বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত এই নির্বাচনে দলটি শক্তিশালী জনসমর্থন পেয়েছে। বার্তা সংস্থা এপির রিপোর্টে এভাবেই মূল্যায়ন করা হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন ২০২৪ সালে জেনারেশন জেড নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম জাতীয় ভোট। ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের মুসলিম-অধ্যুষিত দেশটিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি স্পষ্ট ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছিল। শেখ হাসিনাবিরোধী সহিংস অস্থিরতার কয়েক মাস দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত করে এবং দেশের প্রধান শিল্প, বিশেষত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক খাত গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই নির্বাচনটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ অঞ্চলজুড়ে ৩০ বছরের নিচের তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় ভোটও বটে। প্রতিবেশী নেপালও মার্চে নির্বাচন আয়োজন করতে যাচ্ছে।
বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা
জনমত জরিপে বিএনপিকে এগিয়ে রাখা হয়েছিল এবং দলটি সেই পূর্বাভাস সত্য প্রমাণ করেছে। বিএনপি-নেতৃত্বাধীন জোট ৩০০ আসনের জাতীয় সংসদে ২১৩টি আসন জিতে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বলে মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে। রাতভর ভোটগণনার পর সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দলটি জনগণকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানায় এবং শুক্রবার দেশের কল্যাণে বিশেষ দোয়া আয়োজনের আহ্বান জানায়। এক বিবৃতিতে বিএনপি জানায়, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করলেও কোনো বিজয় মিছিল বা শোভাযাত্রা আয়োজন করা হবে না।’ দলটি দেশজুড়ে মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডায় প্রার্থনার আহ্বান জানায়। বিএনপির নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রিত্বের সম্ভাব্য প্রার্থী তারেক রহমান। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জীবিত একমাত্র পুত্র।
প্রতিদ্বন্দ্বীদের অবস্থান
বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতা ডা. শফিকুর রহমান পরাজয় স্বীকার করেছেন। তার নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৬৮টি আসন। তিনি বলেন, জামায়াত ‘শুধু বিরোধিতার রাজনীতি’ করবে না। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমরা ইতিবাচক রাজনীতি করব।
ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি), যারা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল এবং জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ ছিল, তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ৩০ আসনের মধ্যে মাত্র ৫টি আসনে জয় পেয়েছে।
প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন
ভূমিধস ফলাফলের পরও এই নির্বাচনকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের প্রথম প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক ভোট হিসেবে দেখা হচ্ছিল। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ, যা তার ক্ষমতাচ্যুতি পর্যন্ত ১৫ বছরের বেশি সময় দেশ শাসন করেছে, এবারে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। ভোটার উপস্থিতি ২০২৪ সালের নির্বাচনে রেকর্ড হওয়া ৪২ শতাংশের তুলনায় বেশি হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, নিবন্ধিত ভোটারদের ৬০ শতাংশেরও বেশি ভোট দিয়েছেন। ব্যালটে ছিলেন দুই হাজারের বেশি প্রার্থী, যার মধ্যে অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থীও ছিলেন। অন্তত ৫০টি রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছে, যা একটি জাতীয় রেকর্ড। একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে একটি আসনে ভোট স্থগিত করা হয়েছে।
শেখ হাসিনার প্রতিক্রিয়া
ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর দেয়া এক বিবৃতিতে শেখ হাসিনা এই নির্বাচনকে ‘পরিকল্পিত প্রহসন’ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, তার দল ছাড়া এবং প্রকৃত ভোটার অংশগ্রহণ ছাড়া এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের সমর্থকরা এই প্রক্রিয়া প্রত্যাখ্যান করেছে বলেও দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন, আমরা এই ভোটারবিহীন, অবৈধ ও অসাংবিধানিক নির্বাচন বাতিলের দাবি জানাই। আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানাই।
অন্যদিকে শেখ হাসিনার বিরোধীরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে তার শাসনামলে নির্বাচনগুলো প্রায়ই বয়কট, ভীতি প্রদর্শন এবং অনিয়মের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।

















