ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা এখানে একজন উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতার মতো, যিনি মার্কিন আধিপত্যকে অসীম মনে করেন। বিশ্লেষকরা ট্রাম্পকে ইতালির স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনির সঙ্গে তুলনা করছেন, যার ব্যর্থ সাম্রাজ্যবাদী অভিলাষের সঙ্গে ট্রাম্পের নীতির মিল পাওয়া যায়। ফিঙ্কেলস্টাইন মনে করেন, হিটলার যেমন সোভিয়েত ইউনিয়নকে ধ্বংস করতে গিয়ে উল্টো রুশ জনগণকে দেশপ্রেমে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন, ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু ইরানের ক্ষেত্রে একই ভুল করছেন।
দর্পণ ডেস্ক
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই অভিশপ্ত দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে পরিচালিত গাজা অভিযান ও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক তৎপরতাকে এখন ঐতিহাসিকরা নাৎসি জার্মানির সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণের সঙ্গে তুলনা করছেন।
দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের কার্যক্রমকে নাৎসিবাদের সঙ্গে তুলনা করাকে আপত্তিকর বা ইহুদি-বিদ্বেষ হিসেবে দেখা হলেও, গাজায় চলমান গণহত্যা এবং ইরানের ওপর সর্বাত্মক আক্রমণের প্রেক্ষাপটে সেই বাধার দেয়াল এখন ভেঙে পড়েছে। প্রখ্যাত ইহুদি পণ্ডিত নরমান ফিঙ্কেলস্টাইনসহ অনেক বিশেষজ্ঞই এখন মনে করছেন, নেতানিয়াহুর বর্তমান নীতি এবং হিটলারের যুদ্ধনীতির মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নাৎসি জার্মানির মতোই ইসরায়েলি নেতৃত্ব একটি বড় কৌশলগত ভুল করেছে এবং তা হলো কোথায় থামতে হবে সেটা না জানা। গত কয়েক বছরে হামাস এবং হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে নেতানিয়াহু একের পর এক সাতটি ফ্রন্ট উন্মুক্ত করেছেন। গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ, পশ্চিম তীরে বসতি বিস্তার এবং লেবানন ও সিরিয়ায় আক্রমণের পর ২০২৫ সালে তিনি সরাসরি ইরানের দিকে হাত বাড়িয়েছেন। এই উগ্র মসিহবাদী ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ববাদী আদর্শই দেশটিকে এক অন্তহীন যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৩৯ সালে জার্মানির সাথে অনাক্রমণ চুক্তি করে যুদ্ধ এড়াতে চেয়েছিল, ঠিক একইভাবে ইরানও ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির মাধ্যমে সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ট্রাম্প সেই চুক্তি বাতিল করে উত্তেজনা বাড়িয়ে দেন। নাৎসিরা যেমন মনে করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল এবং সামান্য ধাক্কা দিলেই তা ভেঙে পড়বে, ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুও ইরানের কয়েক দফা গণবিক্ষোভ ও নিষেধাজ্ঞা-জর্জরিত অবস্থাকে একইভাবে মূল্যায়ন করেছিলেন।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে কোনো আধুনিক গণহত্যাই চার বছরের বেশি স্থায়ী হয়নি। রুয়ান্ডা, কম্বোডিয়া কিংবা আর্মেনীয় গণহত্যার নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল। গাজার ফিলিস্তিনিরা ইতিমধ্যে ৯২৬ দিনেরও বেশি সময় ধরে চরম অবরোধ ও নিধনযজ্ঞ সহ্য করছেন। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গাজায় নিহতের সংখ্যা ৮৪ হাজার ছাড়িয়েছিল যা এখন এক লক্ষের উপরে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। লেবানন ও ইরানেও হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। তবে ইতিহাসের শিক্ষা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গণহত্যার পর অপরাধী পক্ষের সামরিক পরাজয় বা রাজনৈতিক পতন ত্বরান্বিত হয়।
ইসরায়েল দীর্ঘকাল ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সমর্থনের ওপর নির্ভর করে এলেও এখন ওয়াশিংটনের পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। সম্প্রতি মার্কিন সিনেটে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিপক্ষে বড় ধরনের জনমত তৈরি হয়েছে। ডেমোক্রেটিক পার্টির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সিনেটর ইসরায়েলি সাহায্য বন্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছেন, যা কয়েক বছর আগেও অকল্পনীয় ছিল। মার্কিন ভোটাররা এখন ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ এবং ইসরায়েলের পেছনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করার বিষয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে ট্রাম্পের বিপুল পরিমাণ সামরিক বাজেট এবং যুদ্ধের দামামা সাধারণ মার্কিনিদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করছে।



















