ঢাকা ০৪:৪১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্বকাপ ফুটবলের যতো অঘটন!

  • আপডেট সময় ০৯:০০:২২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
  • ১৫ বার পড়া হয়েছে

স্পোর্টস ডেস্ক

বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই কোটি কোটি ভক্তের আবেগ, উন্মাদনা আর মাঠের সবুজ ঘাসে সেরাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াই। কিন্তু ফুটবল বিধাতা মাঝে মাঝেই এমন কিছু চিত্রনাট্য লেখেন যা রূপকথাকেও হার মানায়। যেখানে সমস্ত সমীকরণ ওলটপালট করে দিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায় কোনো আন্ডারডগ (দুর্বল) দল, স্তব্ধ হয়ে যায় পরাশক্তিরা। ফুটবল বিশ্বকাপের শতবর্ষের ইতিহাসে এমন কিছু অবিশ্বাস্য অঘটন ঘটেছে, যা আজও ক্রীড়াপ্রেমীদের মনে বিস্ময় জাগায়।

সবচেয়ে প্রাচীন এবং বড় ধাক্কাটি এসেছিল ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপে। সেবার বিশ্ব ফুটবলের অবিসংবাদিত রাজা হিসেবে ব্রাজিল খেলতে গিয়েছিল ইংল্যান্ডের তারকাখচিত দলটি। কিন্তু তাদের অহংকার চূর্ণ করে দেয় একদল পার্ট-টাইম ফুটবলার নিয়ে গড়া অনভিজ্ঞ যুক্তরাষ্ট্র। ডাকপিয়ন, শিক্ষক আর থালাবাসন মাজার পেশায় যুক্ত সাধারণ আমেরিকান ফুটবলাররা সেদিন ইংল্যান্ডের বিশ্বসেরা আক্রমণভাগকে রুখে দিয়ে ১-০ গোলের এক রূপকথার জয় ছিনিয়ে নিয়েছিল।
যা আজও বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে বিবেচিত হয়। 

ঠিক এর চার বছর পর, ১৯৫৪ সালে ফুটবল বিশ্ব প্রত্যক্ষ করে ‘মিরাকল অব বার্ন’। সে সময়ের হাঙ্গেরি দলটিকে বলা হতো ইতিহাসের অন্যতম সেরা অপরাজেয় শক্তি, যাদের নেতৃত্বে ছিলেন মহান পুসকাস। টুর্নামেন্টের শুরুতেই পশ্চিম জার্মানিকে ৮-৩ গোলে বিধ্বস্ত করা হাঙ্গেরি ফাইনালে যখন মাত্র আট মিনিটে দুই গোলে এগিয়ে যায়, তখন সবাই ভেবেছিল ম্যাচ শেষ।

কিন্তু জার্মানদের ইস্পাতকঠিন মানসিকতার কাছে নতিস্বীকার করে হাঙ্গেরি। দুর্দান্ত এক ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প লিখে পশ্চিম জার্মানি ৩-২ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেয়। 

স্নায় যুদ্ধের আবহে ১৯৬৬ সালে আরেকটি নাটকীয়তার জন্ম দেয় উত্তর কোরিয়া। ভিসা পাওয়া নিয়ে জটিলতা কাটিয়ে ইংল্যান্ডের মাটিতে পা রাখা এই দলটির মুখোমুখি হয়েছিল দুই বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে ইতালির চোট আঘাতের সুযোগ নিয়ে পাক দু ইকের করা একমাত্র ঐতিহাসিক গোলে আজ্জুরিদের টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করে দেয় উত্তর কোরিয়া।

এই ম্যাচটি এতটাই আইকনিক যে, যেখানে গোলটি হয়েছিল, সেই স্টেডিয়ামটি ভেঙে আবাসন গড়ার পরও সেই নির্দিষ্ট স্থানটি আজও লোহার স্টাড দিয়ে চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। 

এরপর ১৯৮২ সালে নবাগত আলজেরিয়া বিশ্বমঞ্চে এমন  বিস্ফোরণ ঘটায় যা কেউ কল্পনাও করেনি। তৎকালীন ইউরো চ্যাম্পিয়ন এবং দুই বারের বিশ্বসেরা পশ্চিম জার্মানি ম্যাচ শুরুর আগে আলজেরিয়াকে পাত্তাই দেয়নি। কিন্তু মাঠের খেলায় চরম অহংকারী জার্মানদের স্তব্ধ করে দিয়ে ২-১ গোলের অবিশ্বাস্য জয় তুলে নেয় আলজেরিয়া। লাখদার বেলৌমির সেই জয়সূচক গোলটি বিশ্ব ফুটবলে আফ্রিকার উত্থানের এক নতুন বার্তা দিয়েছিল।

আফ্রিকান ফুটবলের সেই অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার আরেকটি বড় প্রমাণ মেলে ১৯৯০ সালের উদ্বোধনী ম্যাচে। তৎকালীন ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন এবং ফুটবল ঈশ্বরখ্যাত দিয়াগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনাকে প্রথম ম্যাচে মোকাবিলা করেছিল ক্যামেরুন। সান সিরো স্টেডিয়ামে ম্যারাডোনার জাদুকে বোতলবন্দী করে ফ্রাঁসোয়া ওমাম-বিয়িকের দুর্দান্ত এক হেড আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দেয়। এই অঘটনের ধারা বজায় রেখে ২০০২ সালেও নবাগত সেনেগাল উদ্বোধনী ম্যাচে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে ১-০ গোলে হারিয়ে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দিয়েছিল।

আধুনিক ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি এবং অবিশ্বাস্য অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ২০১৪ সালে ব্রাজিলের মাটিতে। হেক্সা মিশনের স্বপ্নে বিভোর আয়োজক ব্রাজিল সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল জার্মানির। কিন্তু ইনজুরির কারণে নেইমার এবং কার্ডের খাড়ায় থিয়াগো সিলভাকে ছাড়া মাঠে নামা সেলেসাওদের ঘরের মাঠে মাত্র ২৯ মিনিটের মধ্যে ৫ গোল হজম করতে হয়। শেষ পর্যন্ত ৭-১ গোলের সেই ঐতিহাসিক ও লজ্জাজনক পরাজয় ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে চিরকালের জন্য এক জাতীয় অপবাদ হয়ে রয়ে গেছে।

ঠিক একই বিশ্বকাপে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন স্পেনের ৫-১ গোলে নেদারল্যান্ডসের কাছে বিধ্বস্ত হওয়া কিংবা ২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে জার্মানির ২-০ গোলে হেরে বিদায় নেওয়ার ক্ষতগুলো এখনো টাটকা।

তবে কাতার ২০২২ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের কাছে ফেবারিট আর্জেন্টিনার ২-১ গোলের পরাজয়টি আধুনিক ফুটবলপ্রেমীদের সবচেয়ে বড় ধাক্কা দিয়েছিল। লিওনেল মেসির পেনাল্টি গোলের পর সালেহ আল-শেহরি এবং সালেম আল-দাওসারির সেই অবিশ্বাস্য দুটি গোল আর্জেন্টিনাকে স্তব্ধ করে দিলেও শেষ পর্যন্ত সেই ট্রফিটি মেসিই উঁচিয়ে ধরেছিলেন।

ফুটবল বিশ্বকাপের এই নাটকীয় অঘটনগুলোই প্রমাণ করে, মাঠের লড়াইয়ে নামের চেয়ে আবেগ আর জেদই শেষ কথা বলে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

লক ডাউন পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় ফ্রান্সে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি

যুক্তরাজ্যে করোনার মধ্যেই শিশুদের মাঝে নতুন রোগের হানা

পবিত্র হজ আজ

বিশ্বকাপ ফুটবলের যতো অঘটন!

আপডেট সময় ০৯:০০:২২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬

স্পোর্টস ডেস্ক

বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই কোটি কোটি ভক্তের আবেগ, উন্মাদনা আর মাঠের সবুজ ঘাসে সেরাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াই। কিন্তু ফুটবল বিধাতা মাঝে মাঝেই এমন কিছু চিত্রনাট্য লেখেন যা রূপকথাকেও হার মানায়। যেখানে সমস্ত সমীকরণ ওলটপালট করে দিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায় কোনো আন্ডারডগ (দুর্বল) দল, স্তব্ধ হয়ে যায় পরাশক্তিরা। ফুটবল বিশ্বকাপের শতবর্ষের ইতিহাসে এমন কিছু অবিশ্বাস্য অঘটন ঘটেছে, যা আজও ক্রীড়াপ্রেমীদের মনে বিস্ময় জাগায়।

সবচেয়ে প্রাচীন এবং বড় ধাক্কাটি এসেছিল ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপে। সেবার বিশ্ব ফুটবলের অবিসংবাদিত রাজা হিসেবে ব্রাজিল খেলতে গিয়েছিল ইংল্যান্ডের তারকাখচিত দলটি। কিন্তু তাদের অহংকার চূর্ণ করে দেয় একদল পার্ট-টাইম ফুটবলার নিয়ে গড়া অনভিজ্ঞ যুক্তরাষ্ট্র। ডাকপিয়ন, শিক্ষক আর থালাবাসন মাজার পেশায় যুক্ত সাধারণ আমেরিকান ফুটবলাররা সেদিন ইংল্যান্ডের বিশ্বসেরা আক্রমণভাগকে রুখে দিয়ে ১-০ গোলের এক রূপকথার জয় ছিনিয়ে নিয়েছিল।
যা আজও বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে বিবেচিত হয়। 

ঠিক এর চার বছর পর, ১৯৫৪ সালে ফুটবল বিশ্ব প্রত্যক্ষ করে ‘মিরাকল অব বার্ন’। সে সময়ের হাঙ্গেরি দলটিকে বলা হতো ইতিহাসের অন্যতম সেরা অপরাজেয় শক্তি, যাদের নেতৃত্বে ছিলেন মহান পুসকাস। টুর্নামেন্টের শুরুতেই পশ্চিম জার্মানিকে ৮-৩ গোলে বিধ্বস্ত করা হাঙ্গেরি ফাইনালে যখন মাত্র আট মিনিটে দুই গোলে এগিয়ে যায়, তখন সবাই ভেবেছিল ম্যাচ শেষ।

কিন্তু জার্মানদের ইস্পাতকঠিন মানসিকতার কাছে নতিস্বীকার করে হাঙ্গেরি। দুর্দান্ত এক ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প লিখে পশ্চিম জার্মানি ৩-২ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেয়। 

স্নায় যুদ্ধের আবহে ১৯৬৬ সালে আরেকটি নাটকীয়তার জন্ম দেয় উত্তর কোরিয়া। ভিসা পাওয়া নিয়ে জটিলতা কাটিয়ে ইংল্যান্ডের মাটিতে পা রাখা এই দলটির মুখোমুখি হয়েছিল দুই বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে ইতালির চোট আঘাতের সুযোগ নিয়ে পাক দু ইকের করা একমাত্র ঐতিহাসিক গোলে আজ্জুরিদের টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করে দেয় উত্তর কোরিয়া।

এই ম্যাচটি এতটাই আইকনিক যে, যেখানে গোলটি হয়েছিল, সেই স্টেডিয়ামটি ভেঙে আবাসন গড়ার পরও সেই নির্দিষ্ট স্থানটি আজও লোহার স্টাড দিয়ে চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। 

এরপর ১৯৮২ সালে নবাগত আলজেরিয়া বিশ্বমঞ্চে এমন  বিস্ফোরণ ঘটায় যা কেউ কল্পনাও করেনি। তৎকালীন ইউরো চ্যাম্পিয়ন এবং দুই বারের বিশ্বসেরা পশ্চিম জার্মানি ম্যাচ শুরুর আগে আলজেরিয়াকে পাত্তাই দেয়নি। কিন্তু মাঠের খেলায় চরম অহংকারী জার্মানদের স্তব্ধ করে দিয়ে ২-১ গোলের অবিশ্বাস্য জয় তুলে নেয় আলজেরিয়া। লাখদার বেলৌমির সেই জয়সূচক গোলটি বিশ্ব ফুটবলে আফ্রিকার উত্থানের এক নতুন বার্তা দিয়েছিল।

আফ্রিকান ফুটবলের সেই অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার আরেকটি বড় প্রমাণ মেলে ১৯৯০ সালের উদ্বোধনী ম্যাচে। তৎকালীন ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন এবং ফুটবল ঈশ্বরখ্যাত দিয়াগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনাকে প্রথম ম্যাচে মোকাবিলা করেছিল ক্যামেরুন। সান সিরো স্টেডিয়ামে ম্যারাডোনার জাদুকে বোতলবন্দী করে ফ্রাঁসোয়া ওমাম-বিয়িকের দুর্দান্ত এক হেড আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দেয়। এই অঘটনের ধারা বজায় রেখে ২০০২ সালেও নবাগত সেনেগাল উদ্বোধনী ম্যাচে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে ১-০ গোলে হারিয়ে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দিয়েছিল।

আধুনিক ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি এবং অবিশ্বাস্য অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ২০১৪ সালে ব্রাজিলের মাটিতে। হেক্সা মিশনের স্বপ্নে বিভোর আয়োজক ব্রাজিল সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল জার্মানির। কিন্তু ইনজুরির কারণে নেইমার এবং কার্ডের খাড়ায় থিয়াগো সিলভাকে ছাড়া মাঠে নামা সেলেসাওদের ঘরের মাঠে মাত্র ২৯ মিনিটের মধ্যে ৫ গোল হজম করতে হয়। শেষ পর্যন্ত ৭-১ গোলের সেই ঐতিহাসিক ও লজ্জাজনক পরাজয় ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে চিরকালের জন্য এক জাতীয় অপবাদ হয়ে রয়ে গেছে।

ঠিক একই বিশ্বকাপে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন স্পেনের ৫-১ গোলে নেদারল্যান্ডসের কাছে বিধ্বস্ত হওয়া কিংবা ২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে জার্মানির ২-০ গোলে হেরে বিদায় নেওয়ার ক্ষতগুলো এখনো টাটকা।

তবে কাতার ২০২২ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের কাছে ফেবারিট আর্জেন্টিনার ২-১ গোলের পরাজয়টি আধুনিক ফুটবলপ্রেমীদের সবচেয়ে বড় ধাক্কা দিয়েছিল। লিওনেল মেসির পেনাল্টি গোলের পর সালেহ আল-শেহরি এবং সালেম আল-দাওসারির সেই অবিশ্বাস্য দুটি গোল আর্জেন্টিনাকে স্তব্ধ করে দিলেও শেষ পর্যন্ত সেই ট্রফিটি মেসিই উঁচিয়ে ধরেছিলেন।

ফুটবল বিশ্বকাপের এই নাটকীয় অঘটনগুলোই প্রমাণ করে, মাঠের লড়াইয়ে নামের চেয়ে আবেগ আর জেদই শেষ কথা বলে।