ঢাকা ০৮:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুর্নীতি প্রতিরোধে সাধারণের আইনগত প্রতিকার : প্রাসঙ্গিক আলোচনা

  • আপডেট সময় ১২:৫৫:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
  • ২২ বার পড়া হয়েছে

অ্যাডভোকেট মিছবাউর রহমান (আলম)

লেখক : আইনজীবী, জজ কোর্ট, সিলেট।

 

দেশে ক্রমবর্ধমান হারে দুর্নীতির বিস্তার ঘটছে। বিশ্বে দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে তলানীতে। ইতিপূর্বে বাংলাদেশ, বাংলাদেশ একাধিকবার দুর্নীতিতে বিশ্বে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল (TIB) এর সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনে দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮২টি দেশের মধ্যে ১৫০তম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বলা হয়ে থাকে, প্রতি বছর দেশে যে পরিমাণ দুর্নীতি হয়ে থাকে, তা দিয়ে কমপক্ষে তিনটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা যেত।

দুর্নীতির এই ক্রমবর্ধমান বিস্তারে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে এ দেশের সাধারণ জনগণ। দুর্নীতির কারণে সাধারণ জনগণ যেমন প্রতিনিয়ত ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, তেমনি তা দেশের অর্থনীতিতেও ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ নামে একটি সংস্থা গঠন করা হয়েছে এবং এই সংক্রান্তে বেশ কিছু আইনও প্রণীত হয়েছে। আইনী এসব কাঠামোর মাধ্যমে সাধারণ জনগণ দুর্নীতি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে কিভাবে প্রতিকার পেতে পারে, তাই মূলতঃ এই আলোচনার বিবেচ্য বিষয়।

দেশের সাধারণ জনগণের পক্ষে দুর্নীতি করার তেমন সুযোগ নাই। দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার মূলত হয় বা হচ্ছে চঁনষরপ ঝবৎাধহঃ বা সরকারী কর্মচারীদের দ্বারা। Public Servant কি তা দন্ডবিধির ২১ ধারায় এবংCriminal Law Amendment Act, ১৯৫৮ এর ২(বি) ধারায় সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এছাড়া এই সংজ্ঞার ব্যাখ্যায় মহামান্য হাইকোর্টও Public Servant সম্পর্কে আরো বিস্তৃত পরিসরে অভিমত প্রদান করেছেন। বর্ণিত দুটি আইনের সংজ্ঞায় ও মহামান্য উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত মোতাবেক Public Servant বলতে জনপ্রতিনিধি, সরকারী-আধা সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিচারক, বিচারালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিচারক কর্তৃক নিযুক্ত মধ্যস্থতাকারী, নির্বাচন কমিশনের অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইন দ্বারা নিগমিত বা গঠিত কোন স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, বিধিবদ্ধ সংস্থা, কর্পোরেশন বা প্রতিষ্ঠানের চেয়াম্যান, পরিচালক, ট্রাস্টি, কমিশনার, সদস্য এবং এর কর্মকর্তা-কর্মচারীগণকে বুঝায়। এছাড়া ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সাংবিধানিকভাবে গঠিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, চেয়ারম্যান, ট্রাস্টি, কর্মকর্তা-কর্মচারীগণও Public Servant মর্মে গণ্য হবেন।

দেশের ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪; দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা, ২০০৭; দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭; মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ ইত্যাদি আইন প্রণীত হয়েছে। এসব আইনে বা আইনের তফসিলে সংঘটিত অপরাধের বিচারের জন্য Criminal Law Amendment Act, ১৯৫৮ এর ৩ ধারার বিধানবলে স্পেশাল জজও নিয়োগ করা হয়েছে। বর্ণিত আইনবলে নিয়োগকৃত স্পেশাল জজ দুর্নীতির মামলার বিচার পরিচালনার ক্ষমতা প্রাপ্ত।

দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২(ঙ) ধারায় ‘দুর্নীতি’ বলতে উক্ত আইনের তফসিলে উল্লিখিত নিম্নলিখিত অপরাধকে বুঝায়-
ক) দুর্নীতি দমন কমিশন আইনে বর্ণিত অপরাধ;
খ) দন্ডবিধির ১৬১, ১৬২, ১৬৩, ১৬৪, ১৬৫, ১৬৫-এ, ১৬৫-বি, ১৬৬, ১৬৭, ১৬৮, ১৬৯, ২১৭, ২১৮ এবং ৪০৯ ধারার অপরাধসমুহ;
এবং
দন্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১, ৪৭৭-এ ধারার অধীন কোন অপরাধ সরকারী সম্পদ সম্পর্কিত হলে অথবা সরকারী কর্মচারী বা ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্তৃক দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনকালে সংঘটিত হলে কেবল সেক্ষেত্রে বর্ণিত অপরাধসমুহ;
গ) দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এর অধীন অপরাধসমুহ;
ঘ) মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর অধীন ঘুষ ও দুর্নীতি সংক্রান্ত অপরাধ সমুহ;
ঙ) উপরোক্ত ক-ঘ ক্রমিকে বর্ণিত যে কোন অপরাধের সহিত সংশ্লিষ্ট বা সম্পৃক্ত দন্ডবিধির ১০৯, ১২০-বি এবং ৫১১ ধারার অপরাধসমুহ;

সাধারণের বোধগম্যতার জন্য উপরোক্ত ‘ক’-‘ঙ’ দফায় বর্ণিত ধারাসমুহের অপরাধ কি তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরাও আবশ্যক, যাতে ঐ সব অপরাধ সংঘটিত হলে জনগণ এই প্রবন্ধে উল্লিখিতমতে এর প্রতিকার গ্রহণ করতে পারেন।

ক) দুর্নীতি দমন কমিশন আইনে বর্ণিত অপরাধ বলতে উক্ত আইনের ২৬, ২৭ ও ২৮-গ ধারার অপরাধকে বুঝায়।
২৬ ধারার বিধানমতে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনকারী কোন ব্যক্তি কমিশনের নির্দেশে দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন বিবরণ দাখিল করলে তা অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে;
২৭ ধারার বিধান অনুযায়ী কোন ব্যক্তি তার জ্ঞাত আয়ের সহিত অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জন করলে তা অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে;
একই আইনের ২৮-গ ধারায় কোন ব্যক্তি দুর্নীতি সংক্রান্ত অপরাধের বিষয়ে কমিশনে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য প্রদান করলে তাও অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে।

খ)
ধারা ১৬১ দন্ডবিধি: সরকারী কর্মচারী কর্তৃক আইনসম্মত পারিশ্রমিক ব্যতীত অন্য কোন পারিতোষিক তথা ঘুষ গ্রহণ।
ধারা ১৬২ দন্ডবিধি: সরকারী কর্মচারীকে প্রভাবিত করার জন্য দূর্নীতিপূর্ণ উপায়ে পারিতোষিক বা ঘুষ গ্রহণ।
ধারা ১৬৩ দন্ডবিধি: ব্যক্তিগত প্রভাব প্রয়োগের মাধ্যমে কোন সরকারী কর্মচারীকে কোন সরকারী কাজ করা বা কাজ করা থেকে বিরত থাকতে প্ররোচিত করতে তথা প্রভাবিত করতে পারিতোষিক বা ঘুষ গ্রহণ।
ধারা ১৬৪ দন্ডবিধি: দন্ডবিধির ১৬২ ও ১৬৩ ধারার বর্ণিত অপরাধ সংঘটনে কোন সরকারী কর্মচারীর সহায়তা প্রদান।
ধারা ১৬৫ দন্ডবিধি: সরকারী কর্মচারী কর্তৃক তার দায়িত্বের সহিত সম্পর্কিত কোন কার্য সম্পাদনের জন্য উক্ত কার্যের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিকট থেকে নিজের জন্য বা অন্য কোন ব্যক্তির জন্য পর্যাপ্ত বিনিময় ছাড়া কোন মূল্যবান বস্তু গ্রহণ।
ধারা ১৬৫-এ দন্ডবিধি: দন্ডবিধির ১৬১ ও ১৬৫ ধারার অপরাধ সংঘটিত হউক বা না হউক উক্তরূপ অপরাধ সংঘটনে সহায়তা প্রদান।
ধারা ১৬৫-বি দন্ডবিধি: কোন ব্যক্তি যদি কোন সরকারী কর্মচারীর কাছে ধারা ১৬১-এ উলি­খিত কোন পারিতোষিক বা ঘুষ প্রদানের জন্য বা ধারা ১৬৫-এ উলি­খিত কোন মূল্যবান বস্তু বিনা বিনিময়ে বা অপর্যাপ্ত বিনিময়ে প্রদানের জন্য প্ররোচিত, বাধ্য বা যবরদস্তির শিকার বা ভীতসন্ত্রস্ত্র হন, তাহলে তাকে ধারা ১৬১ বা ১৬৫ এর অধীন অপরাধের সহায়তাকারী হিসাবে গণ্য করা হবেন না।
ধারা ১৬৬ দন্ডবিধি: কোন ব্যক্তির ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে কোন সরকারী কর্মচারী কর্তৃক তার উপর আইন অনুযায়ী অর্পিত বা নির্দেশিত দায়িত্ব অমান্য করা।
ধারা ১৬৭ দন্ডবিধি: কোন ব্যক্তির ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে সরকারী কর্মচারী কর্তৃক জেনেশুনে কোন মিথ্যা দলিল প্রস্তুত বা অনুবাদ করা।
ধারা ১৬৮ দন্ডবিধি: আইনতঃ ব্যবসায় নিযুক্ত না হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, এমন কোন সরকারী কর্মচারী কর্তৃক ব্যবসায় নিযুক্ত হওয়া।
ধারা ১৬৯ দন্ডবিধি: কোন সরকারী কর্মচারী কর্তৃক কোন সম্পত্তি ক্রয় করতে বা ক্রয়ের জন্য দরপত্রে অংশ না নিতে আইনতঃ বাধা থাকা সত্তে¡ও নিজের নামে বা অন্যের নামে সম্পত্তি ক্রয় করা বা ক্রয়ের জন্য দরপত্রে অংশগ্রহণ করা।
ধারা ২১৭ দন্ডবিধি: সরকারী কর্মচারী কর্তৃক আইনী নির্দেশ অমান্য করে জেনেশুনে কোন ব্যক্তিকে আইনগত শাস্তি থেকে রক্ষা করা বা কোন ব্যক্তিকে তার প্রাপ্য শাস্তি থেকে কম শাস্তি প্রদান করা বা কোন বাজেয়াপ্তী হওয়ার আইনানুযায়ী যোগ্য কোন সম্পত্তিকে বাজেয়াপ্তী হওয়া থেকে রক্ষা করা বা আইনানুযায়ী কোন সম্পত্তির উপর আরোপযোগ্য অন্য কোন দায় বা দাবীর হাত থেকে এটিকে রক্ষা করা।
ধারা ২১৮ দন্ডবিধি: সরকারী কর্মচারী কর্তৃক কোন ব্যক্তিকে শাস্তি বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্তি হওয়া থেকে রক্ষা করার বা কারো ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে ভুল রেকর্ড বা দলিল প্রস্তুত করা।
ধারা ৪০৯ দন্ডবিধি: কোন সরকারী কর্মচারী কর্তৃক তার পদমর্যাদা বলে কিংবা ব্যাংকার, ব্যবসায়ী (Merchant), ফ্যাক্টর (Factor), ব্রোকার (Broker), অ্যাটর্নী (Attorney) বা এজেন্ট কর্তৃক ব্যবসার সূত্রে কোনভাবে কোন সম্পত্তির জিম্মাদার হয়ে বা উক্ত সম্পত্তি পরিচালনার আমানতদার হয়ে অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ করে উক্তরূপ আমানতের খেয়ানত করা;
এবং
ধারা ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১, ৪৭৭-এ ধারার অধীন অপরাধ সরকারী সম্পত্তি সম্পর্কিত হলে-
অর্থাৎ সরকারী সম্পদ সম্পর্কিত বিষয়ে সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্তৃক দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনকালে প্রতারণা, জালিয়াতি, প্রতারণার উদ্দেশ্যে জালিয়াতি, জালিয়াতির মাধ্যমে সৃষ্ট দলিলাত খাঁটি হিসাবে ব্যবহার এবং মিথ্যা ও জাল হিসাবপত্র প্রণয়ন বা হিসাবপত্র বিনষ্ট করার অপরাধ।
গ) দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ অধীন অপরাধসমুহ:-
দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এর ৫ ধারায় উক্ত আইনের অধীন অপরাধের বিবরণ ও শাস্তির উলে­খ করা হয়েছে। পাঠকদের অবগতির জন্য তা তুলে ধরা হলো-
কোন সরকারী কর্মচারী কর্তৃক কোন ব্যক্তির নিকট হতে নিজের জন্য বা অন্য কোন ব্যক্তির জন্য আইনসম্মত পারিশ্রমিক ব্যতীত কোন পারিতোষিক গ্রহণ করা, আদায় করা, গ্রহণ করতে সম্মত হওয়া, গ্রহণের চেষ্টা করা এবং তা দন্ডবিধির ১৬১ ধারায় উল্লিখিত কোন কাজের প্রেরণা বা পুরষ্কার হিসাবে গ্রহণ করা;
অথবা
কোন সরকারী কর্মচারী কর্তৃক সরকারী কার্যাবলী সম্পর্কিত কোন কাজে নিজের জন্য বা অন্য কোন ব্যক্তির জন্য উক্ত কাজের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অন্য কোন ব্যক্তির নিকট হতে কোন মূল্যবান বস্তু বিনা বিনিময়ে বা অপর্যাপ্ত বিনিময়ে গ্রহণ করা;
অথবা
কোন সরকারী কর্মচারী কর্তৃক অসৎভাবে বা প্রতারণামূলকভাবে সরকারী কর্মচারী হিসাবে তার কাছে অর্পিত কোন সম্পত্তি আত্মসাৎ করা বা অন্য কোনভাবে নিজের ব্যবহারে রূপান্তর করা অথবা অন্য কোন ব্যক্তিকে তা করতে দেওয়া;
অথবা
কোন সরকারী কর্মচারী কর্তৃক তার কাজের অমর্যাদা করে দুর্নীতিপূর্ণ বা বেআইনী উপায়ে নিজের জন্য বা অন্য কোন ব্যক্তির জন্য কোন মূল্যবান বস্তু বা আর্থিক সুবিধা অর্জন করা বা অর্জনের চেষ্টা করা;
অথবা
কোন সরকারী কর্মচারী নিজে বা তার নির্ভরশীল ব্যক্তি কর্তৃক এমন কোন আর্থিক সম্পদ বা সম্পত্তির দখলে থাকা, যার ব্যাপারে সরকারী কর্মচারী হিসাবে তিনি সন্তোষজনক জবাব দিতে অক্ষম এবং যা তার জ্ঞাত আয়ের সহি অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

কোন সরকারী কর্মচারীর ক্ষেত্রে উপরোক্ত কাজ অপরাধমূলক অসদাচরণ মর্মে গণ্য হবে এবং এইরূপ অপরাধমূলক অসদাচরণ করলে বা করার চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্ট সরকারী কর্মচারী উক্ত আইনের ৫(২) ধারামতে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদন্ডে ও অর্থদন্ডে অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন। এছাড়াও যে আর্থিক সম্পদ বা সম্পত্তির সহিত অপরাধমূলক অসদাচরণ সম্পর্কিত, তা রাষ্ট্রের অনুক‚লে বাজেয়াপ্ত হবে।

ঘ) মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর ২(ট) এর বিধান অনুযায়ী মানি লন্ডারিং অর্থ-
১) সম্পৃক্ত অপরাধ (Predicate offence) সংঘটনের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ বা সম্পত্তির অবৈধ উৎস গোপন বা আড়াল করার উদ্দেশ্যে এর হস্তান্তর, রূপান্তর, বিদেশে প্রেরণ বা বিদেশ হতে বাংলাদেশে প্রেরণ বা আনা বা বৈধ বা অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ বা সম্পত্তি বিদেশে পাচার।

২) কোন আর্থিক লেনদেন এরূপভাবে সম্পন্ন করা বা সম্পন্ন করার চেষ্টা করা, যাতে এই অধ্যাদেশের অধীন একটি রিপোর্ট করার প্রয়োজন হবে না।

৩) এরূপ কোন কাজ করা, যার দ্বারা উক্তরূপ অর্থ বা সম্পত্তির অবৈধ উৎস গোপন বা আড়াল করা হয় বা এরূপ কাজ সম্পাদনের চেষ্টা করা বা অনুরূপ কাজ সম্পাদনে সজ্ঞানে সহায়তা বা ষড়যন্ত্র করা।

উপরোক্ত মানি লন্ডারিংয়ের সংজ্ঞায় বর্ণিত অপরাধ করলে বা অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা, সহায়তা বা ষড়যন্ত্র করলে একই আইনের ৪ ধারায় অপরাধ সংঘটনকারী ব্যক্তি কমপক্ষে ৬ মাস এবং সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদন্ডে দন্ডিত হবেন এবং অপরাধের সহিত সম্পৃক্ত সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুক‚লে বাজেয়াপ্ত হবে মর্মে বিধান সন্নিবেশিত হয়েছে। তবে সম্পৃক্ত অপরাধ (চৎবফরপধঃব ড়ভভবহপব) এর ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে সংঘটিত লন্ডারিংয়ের অপরাধই কেবল দুর্নীতি দমন কমিশন আইনে বিচারযোগ্য হবে।

ঙ) কোন ব্যক্তি যদি উপরোক্ত ‘ক-ঘ’ দফায় বর্ণিত অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করেন বা উক্তরূপ অপরাধ সংঘটনের জন্য ষড়যন্ত্র করেন কিংবা এরূপ অপরাধ সংঘটন করার বা করার চেষ্টা করেন, তবে তিনি যথাক্রমে দন্ডবিধির ১০৯, ১২০-বি ও ৫১১ ধারার আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ সংঘটন করেছেন মর্মে গণ্য হবে।

দুর্নীতি দমন কমিশন আইনে মূলতঃ উপরোক্ত অপরাধ সমুহের অনুসন্ধান, তদন্ত ও বিচার কার্য পরিচালিত হয়ে থাকে।

উপরোক্ত অপরাধসমুহ সংঘটিত হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি কিভাবে আইনগত পদক্ষেপ নিতে পারেন তাও আইনে সুনির্দিষ্টভাবে উলে­খ আছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন নিজেও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে উপরোক্ত তফসিলে বর্ণিত অপরাধ সংঘটনকারীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান, মামলা দায়ের, তদন্ত পরিচালনা ও অভিযোগপত্র দাখিলের পূর্ণ ক্ষমতাবান।

দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা, ২০০৭ এর ৩ ও ৪ ধারায় দুর্নীতি সংক্রান্ত উপরোক্ত অপরাধের অভিযোগ দায়েরের বিধান সন্নিবেশিত হয়েছে। ৩ ধারার বিধান অনুযায়ী কোন ব্যক্তি দুর্নীতি সংক্রান্ত উপরোক্ত অপরাধ সংক্রান্ত বিষয়ে কমিশনের জেলা কার্যালয় বা বিভাগীয় কার্যালয় বা প্রধান কার্যালয়ে অভিযোগ দাখিল করতে পারবে এবং অভিযোগ দাখিলকারী ব্যক্তি চাইলে তার অভিযোগ দাখিলের প্রমাণ হিসাবে সংশ্লিষ্ট কার্যালয় অভিযোগ প্রাপ্তি নম্বর ও তারিখ সম্বলিত একটি রশিদ প্রদান করবেন।

অভিযোগ প্রাপ্তির পর দুর্নীতি দমন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কার্যালয় ঐ কার্যালয়ে রক্ষিত রেজিস্ট্রারে অভিযোগটি সংরক্ষণ করে তা বিধিমালা ৫ এর অধীনে গঠিত একই কার্যালয়ের যাচাই বাছাই কমিটির পরবর্তী সভায় উপস্থাপন করবেন। যাচাই বাছাই কমিটি অভিযোগের সমর্থনে প্রাথমিক তথ্য ও উপাত্ত বিবেচনা করে যে সব অভিযোগের অনুসন্ধান কার্য পরিচালনা করা আবশ্যক মনে করবেন, তার একটি তালিকা প্রস্তুত করতঃ এইসব অভিযোগের অনুসন্ধানের সুপারিশ প্রধান কার্যালয় বরাবরে প্রেরণ করবেন। প্রধান কার্যালয় অনুসন্ধানের জন্য নির্ধারিত অভিযোগসমুহের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য তা দায়িত্ব প্রাপ্ত কমিশনারের নিকট উপস্থাপন করবেন। সংশ্লিষ্ট কমিশনার তার নিকট উপস্থাপিত যে সকল অভিযোগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন, ঐ সকল অভিযোগের অনুসন্ধানের জন্য তা দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তার নিকট প্রেরণ করবেন।

৪ ধারার বিধান অনুযায়ী দুর্নীতির অপরাধ সংক্রান্তে যে কেউ সংশ্লিষ্ট থানায়ও অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন। এই ক্ষেত্রে অভিযোগ প্রাপ্তির পর সংশ্লিষ্ট থানা কর্তৃপক্ষ তা জিডি আকারে লিপিবদ্ধ করে আইনানুযায়ী উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উহা কমিশন বহিভর্‚ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জেলা কার্যালয়ে এবং কমিশনে কর্মরত কোন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে কমিশনের প্রধান কার্যালয় বরাবরে প্রেরণ করবেন। এইরূপ অভিযোগ প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও কমিশন পূর্বে উলি­খিতমতে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

তবে যাচাই বাছাইয়ে প্রাথমিক তথ্য ও উপাত্ত বিবেচনা করে যে সব অভিযোগের অনুসন্ধান অনাবশ্যক মর্মে বিবেচিত হবে, যাচাই বাছাই কমিটি তা অনুসন্ধানের জন্য নির্বাচিত করবেন না।

অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা অনুসন্ধানের নির্দেশ প্রাপ্তির পর অনুসন্ধান কার্য সম্পাদন করে তার প্রতিবেদন নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তার নিকট প্রেরণ করবেন। অতঃপর কমিশন উপস্থাপিত অনুসন্ধান প্রতিবেদন বিচার বিশ্লেষণ করে এজাহার দায়েরের জন্য উক্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ প্রদান করবেন বা ক্ষেত্রমত কার্যক্রম পরিসমাপ্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।

কমিশন কর্তৃক উক্তরূপে এজাহার দায়েরের নির্দেশ প্রদান করা হলে বা কার্যক্রমটির পরিসমাপ্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলে তা অভিযোগকারীকে এবং ক্ষেত্রমত অভিযুক্ত ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বরাবরে রেজিস্ট্রি ডাকযোগে বা বাহক মারফত অবহিত করতে হবে। কেবল পরিসমাপ্তির ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে উক্তরূপে অবহিত করতে হবে।

এভাবে অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধানের পর এজাহার দায়েরের সিদ্ধান্ত প্রদত্ত হলে দুর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দ্বারা তাতে তদন্তকার্য পরিচালিত হবে। তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র বা চুড়ান্ত প্রতিবেদন বিষয়ে অনুমোদনের জন্য তা দুর্নীতি দমন কমিশন বরাবরে প্রেরিত হবে। কমিশনের অনুমোদন ব্যতীত অভিযোগপত্র দাখিল করা যাবে না এবং অনুমোদনবিহীন অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে আদালত অপরাধ বিচারকার্য আমলে গ্রহণ করবেন না।

দুর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক অভিযোগপত্র দাখিলের পর সংশ্লিষ্ট সিনিয়র স্পেশাল জজ অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অপরাধ আমলে নিবেন। অতঃপর ফৌজদারী কার্যবিধিতে বর্ণিত সকল প্রক্রিয়া সম্পন্নের পর মামলা বিচারের জন্য প্রস্তুত হলে তা বিচার ও নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট স্পেশাল জজ বরাবরে প্রেরণ করবেন। স্পেশাল জজ তার উপর অর্পিত ক্ষমতাবলে বিচার কাজ পরিচালনা করবেন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের তফসিলভ‚ক্ত অপরাধের বিষয়ে সরাসরি আদালতে কোন অভিযোগ দায়ের করা যায় না। উপরোক্তমতে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দাখিল করতে হয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশন উপরোক্তমতে অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন।

আইনানুযায়ী প্রতিটি জেলায় বা মহানগরের সিনিয়র স্পেশাল জজ দুর্নীতি সংক্রান্ত অপরাধ আমলে নেওয়ার আইনগত ক্ষমতাপ্রাপ্ত হন। সাধারণত প্রতিটি জেলার দায়রা জজ ও মহানগরের মহানগর দায়রা জজ নিজ নিজ অধিক্ষেত্রের সিনিয়র স্পেশাল জজ হিসাবে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। যদি সিনিয়র স্পেশাল জজ এই মর্মে সন্তুষ্ট হন যে, তার স্থানীয় অধিক্ষেত্রের মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের তফসিলভ‚ক্ত কোন অপরাধ সংঘটিত হয়েছে মর্মে বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে এবং উক্তরূপ অপরাধ সংঘটনের বিষয়ে অভিযোগকারীর দাখিলকৃত অভিযোগের ভিত্তিতে যুক্তিযুক্ত কারণ ছাড়া কমিশন তদন্ত কার্যক্রমে অগ্রসর হয় নাই বা কমিশন অভিযোগকারীর দাখিলা অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান বা তদন্তের নির্দেশ দানে দীর্ঘ বিলম্ব করছে, তবে আদালত অভিযোগটি সরাসরি গ্রহণ করে তা তদন্তের জন্য কমিশন বরাবরে প্রেরণ করবেন। অর্থাৎ দুর্নীতি সংক্রান্ত অপরাধের প্রতিকারের জন্য প্রথমে কমিশন বরাবরে অভিযোগ দাখিল করা আবশ্যক। কমিশন অভিযোগের ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ না করলেই কেবল আদালতে সরাসরি অভিযোগ দাখিল করা যাবে, অন্যথায় নয়।

দুর্নীতি সংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগ দায়েরের পূর্বে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরী। অভিযোগকারী যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ সাপেক্ষে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করবেন। যদি কেবল হয়রানির জন্য কেউ মিথ্যা বা ভিত্তিহীন অভিযোগ দায়ের করেন, তবে আইনে তার জন্য শাস্তির বিধানও সংযুক্ত করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন’ ২০০৪ এর ২৮(গ) ধারামতে যদি কেউ মিথ্যা জেনে বা তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে ভিত্তিহীন কোন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযোগ দাখিল বা প্রদান করেন, তবে তিনি মিথ্যা তথ্য প্রদান করেছেন মর্মে গণ্য হবে এবং এই অপরাধে তিনি সর্বোচ্চ ৫ বছর বা অন্যুন ২ বছর কারাদন্ড ও অর্থদন্ডে বা উভয় দন্ডে দন্ডনীয় হবেন। তথ্য প্রদানকারী কমিশনের বা অন্য কোন সরকারী দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী হলে তার ক্ষেত্রেও এমন দন্ড প্রযোজ্য হবে। কাজেই মিথ্যা, ভিত্তিহীন এবং তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে দুর্নীতি সংক্রান্ত কোন অপরাধের অভিযোগ দাখিল না করাই শ্রেয়, অন্যথায় অভিযোগকারীই উল্টো বিপদগ্রস্থ হবেন।

দেশের সিংহভাগ দুর্নীতি সংক্রান্ত অপরাধ মূলতঃ সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীদের দ্বারা বা তাদের যোগসাজশে সংঘটিত হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ৩২-ক ধারায় সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বিচারকদের বিরুদ্ধে মামলা রুজুর ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আইনের এই ধারা দুর্নীতিগ্রস্থ সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারী ও বিচারকদের রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করবে এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে তা মারাত্মক অন্তরায়। মহামান্য হাইকোর্ট Human Rights and Peace for Bangladesh Vrs Hon’ble Speaker, Bangladesh Jati“a Sangsad (67 DLR 19) মামলার রায়ে আইনের এই ধারাটিকে সংবিধানে প্রদত্ত আইনের চোখে সবাই সমান এবং মৌলিক অধিকারের সহিত সাংঘর্ষিক মর্মে অভিমত প্রদান করেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের এই ধারাটি রহিত করা হলে দুর্নীতিগ্রস্থ বিচারক ও সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার সাহস হারাবেন এবং তাদের লাগাম দুর্নীতির রাশ টেনে ধরা সম্ভব হবে। কাজেই সরকার প্রকৃতই যদি দুর্নীতি দমনে আন্তরিক হন, তবে আমলাদেরকে চাপে সংযুক্ত করা এই ধারাটি রহিত করে দুর্নীতি দমনের পথ প্রশস্ত করবেন, সাধারণ নাগরিকরা তাই প্রত্যাশা করেন।
লেখক : আইনজীবী, জজ কোর্ট, সিলেট।

 

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

লক ডাউন পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় ফ্রান্সে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি

যুক্তরাজ্যে করোনার মধ্যেই শিশুদের মাঝে নতুন রোগের হানা

দুর্নীতি প্রতিরোধে সাধারণের আইনগত প্রতিকার : প্রাসঙ্গিক আলোচনা

দুর্নীতি প্রতিরোধে সাধারণের আইনগত প্রতিকার : প্রাসঙ্গিক আলোচনা

আপডেট সময় ১২:৫৫:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

অ্যাডভোকেট মিছবাউর রহমান (আলম)

লেখক : আইনজীবী, জজ কোর্ট, সিলেট।

 

দেশে ক্রমবর্ধমান হারে দুর্নীতির বিস্তার ঘটছে। বিশ্বে দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে তলানীতে। ইতিপূর্বে বাংলাদেশ, বাংলাদেশ একাধিকবার দুর্নীতিতে বিশ্বে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল (TIB) এর সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনে দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮২টি দেশের মধ্যে ১৫০তম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বলা হয়ে থাকে, প্রতি বছর দেশে যে পরিমাণ দুর্নীতি হয়ে থাকে, তা দিয়ে কমপক্ষে তিনটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা যেত।

দুর্নীতির এই ক্রমবর্ধমান বিস্তারে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে এ দেশের সাধারণ জনগণ। দুর্নীতির কারণে সাধারণ জনগণ যেমন প্রতিনিয়ত ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, তেমনি তা দেশের অর্থনীতিতেও ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ নামে একটি সংস্থা গঠন করা হয়েছে এবং এই সংক্রান্তে বেশ কিছু আইনও প্রণীত হয়েছে। আইনী এসব কাঠামোর মাধ্যমে সাধারণ জনগণ দুর্নীতি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে কিভাবে প্রতিকার পেতে পারে, তাই মূলতঃ এই আলোচনার বিবেচ্য বিষয়।

দেশের সাধারণ জনগণের পক্ষে দুর্নীতি করার তেমন সুযোগ নাই। দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার মূলত হয় বা হচ্ছে চঁনষরপ ঝবৎাধহঃ বা সরকারী কর্মচারীদের দ্বারা। Public Servant কি তা দন্ডবিধির ২১ ধারায় এবংCriminal Law Amendment Act, ১৯৫৮ এর ২(বি) ধারায় সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এছাড়া এই সংজ্ঞার ব্যাখ্যায় মহামান্য হাইকোর্টও Public Servant সম্পর্কে আরো বিস্তৃত পরিসরে অভিমত প্রদান করেছেন। বর্ণিত দুটি আইনের সংজ্ঞায় ও মহামান্য উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত মোতাবেক Public Servant বলতে জনপ্রতিনিধি, সরকারী-আধা সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিচারক, বিচারালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিচারক কর্তৃক নিযুক্ত মধ্যস্থতাকারী, নির্বাচন কমিশনের অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইন দ্বারা নিগমিত বা গঠিত কোন স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, বিধিবদ্ধ সংস্থা, কর্পোরেশন বা প্রতিষ্ঠানের চেয়াম্যান, পরিচালক, ট্রাস্টি, কমিশনার, সদস্য এবং এর কর্মকর্তা-কর্মচারীগণকে বুঝায়। এছাড়া ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সাংবিধানিকভাবে গঠিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, চেয়ারম্যান, ট্রাস্টি, কর্মকর্তা-কর্মচারীগণও Public Servant মর্মে গণ্য হবেন।

দেশের ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪; দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা, ২০০৭; দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭; মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ ইত্যাদি আইন প্রণীত হয়েছে। এসব আইনে বা আইনের তফসিলে সংঘটিত অপরাধের বিচারের জন্য Criminal Law Amendment Act, ১৯৫৮ এর ৩ ধারার বিধানবলে স্পেশাল জজও নিয়োগ করা হয়েছে। বর্ণিত আইনবলে নিয়োগকৃত স্পেশাল জজ দুর্নীতির মামলার বিচার পরিচালনার ক্ষমতা প্রাপ্ত।

দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২(ঙ) ধারায় ‘দুর্নীতি’ বলতে উক্ত আইনের তফসিলে উল্লিখিত নিম্নলিখিত অপরাধকে বুঝায়-
ক) দুর্নীতি দমন কমিশন আইনে বর্ণিত অপরাধ;
খ) দন্ডবিধির ১৬১, ১৬২, ১৬৩, ১৬৪, ১৬৫, ১৬৫-এ, ১৬৫-বি, ১৬৬, ১৬৭, ১৬৮, ১৬৯, ২১৭, ২১৮ এবং ৪০৯ ধারার অপরাধসমুহ;
এবং
দন্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১, ৪৭৭-এ ধারার অধীন কোন অপরাধ সরকারী সম্পদ সম্পর্কিত হলে অথবা সরকারী কর্মচারী বা ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্তৃক দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনকালে সংঘটিত হলে কেবল সেক্ষেত্রে বর্ণিত অপরাধসমুহ;
গ) দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এর অধীন অপরাধসমুহ;
ঘ) মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর অধীন ঘুষ ও দুর্নীতি সংক্রান্ত অপরাধ সমুহ;
ঙ) উপরোক্ত ক-ঘ ক্রমিকে বর্ণিত যে কোন অপরাধের সহিত সংশ্লিষ্ট বা সম্পৃক্ত দন্ডবিধির ১০৯, ১২০-বি এবং ৫১১ ধারার অপরাধসমুহ;

সাধারণের বোধগম্যতার জন্য উপরোক্ত ‘ক’-‘ঙ’ দফায় বর্ণিত ধারাসমুহের অপরাধ কি তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরাও আবশ্যক, যাতে ঐ সব অপরাধ সংঘটিত হলে জনগণ এই প্রবন্ধে উল্লিখিতমতে এর প্রতিকার গ্রহণ করতে পারেন।

ক) দুর্নীতি দমন কমিশন আইনে বর্ণিত অপরাধ বলতে উক্ত আইনের ২৬, ২৭ ও ২৮-গ ধারার অপরাধকে বুঝায়।
২৬ ধারার বিধানমতে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনকারী কোন ব্যক্তি কমিশনের নির্দেশে দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন বিবরণ দাখিল করলে তা অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে;
২৭ ধারার বিধান অনুযায়ী কোন ব্যক্তি তার জ্ঞাত আয়ের সহিত অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জন করলে তা অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে;
একই আইনের ২৮-গ ধারায় কোন ব্যক্তি দুর্নীতি সংক্রান্ত অপরাধের বিষয়ে কমিশনে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য প্রদান করলে তাও অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে।

খ)
ধারা ১৬১ দন্ডবিধি: সরকারী কর্মচারী কর্তৃক আইনসম্মত পারিশ্রমিক ব্যতীত অন্য কোন পারিতোষিক তথা ঘুষ গ্রহণ।
ধারা ১৬২ দন্ডবিধি: সরকারী কর্মচারীকে প্রভাবিত করার জন্য দূর্নীতিপূর্ণ উপায়ে পারিতোষিক বা ঘুষ গ্রহণ।
ধারা ১৬৩ দন্ডবিধি: ব্যক্তিগত প্রভাব প্রয়োগের মাধ্যমে কোন সরকারী কর্মচারীকে কোন সরকারী কাজ করা বা কাজ করা থেকে বিরত থাকতে প্ররোচিত করতে তথা প্রভাবিত করতে পারিতোষিক বা ঘুষ গ্রহণ।
ধারা ১৬৪ দন্ডবিধি: দন্ডবিধির ১৬২ ও ১৬৩ ধারার বর্ণিত অপরাধ সংঘটনে কোন সরকারী কর্মচারীর সহায়তা প্রদান।
ধারা ১৬৫ দন্ডবিধি: সরকারী কর্মচারী কর্তৃক তার দায়িত্বের সহিত সম্পর্কিত কোন কার্য সম্পাদনের জন্য উক্ত কার্যের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিকট থেকে নিজের জন্য বা অন্য কোন ব্যক্তির জন্য পর্যাপ্ত বিনিময় ছাড়া কোন মূল্যবান বস্তু গ্রহণ।
ধারা ১৬৫-এ দন্ডবিধি: দন্ডবিধির ১৬১ ও ১৬৫ ধারার অপরাধ সংঘটিত হউক বা না হউক উক্তরূপ অপরাধ সংঘটনে সহায়তা প্রদান।
ধারা ১৬৫-বি দন্ডবিধি: কোন ব্যক্তি যদি কোন সরকারী কর্মচারীর কাছে ধারা ১৬১-এ উলি­খিত কোন পারিতোষিক বা ঘুষ প্রদানের জন্য বা ধারা ১৬৫-এ উলি­খিত কোন মূল্যবান বস্তু বিনা বিনিময়ে বা অপর্যাপ্ত বিনিময়ে প্রদানের জন্য প্ররোচিত, বাধ্য বা যবরদস্তির শিকার বা ভীতসন্ত্রস্ত্র হন, তাহলে তাকে ধারা ১৬১ বা ১৬৫ এর অধীন অপরাধের সহায়তাকারী হিসাবে গণ্য করা হবেন না।
ধারা ১৬৬ দন্ডবিধি: কোন ব্যক্তির ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে কোন সরকারী কর্মচারী কর্তৃক তার উপর আইন অনুযায়ী অর্পিত বা নির্দেশিত দায়িত্ব অমান্য করা।
ধারা ১৬৭ দন্ডবিধি: কোন ব্যক্তির ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে সরকারী কর্মচারী কর্তৃক জেনেশুনে কোন মিথ্যা দলিল প্রস্তুত বা অনুবাদ করা।
ধারা ১৬৮ দন্ডবিধি: আইনতঃ ব্যবসায় নিযুক্ত না হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, এমন কোন সরকারী কর্মচারী কর্তৃক ব্যবসায় নিযুক্ত হওয়া।
ধারা ১৬৯ দন্ডবিধি: কোন সরকারী কর্মচারী কর্তৃক কোন সম্পত্তি ক্রয় করতে বা ক্রয়ের জন্য দরপত্রে অংশ না নিতে আইনতঃ বাধা থাকা সত্তে¡ও নিজের নামে বা অন্যের নামে সম্পত্তি ক্রয় করা বা ক্রয়ের জন্য দরপত্রে অংশগ্রহণ করা।
ধারা ২১৭ দন্ডবিধি: সরকারী কর্মচারী কর্তৃক আইনী নির্দেশ অমান্য করে জেনেশুনে কোন ব্যক্তিকে আইনগত শাস্তি থেকে রক্ষা করা বা কোন ব্যক্তিকে তার প্রাপ্য শাস্তি থেকে কম শাস্তি প্রদান করা বা কোন বাজেয়াপ্তী হওয়ার আইনানুযায়ী যোগ্য কোন সম্পত্তিকে বাজেয়াপ্তী হওয়া থেকে রক্ষা করা বা আইনানুযায়ী কোন সম্পত্তির উপর আরোপযোগ্য অন্য কোন দায় বা দাবীর হাত থেকে এটিকে রক্ষা করা।
ধারা ২১৮ দন্ডবিধি: সরকারী কর্মচারী কর্তৃক কোন ব্যক্তিকে শাস্তি বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্তি হওয়া থেকে রক্ষা করার বা কারো ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে ভুল রেকর্ড বা দলিল প্রস্তুত করা।
ধারা ৪০৯ দন্ডবিধি: কোন সরকারী কর্মচারী কর্তৃক তার পদমর্যাদা বলে কিংবা ব্যাংকার, ব্যবসায়ী (Merchant), ফ্যাক্টর (Factor), ব্রোকার (Broker), অ্যাটর্নী (Attorney) বা এজেন্ট কর্তৃক ব্যবসার সূত্রে কোনভাবে কোন সম্পত্তির জিম্মাদার হয়ে বা উক্ত সম্পত্তি পরিচালনার আমানতদার হয়ে অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ করে উক্তরূপ আমানতের খেয়ানত করা;
এবং
ধারা ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১, ৪৭৭-এ ধারার অধীন অপরাধ সরকারী সম্পত্তি সম্পর্কিত হলে-
অর্থাৎ সরকারী সম্পদ সম্পর্কিত বিষয়ে সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্তৃক দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনকালে প্রতারণা, জালিয়াতি, প্রতারণার উদ্দেশ্যে জালিয়াতি, জালিয়াতির মাধ্যমে সৃষ্ট দলিলাত খাঁটি হিসাবে ব্যবহার এবং মিথ্যা ও জাল হিসাবপত্র প্রণয়ন বা হিসাবপত্র বিনষ্ট করার অপরাধ।
গ) দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ অধীন অপরাধসমুহ:-
দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এর ৫ ধারায় উক্ত আইনের অধীন অপরাধের বিবরণ ও শাস্তির উলে­খ করা হয়েছে। পাঠকদের অবগতির জন্য তা তুলে ধরা হলো-
কোন সরকারী কর্মচারী কর্তৃক কোন ব্যক্তির নিকট হতে নিজের জন্য বা অন্য কোন ব্যক্তির জন্য আইনসম্মত পারিশ্রমিক ব্যতীত কোন পারিতোষিক গ্রহণ করা, আদায় করা, গ্রহণ করতে সম্মত হওয়া, গ্রহণের চেষ্টা করা এবং তা দন্ডবিধির ১৬১ ধারায় উল্লিখিত কোন কাজের প্রেরণা বা পুরষ্কার হিসাবে গ্রহণ করা;
অথবা
কোন সরকারী কর্মচারী কর্তৃক সরকারী কার্যাবলী সম্পর্কিত কোন কাজে নিজের জন্য বা অন্য কোন ব্যক্তির জন্য উক্ত কাজের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অন্য কোন ব্যক্তির নিকট হতে কোন মূল্যবান বস্তু বিনা বিনিময়ে বা অপর্যাপ্ত বিনিময়ে গ্রহণ করা;
অথবা
কোন সরকারী কর্মচারী কর্তৃক অসৎভাবে বা প্রতারণামূলকভাবে সরকারী কর্মচারী হিসাবে তার কাছে অর্পিত কোন সম্পত্তি আত্মসাৎ করা বা অন্য কোনভাবে নিজের ব্যবহারে রূপান্তর করা অথবা অন্য কোন ব্যক্তিকে তা করতে দেওয়া;
অথবা
কোন সরকারী কর্মচারী কর্তৃক তার কাজের অমর্যাদা করে দুর্নীতিপূর্ণ বা বেআইনী উপায়ে নিজের জন্য বা অন্য কোন ব্যক্তির জন্য কোন মূল্যবান বস্তু বা আর্থিক সুবিধা অর্জন করা বা অর্জনের চেষ্টা করা;
অথবা
কোন সরকারী কর্মচারী নিজে বা তার নির্ভরশীল ব্যক্তি কর্তৃক এমন কোন আর্থিক সম্পদ বা সম্পত্তির দখলে থাকা, যার ব্যাপারে সরকারী কর্মচারী হিসাবে তিনি সন্তোষজনক জবাব দিতে অক্ষম এবং যা তার জ্ঞাত আয়ের সহি অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

কোন সরকারী কর্মচারীর ক্ষেত্রে উপরোক্ত কাজ অপরাধমূলক অসদাচরণ মর্মে গণ্য হবে এবং এইরূপ অপরাধমূলক অসদাচরণ করলে বা করার চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্ট সরকারী কর্মচারী উক্ত আইনের ৫(২) ধারামতে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদন্ডে ও অর্থদন্ডে অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন। এছাড়াও যে আর্থিক সম্পদ বা সম্পত্তির সহিত অপরাধমূলক অসদাচরণ সম্পর্কিত, তা রাষ্ট্রের অনুক‚লে বাজেয়াপ্ত হবে।

ঘ) মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর ২(ট) এর বিধান অনুযায়ী মানি লন্ডারিং অর্থ-
১) সম্পৃক্ত অপরাধ (Predicate offence) সংঘটনের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ বা সম্পত্তির অবৈধ উৎস গোপন বা আড়াল করার উদ্দেশ্যে এর হস্তান্তর, রূপান্তর, বিদেশে প্রেরণ বা বিদেশ হতে বাংলাদেশে প্রেরণ বা আনা বা বৈধ বা অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ বা সম্পত্তি বিদেশে পাচার।

২) কোন আর্থিক লেনদেন এরূপভাবে সম্পন্ন করা বা সম্পন্ন করার চেষ্টা করা, যাতে এই অধ্যাদেশের অধীন একটি রিপোর্ট করার প্রয়োজন হবে না।

৩) এরূপ কোন কাজ করা, যার দ্বারা উক্তরূপ অর্থ বা সম্পত্তির অবৈধ উৎস গোপন বা আড়াল করা হয় বা এরূপ কাজ সম্পাদনের চেষ্টা করা বা অনুরূপ কাজ সম্পাদনে সজ্ঞানে সহায়তা বা ষড়যন্ত্র করা।

উপরোক্ত মানি লন্ডারিংয়ের সংজ্ঞায় বর্ণিত অপরাধ করলে বা অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা, সহায়তা বা ষড়যন্ত্র করলে একই আইনের ৪ ধারায় অপরাধ সংঘটনকারী ব্যক্তি কমপক্ষে ৬ মাস এবং সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদন্ডে দন্ডিত হবেন এবং অপরাধের সহিত সম্পৃক্ত সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুক‚লে বাজেয়াপ্ত হবে মর্মে বিধান সন্নিবেশিত হয়েছে। তবে সম্পৃক্ত অপরাধ (চৎবফরপধঃব ড়ভভবহপব) এর ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে সংঘটিত লন্ডারিংয়ের অপরাধই কেবল দুর্নীতি দমন কমিশন আইনে বিচারযোগ্য হবে।

ঙ) কোন ব্যক্তি যদি উপরোক্ত ‘ক-ঘ’ দফায় বর্ণিত অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করেন বা উক্তরূপ অপরাধ সংঘটনের জন্য ষড়যন্ত্র করেন কিংবা এরূপ অপরাধ সংঘটন করার বা করার চেষ্টা করেন, তবে তিনি যথাক্রমে দন্ডবিধির ১০৯, ১২০-বি ও ৫১১ ধারার আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ সংঘটন করেছেন মর্মে গণ্য হবে।

দুর্নীতি দমন কমিশন আইনে মূলতঃ উপরোক্ত অপরাধ সমুহের অনুসন্ধান, তদন্ত ও বিচার কার্য পরিচালিত হয়ে থাকে।

উপরোক্ত অপরাধসমুহ সংঘটিত হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি কিভাবে আইনগত পদক্ষেপ নিতে পারেন তাও আইনে সুনির্দিষ্টভাবে উলে­খ আছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন নিজেও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে উপরোক্ত তফসিলে বর্ণিত অপরাধ সংঘটনকারীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান, মামলা দায়ের, তদন্ত পরিচালনা ও অভিযোগপত্র দাখিলের পূর্ণ ক্ষমতাবান।

দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা, ২০০৭ এর ৩ ও ৪ ধারায় দুর্নীতি সংক্রান্ত উপরোক্ত অপরাধের অভিযোগ দায়েরের বিধান সন্নিবেশিত হয়েছে। ৩ ধারার বিধান অনুযায়ী কোন ব্যক্তি দুর্নীতি সংক্রান্ত উপরোক্ত অপরাধ সংক্রান্ত বিষয়ে কমিশনের জেলা কার্যালয় বা বিভাগীয় কার্যালয় বা প্রধান কার্যালয়ে অভিযোগ দাখিল করতে পারবে এবং অভিযোগ দাখিলকারী ব্যক্তি চাইলে তার অভিযোগ দাখিলের প্রমাণ হিসাবে সংশ্লিষ্ট কার্যালয় অভিযোগ প্রাপ্তি নম্বর ও তারিখ সম্বলিত একটি রশিদ প্রদান করবেন।

অভিযোগ প্রাপ্তির পর দুর্নীতি দমন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কার্যালয় ঐ কার্যালয়ে রক্ষিত রেজিস্ট্রারে অভিযোগটি সংরক্ষণ করে তা বিধিমালা ৫ এর অধীনে গঠিত একই কার্যালয়ের যাচাই বাছাই কমিটির পরবর্তী সভায় উপস্থাপন করবেন। যাচাই বাছাই কমিটি অভিযোগের সমর্থনে প্রাথমিক তথ্য ও উপাত্ত বিবেচনা করে যে সব অভিযোগের অনুসন্ধান কার্য পরিচালনা করা আবশ্যক মনে করবেন, তার একটি তালিকা প্রস্তুত করতঃ এইসব অভিযোগের অনুসন্ধানের সুপারিশ প্রধান কার্যালয় বরাবরে প্রেরণ করবেন। প্রধান কার্যালয় অনুসন্ধানের জন্য নির্ধারিত অভিযোগসমুহের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য তা দায়িত্ব প্রাপ্ত কমিশনারের নিকট উপস্থাপন করবেন। সংশ্লিষ্ট কমিশনার তার নিকট উপস্থাপিত যে সকল অভিযোগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন, ঐ সকল অভিযোগের অনুসন্ধানের জন্য তা দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তার নিকট প্রেরণ করবেন।

৪ ধারার বিধান অনুযায়ী দুর্নীতির অপরাধ সংক্রান্তে যে কেউ সংশ্লিষ্ট থানায়ও অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন। এই ক্ষেত্রে অভিযোগ প্রাপ্তির পর সংশ্লিষ্ট থানা কর্তৃপক্ষ তা জিডি আকারে লিপিবদ্ধ করে আইনানুযায়ী উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উহা কমিশন বহিভর্‚ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জেলা কার্যালয়ে এবং কমিশনে কর্মরত কোন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে কমিশনের প্রধান কার্যালয় বরাবরে প্রেরণ করবেন। এইরূপ অভিযোগ প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও কমিশন পূর্বে উলি­খিতমতে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

তবে যাচাই বাছাইয়ে প্রাথমিক তথ্য ও উপাত্ত বিবেচনা করে যে সব অভিযোগের অনুসন্ধান অনাবশ্যক মর্মে বিবেচিত হবে, যাচাই বাছাই কমিটি তা অনুসন্ধানের জন্য নির্বাচিত করবেন না।

অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা অনুসন্ধানের নির্দেশ প্রাপ্তির পর অনুসন্ধান কার্য সম্পাদন করে তার প্রতিবেদন নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তার নিকট প্রেরণ করবেন। অতঃপর কমিশন উপস্থাপিত অনুসন্ধান প্রতিবেদন বিচার বিশ্লেষণ করে এজাহার দায়েরের জন্য উক্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ প্রদান করবেন বা ক্ষেত্রমত কার্যক্রম পরিসমাপ্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।

কমিশন কর্তৃক উক্তরূপে এজাহার দায়েরের নির্দেশ প্রদান করা হলে বা কার্যক্রমটির পরিসমাপ্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলে তা অভিযোগকারীকে এবং ক্ষেত্রমত অভিযুক্ত ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বরাবরে রেজিস্ট্রি ডাকযোগে বা বাহক মারফত অবহিত করতে হবে। কেবল পরিসমাপ্তির ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে উক্তরূপে অবহিত করতে হবে।

এভাবে অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধানের পর এজাহার দায়েরের সিদ্ধান্ত প্রদত্ত হলে দুর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দ্বারা তাতে তদন্তকার্য পরিচালিত হবে। তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র বা চুড়ান্ত প্রতিবেদন বিষয়ে অনুমোদনের জন্য তা দুর্নীতি দমন কমিশন বরাবরে প্রেরিত হবে। কমিশনের অনুমোদন ব্যতীত অভিযোগপত্র দাখিল করা যাবে না এবং অনুমোদনবিহীন অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে আদালত অপরাধ বিচারকার্য আমলে গ্রহণ করবেন না।

দুর্নীতি দমন কমিশন কর্তৃক অভিযোগপত্র দাখিলের পর সংশ্লিষ্ট সিনিয়র স্পেশাল জজ অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অপরাধ আমলে নিবেন। অতঃপর ফৌজদারী কার্যবিধিতে বর্ণিত সকল প্রক্রিয়া সম্পন্নের পর মামলা বিচারের জন্য প্রস্তুত হলে তা বিচার ও নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট স্পেশাল জজ বরাবরে প্রেরণ করবেন। স্পেশাল জজ তার উপর অর্পিত ক্ষমতাবলে বিচার কাজ পরিচালনা করবেন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের তফসিলভ‚ক্ত অপরাধের বিষয়ে সরাসরি আদালতে কোন অভিযোগ দায়ের করা যায় না। উপরোক্তমতে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দাখিল করতে হয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশন উপরোক্তমতে অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন।

আইনানুযায়ী প্রতিটি জেলায় বা মহানগরের সিনিয়র স্পেশাল জজ দুর্নীতি সংক্রান্ত অপরাধ আমলে নেওয়ার আইনগত ক্ষমতাপ্রাপ্ত হন। সাধারণত প্রতিটি জেলার দায়রা জজ ও মহানগরের মহানগর দায়রা জজ নিজ নিজ অধিক্ষেত্রের সিনিয়র স্পেশাল জজ হিসাবে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। যদি সিনিয়র স্পেশাল জজ এই মর্মে সন্তুষ্ট হন যে, তার স্থানীয় অধিক্ষেত্রের মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের তফসিলভ‚ক্ত কোন অপরাধ সংঘটিত হয়েছে মর্মে বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে এবং উক্তরূপ অপরাধ সংঘটনের বিষয়ে অভিযোগকারীর দাখিলকৃত অভিযোগের ভিত্তিতে যুক্তিযুক্ত কারণ ছাড়া কমিশন তদন্ত কার্যক্রমে অগ্রসর হয় নাই বা কমিশন অভিযোগকারীর দাখিলা অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান বা তদন্তের নির্দেশ দানে দীর্ঘ বিলম্ব করছে, তবে আদালত অভিযোগটি সরাসরি গ্রহণ করে তা তদন্তের জন্য কমিশন বরাবরে প্রেরণ করবেন। অর্থাৎ দুর্নীতি সংক্রান্ত অপরাধের প্রতিকারের জন্য প্রথমে কমিশন বরাবরে অভিযোগ দাখিল করা আবশ্যক। কমিশন অভিযোগের ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ না করলেই কেবল আদালতে সরাসরি অভিযোগ দাখিল করা যাবে, অন্যথায় নয়।

দুর্নীতি সংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগ দায়েরের পূর্বে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরী। অভিযোগকারী যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ সাপেক্ষে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করবেন। যদি কেবল হয়রানির জন্য কেউ মিথ্যা বা ভিত্তিহীন অভিযোগ দায়ের করেন, তবে আইনে তার জন্য শাস্তির বিধানও সংযুক্ত করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন’ ২০০৪ এর ২৮(গ) ধারামতে যদি কেউ মিথ্যা জেনে বা তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে ভিত্তিহীন কোন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযোগ দাখিল বা প্রদান করেন, তবে তিনি মিথ্যা তথ্য প্রদান করেছেন মর্মে গণ্য হবে এবং এই অপরাধে তিনি সর্বোচ্চ ৫ বছর বা অন্যুন ২ বছর কারাদন্ড ও অর্থদন্ডে বা উভয় দন্ডে দন্ডনীয় হবেন। তথ্য প্রদানকারী কমিশনের বা অন্য কোন সরকারী দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী হলে তার ক্ষেত্রেও এমন দন্ড প্রযোজ্য হবে। কাজেই মিথ্যা, ভিত্তিহীন এবং তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে দুর্নীতি সংক্রান্ত কোন অপরাধের অভিযোগ দাখিল না করাই শ্রেয়, অন্যথায় অভিযোগকারীই উল্টো বিপদগ্রস্থ হবেন।

দেশের সিংহভাগ দুর্নীতি সংক্রান্ত অপরাধ মূলতঃ সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীদের দ্বারা বা তাদের যোগসাজশে সংঘটিত হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ৩২-ক ধারায় সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বিচারকদের বিরুদ্ধে মামলা রুজুর ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আইনের এই ধারা দুর্নীতিগ্রস্থ সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারী ও বিচারকদের রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করবে এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে তা মারাত্মক অন্তরায়। মহামান্য হাইকোর্ট Human Rights and Peace for Bangladesh Vrs Hon’ble Speaker, Bangladesh Jati“a Sangsad (67 DLR 19) মামলার রায়ে আইনের এই ধারাটিকে সংবিধানে প্রদত্ত আইনের চোখে সবাই সমান এবং মৌলিক অধিকারের সহিত সাংঘর্ষিক মর্মে অভিমত প্রদান করেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের এই ধারাটি রহিত করা হলে দুর্নীতিগ্রস্থ বিচারক ও সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার সাহস হারাবেন এবং তাদের লাগাম দুর্নীতির রাশ টেনে ধরা সম্ভব হবে। কাজেই সরকার প্রকৃতই যদি দুর্নীতি দমনে আন্তরিক হন, তবে আমলাদেরকে চাপে সংযুক্ত করা এই ধারাটি রহিত করে দুর্নীতি দমনের পথ প্রশস্ত করবেন, সাধারণ নাগরিকরা তাই প্রত্যাশা করেন।
লেখক : আইনজীবী, জজ কোর্ট, সিলেট।