দর্পণ রিপোর্ট : ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরকারি পরিষেবা নিয়ে অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ১৭ অক্টোবর শনিবার দেশের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক সহিংসতা, ভাঙচুর ও লুটপাটে রূপ নেয়। এতে বিপুলসংখ্যক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দোকানের কাচ ভাঙচুর, পণ্য লুট, অগ্নিসংযোগ এবং সরকারি স্থাপনায় হামলার ঘটনায় ব্যবসায়ী ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের আর্থিক পুনরুদ্ধার ও ক্ষতিপূরণের দাবিও জোরালো হচ্ছে। খবর রয়টার্স ও ফ্রান্সের বিভিন্ন গণমাধ্যমের।
ফরাসি সংবাদপত্র ল্য মোঁন্দ ও ল্য পারিজিয়াঁ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সজুড়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। খুচরা ব্যবসায়ীদের সংগঠন Fédération du commerce et de la distribution-এর সভাপতি আলেক্সান্দ্র বোঁপার্দ ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ কয়েক শ মিলিয়ন ইউরো হতে পারে বলে জানিয়েছেন। তবে এটি প্রাথমিক হিসাব; পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতির নিরীক্ষা এখনো সম্পন্ন হয়নি।
এদিকে বিক্ষোভ ও সহিংসতায় কয়েক ডজন বাংলাদেশী মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নির্বিচার লুটপাট, হামলা ,ভাংচুর এর শিকার হয়েছে। অনেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পথে বসায় জোগাড় হয়েছে। গার দ্য নর্দের ব্যবসায়ী পলাশ ভূইয়ার দোকানের সবকিছু লুটে নিয়ে যায় সহিংসতাকারীরা। তিনি আক্ষেপ করে বলছিলেন তার সব কিছু শেষ করে দিছে বিক্ষোভের নামে লুটেরাদের দল। সরকারের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে স্থানীয় মেরিতে যোগাযোগের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। প্রায় কয়েক ডজন বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

বিক্ষোভ থেকে সহিংসতা, একাধিক শহরে ক্ষয়ক্ষতি
রয়টার্সের ১৮ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবারের বিক্ষোভে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে কয়েক লাখ মানুষ অংশ নেন। অনেক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও কিছু স্থানে সহিংস গোষ্ঠী পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় এবং দোকানপাট ও সরকারি স্থাপনায় হামলা চালায়।
রাজধানী প্যারিসে অভিজাত ব্র্যান্ডের দোকান, সুপারমার্কেট ও অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে লুটপাটের ঘটনা ঘটে। লিমোজ শহরে ঐতিহাসিক নগর ভবনের একটি অংশ অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মার্সেইয়ে নগর ভবনে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। বোর্দো শহরেও একাধিক দোকান লুট করা হয় এবং স্থানীয় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লিয়োঁসহ অন্যান্য শহরেও অস্থিরতার খবর পাওয়া গেছে।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সহিংসতা ও লুটপাটের নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সহিংসতার কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা নেই এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা হবে। তিনি নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে পরিস্থিতির পেছনে থাকা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য সরকারের কী উদ্যোগ?
সহিংসতার পর ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো—দোকান মেরামত, লুট হওয়া পণ্যের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া, কর্মচারীদের বেতন দেওয়া এবং ব্যবসা পুনরায় চালু করার অর্থ কোথা থেকে আসবে। এ পরিস্থিতিতে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন কয়েকটি উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। তবে ১৮ অক্টোবর রাত পর্যন্ত দেশজুড়ে সব ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীর জন্য নির্দিষ্ট অঙ্কের সরকারি ক্ষতিপূরণ বা সর্বজনীন অনুদান ঘোষণার তথ্য পাওয়া যায়নি।
১. ব্যবসায়ী, ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জরুরি বৈঠক:
ফ্রান্সের অর্থ মন্ত্রণালয়ের ১৮ অক্টোবরের সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা, বাণিজ্য, কারুশিল্প, পর্যটন ও ক্রয়ক্ষমতাবিষয়ক মন্ত্রী সের্ঝ পাপাঁ ১৯ অক্টোবর সকাল ৯টায় প্যারিসের বের্সিতে ব্যবসায়ী সংগঠন, খুচরা বিক্রেতা, কারুশিল্পী, রেস্তোরাঁ মালিক, ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করবেন। বৈঠকে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব, অর্থনৈতিক প্রভাব এবং ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মেরামত ও ব্যবসা টিকিয়ে রাখার সম্ভাব্য সহায়তা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা।
২. প্যারিসে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য জরুরি সহায়তা সেল
প্যারিস নগর কর্তৃপক্ষ ১৮ অক্টোবর জানিয়েছে, সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য একটি জরুরি সহায়তা সেল গঠন করা হচ্ছে। এর কাজ হবে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ, প্রশাসনিক ও বিমাসংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় ব্যবসায়ীদের সহায়তা এবং ব্যবসা পুনরায় চালু করার উদ্যোগ সহজ করা। এ কাজে প্যারিসের বাণিজ্য ও শিল্প চেম্বার এবং কারুশিল্প চেম্বারকে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
৩. মার্সেইয়ে জরুরি আর্থিক সহায়তা : রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্সেইয়ের মেয়র বেনোয়া পায়াঁ সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য জরুরি আর্থিক সহায়তা ঘোষণা করেছেন। এটি স্থানীয় পর্যায়ে সরাসরি সহায়তার একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ। তবে ১৮ অক্টোবরের প্রতিবেদনে সহায়তার নির্দিষ্ট অঙ্ক, যোগ্যতার শর্ত এবং অর্থ বিতরণের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ পাওয়া যায়নি।
৪. ক্ষতিপূরণ দ্রুত দেওয়ার দাবি ও বিমার জটিলতা :
ল্য মোঁদ ও ল্য পারিজিয়াঁ জানিয়েছে, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো ক্ষতিপূরণ প্রদানের প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসার ক্ষেত্রে দোকান মেরামত, পণ্যের ক্ষতি, সাময়িকভাবে ব্যবসা বন্ধ থাকা এবং বিক্রি কমে যাওয়ার কারণে নগদ অর্থের সংকট দেখা দিতে পারে।
বিমা থাকলেও সব ধরনের ব্যবসায়িক ক্ষতি বা আয় বন্ধ থাকার ক্ষতি পলিসিতে অন্তর্ভুক্ত থাকে না। তাই দোকানের কাঠামোগত ক্ষতির পাশাপাশি হারানো আয় ও চলমান খরচ কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন।
ব্যবসায়ীদের সামনে সবচেয়ে বড় সংকট
ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত আর্থিক পরিমাণ নির্ধারণে সময় লাগতে পারে। একটি দোকানের কাচ ভাঙা বা পণ্য লুট হওয়ার হিসাব তুলনামূলকভাবে দ্রুত করা গেলেও, দীর্ঘদিন দোকান বন্ধ থাকলে হারানো বিক্রি, কর্মচারীদের বেতন, ভাড়া, ঋণের কিস্তি এবং পুনরায় ব্যবসা চালুর খরচ নির্ধারণ জটিল হয়ে ওঠে।
ল্য মোঁদ-এর প্রতিবেদনে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর উদ্বেগ তুলে ধরে বলা হয়েছে, কিছু গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দোকান দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকতে পারে। বিশেষ করে অল্প কর্মচারী নিয়ে পরিচালিত ক্ষুদ্র ও স্বতন্ত্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী বন্ধ তাদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সরকারের সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ
ফরাসি সরকারের সামনে এখন দুটি বিষয় একসঙ্গে মোকাবিলা করার প্রয়োজন রয়েছে। প্রথমত, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সহিংসতা ও লুটপাটে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো। দ্বিতীয়ত, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কার্যক্রম দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।
প্রেসিডেন্ট মাখোঁ নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ নিয়ে আলোচনার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে অর্থ মন্ত্রণালয় ব্যবসায়ী, ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব ও সম্ভাব্য সহায়তা নির্ধারণের পথে এগোচ্ছে। তবে এসব পদক্ষেপের বাস্তব ফল নির্ভর করবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো কত দ্রুত সহায়তা পায় এবং ক্ষতিপূরণের প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর হয় তার ওপর।
ফ্রান্সে ১৭ অক্টোবরের সহিংসতা শুধু আইনশৃঙ্খলার সংকট তৈরি করেনি; খুচরা বাণিজ্য, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ওপরও বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পরিস্থিতির ব্যাপকতা তুলে ধরে। কয়েক শ মিলিয়ন ইউরোর সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির হিসাবও এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের সহায়তার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে—বিশেষ করে ১৯ অক্টোবরের জাতীয় পর্যায়ের বৈঠক এবং প্যারিস ও মার্সেইয়ের স্থানীয় পদক্ষেপের মাধ্যমে। কিন্তু দেশব্যাপী ক্ষতিগ্রস্ত সব ব্যবসায়ীর জন্য নির্দিষ্ট অঙ্কের ক্ষতিপূরণ বা নগদ অনুদান নিশ্চিত করা হয়েছে—এমন তথ্য ১৮ অক্টোবর রাত পর্যন্ত প্রকাশিত সূত্রগুলোতে পাওয়া যায়নি।
তাই আগামী দিনের প্রধান নজর থাকবে সরকারের বৈঠকের সিদ্ধান্ত, বিমা দাবি নিষ্পত্তির গতি, জরুরি আর্থিক সহায়তার পরিধি এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কত দ্রুত কার্যক্রম শুরু করতে পারে তার ওপর।




















