজন প্রবীণ ও শীর্ষস্থানীয় নেতা হিসেবে দেশ ও দলের জন্য তাঁর দীর্ঘদিনের লড়াই-সংগ্রামের অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি।
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের শোক
অধ্যাপক আবুল হাশেমের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ জালাল উদ্দীন ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজিদুর রহমান ফারুক। শোক প্রকাশ করেছেন সাবেক মন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী, সাবেক মেয়র আনোয়ার উজ্জামান চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিব, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সাবেক সভাপতি আলহাজ শামসুদ্দিন খাঁন, সহসভাপতি হরমুজ আলী, শাহ আজিজুর রহমান ও শামসুদ্দিন আহমেদ মাস্টার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নঈম উদ্দিন রিয়াজ ও মারুফ আহমেদ চৌধুরী এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল আহাদ চৌধুরীসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
এক যৌথ শোকবার্তায় নেতারা বলেন, অধ্যাপক আবুল হাশেম ছিলেন একজন ত্যাগী, নিবেদিতপ্রাণ, বিনয়ী ও আদর্শনিষ্ঠ রাজনৈতিক সংগঠক। রাজনৈতিক প্রতিকূলতার সময়েও তিনি যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে সংগঠন ও প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি একজন অভিজ্ঞ, নিবেদিতপ্রাণ ও অভিভাবকতুল্য ব্যক্তিত্বকে হারাল।
শোকবার্তায় তাঁরা মরহুমের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং মহান আল্লাহর কাছে তাঁর রুহের মাগফিরাত ও জান্নাতুল ফেরদৌস কামনা করেন।
ওয়েলস আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের শোক
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সদস্য ও ওয়েলস আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ মকিস মনসুর এবং সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালিকসহ বিভিন্ন শাখা কমিটির নেতৃবৃন্দও অধ্যাপক আবুল হাশেমের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
এক যৌথ শোকবার্তায় তাঁরা বলেন, প্রবাসে স্বাধীনতার সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক ও বিশিষ্ট কমিউনিটি নেতা অধ্যাপক আবুল হাশেমের মৃত্যুতে তাঁরা একজন অভিজ্ঞ অভিভাবককে হারিয়েছেন। তাঁর মতো নিবেদিতপ্রাণ, প্রাণবন্ত ও সদাহাস্যোজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের প্রয়াণে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
তাঁরা মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের শোক
অধ্যাপক আবুল হাশেমের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন যুক্তরাজ্য আওয়ামী যুবলীগের সভাপতি ফখরুল ইসলাম মধু, সাধারণ সম্পাদক সেলিম আহমেদ খান ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জামাল আহমেদ খান।
এ ছাড়া যুক্তরাজ্য আওয়ামী যুবলীগের ওয়েলস শাখার সভাপতি ভিপি সেলিম আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক মফিকুল ইসলাম, যুক্তরাজ্য ছাত্রলীগের সভাপতি তামিম আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক নিহাল হাসান সজিব ভূঁইয়া ও জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি এম আক্তার উজ্জামান খান জাকির এবং যুক্তরাজ্য ছাত্রলীগের ওয়েলস শাখার সভাপতি মোহাম্মদ বদরুল হক মনসুর ও সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান তালুকদার শাওনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা শোক প্রকাশ করেছেন।
শোকবার্তায় তাঁরা অধ্যাপক আবুল হাশেমকে বিনয়ী, পরিপাটি ও অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী একজন মানুষ হিসেবে স্মরণ করেন। তাঁরা মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ
ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ থানার গালিমপুর ইউনিয়নের চানহাটি গ্রামের কৃতী সন্তান অধ্যাপক আবুল হাশেমের রাজনৈতিক জীবন ছিল দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল। ১৯৬৮ সালে যুক্তরাজ্য ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে প্রবাসে বাঙালির রাজনৈতিক সংগঠনে তাঁর সক্রিয় পথচলা আরও সুসংগঠিত হয়। পরে তিনি যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাধারণ সম্পাদক ও সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠন এবং প্রবাসী বাঙালিদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি কমিউনিটির রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পৃক্ততার সুবাদে কমিউনিটির বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে গড়ে উঠেছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।
মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই মেয়ে, নাতি-নাতনিসহ দেশে-বিদেশে অসংখ্য আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, সহকর্মী, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গেছেন।
একজন প্রবীণ রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে অধ্যাপক আবুল হাশেমের দীর্ঘ কর্মময় জীবন, মুক্তিযুদ্ধকালে প্রবাসে তাঁর ভূমিকা এবং প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক তাঁকে সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখবে।
মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারকে এই অপূরণীয় ক্ষতি সহ্য করার শক্তি দিন—এমন প্রার্থনা জানিয়েছেন তাঁর রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।




















