ঢাকা ০৮:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

“সময়ের প্রহেলিকা ও ন্যায়বোধের বিচ্যুতি”

  • আপডেট সময় ০৯:১৯:১৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

Screenshot

মেশকাতুন নাহার: সমকাল যেন এক অদৃশ্য স্থপতির নির্মিত জটিল স্থাপত্য—যেখানে মানুষ আর স্বাধীন সত্তা নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়ার এক বহুমাত্রিক বিন্যাস। বাহ্যত আমরা চলি, কথা বলি, সিদ্ধান্ত নিই; কিন্তু অন্তরালে এক নিঃশব্দ নিয়ন্ত্রণচক্র আমাদের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। অর্থ সেখানে প্রাধান্যের ভাষা, ক্ষমতা তার ব্যাকরণ, আর নৈতিকতা—একটি অপ্রয়োজনীয় অলংকার, যা প্রয়োজনমতো সরিয়ে রাখা যায়। মানবিকতা যেন এখন একটি অপশনাল গুণ—যা প্রদর্শনের জন্য ব্যবহৃত হয়, কিন্তু প্রয়োগের ক্ষেত্রে অবহেলিত থাকে।
এই সময়ের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো—উন্নতির প্রচ্ছদ যতই উজ্জ্বল হোক, অন্তর্গত অবক্ষয়ের রেখাচিত্র ততই গাঢ়। আমরা প্রযুক্তিতে অগ্রসর, কিন্তু মূল্যবোধে অনিশ্চিত; আমরা তথ্যসমৃদ্ধ, কিন্তু প্রজ্ঞায় দারিদ্র্যপীড়িত। সত্য আর মিথ্যার সীমারেখা এতটাই অস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, তা আর নির্ণয়ের বিষয় নয়—বরং সুবিধামতো নির্ধারণের একটি কৌশল। ফলে ন্যায়বোধ আর একটি স্থির নীতি নয়, বরং পরিস্থিতিনির্ভর এক নমনীয় ধারণা।
ক্ষমতার প্রকৃতি চিরকালই দ্বৈত—এটি যেমন সৃষ্টির সম্ভাবনা বহন করে, তেমনি ধ্বংসের বীজও ধারণ করে। কিন্তু সমকালীন প্রেক্ষাপটে এই দ্বৈততা যেন আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। ক্ষমতা লাভের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভেতরে এক অদ্ভুত আত্মবিস্তার ঘটে—নিজস্ব সীমা তখন অপ্রতুল মনে হয়, আর অপরের পরিসর অযৌক্তিকভাবে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। ফলে শুরু হয় অনধিকার অনুপ্রবেশ, নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা, এবং পরোক্ষ আধিপত্যের এক নীরব প্রতিযোগিতা।
এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে সহজ শিকার হলো দুর্বল ও নির্ভরশীল মানুষ। বিশেষত শিশুরা—যাদের কণ্ঠস্বর এখনো সুস্পষ্ট নয়, যাদের প্রতিবাদ সংগঠিত নয়, যাদের স্বপ্ন এখনো নির্মাণাধীন। তাদের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করা সহজ, তাদের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করা আরও সহজতর। বর্তমানের ক্ষণস্থায়ী লাভের জন্য ভবিষ্যতের এই অবচেতন বিসর্জন সভ্যতার এক গভীর আত্মবিরোধিতা—যেখানে আমরা নিজেদেরই সম্ভাবনাকে ধ্বংস করছি অজ্ঞাতসারে।
সমাজের বহিরঙ্গে যে সৌজন্য ও শালীনতার আবরণ আমরা দেখি, তার অন্তরালে লুকিয়ে থাকে এক জটিল কৌশলগত বাস্তবতা। হাসিমুখে করমর্দন, মধুর বাক্য, পরিশীলিত আচরণ—সবই যেন এক ধরনের নান্দনিক ছদ্মবেশ। এর আড়ালে থাকে হিসাব, প্রতিযোগিতা, এবং সুযোগসন্ধানী মানসিকতা। এই দ্বৈততা এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং একটি স্বীকৃত সামাজিক রীতি—যেখানে সততা প্রায়শই অদক্ষতার প্রতিশব্দে পরিণত হয়।
সম্পদের বণ্টনেও আমরা দেখি এক অদ্ভুত বৈষম্য। ধনসম্পদের বিস্তার যত দ্রুত ঘটছে, ততই গভীর হচ্ছে বঞ্চনার খাদ। যাদের কিছুই নেই, তাদের জন্য নিয়ম কঠোর, শর্ত জটিল, এবং প্রমাণের ভার অসহনীয়। আর যাদের সবই আছে, তাদের জন্য নিয়ম কেবল একটি নমনীয় কাঠামো—যা প্রয়োজনমতো পরিবর্তিত হয়। এই বৈষম্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি একটি মানসিক কাঠামো—যেখানে ক্ষমতা নিজের স্বার্থকে বৈধতা দেয়, আর দুর্বলতা নিজের অধিকারকে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়।
পরিবারের ভেতরেও এই বৈষম্যের প্রতিফলন স্পষ্ট। নিজের সন্তান যেন সম্ভাবনার প্রতিমূর্তি—তার জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা হয়, নিয়ম শিথিল করা হয়, পথ সহজ করে দেওয়া হয়। অন্যের সন্তান যেন পরীক্ষার উপকরণ—যার ওপর প্রয়োগ চলে, যার ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়া হয়, কিন্তু যার সাফল্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এই অসমতা ভবিষ্যতের সমাজকে এক অসম ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়—যেখানে প্রতিযোগিতা শুরু হয় ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান থেকে।
ন্যায়বোধের এই পরিবর্তিত রূপ আমাদের সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এটি আর একটি চিরন্তন নীতি নয়, বরং একটি কৌশলগত উপাদান—যা পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োগ করা হয়। ফলে প্রাপ্যতা ও প্রাপ্তির মধ্যে ব্যবধান ক্রমশ বৃদ্ধি পায়, এবং সেই ব্যবধানকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়ার প্রবণতাও বৃদ্ধি পায়। এই স্বাভাবিকীকরণই সবচেয়ে বিপজ্জনক—কারণ এটি অন্যায়কে প্রশ্নাতীত করে তোলে।
তবুও ইতিহাসের নিজস্ব একটি গতি আছে—যা ধীর, কিন্তু অবিচল। এটি তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখায় না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বিচার করে। আজ যারা নিজেদের অপরিবর্তনীয় মনে করে, কাল তাদের অবস্থানই হয়ে ওঠে উদাহরণ—কখনো সতর্কবার্তা, কখনো শিক্ষণীয় উপাখ্যান। ক্ষমতা কখনো স্থায়ী নয়; এটি একটি অস্থায়ী বিন্যাস, যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়।
মানুষের ভেতরে একটি মৌলিক সত্তা আছে—যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে, যা স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় চিরজাগ্রত। এই সত্তাকে দীর্ঘদিন দমন করে রাখা যায় না। যখন নিয়ন্ত্রণের চাপ অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন সেই সত্তা প্রতিরোধে রূপ নেয়। এই প্রতিরোধ কখনো প্রকাশ্য, কখনো নীরব; কিন্তু তার প্রভাব গভীর এবং সুদূরপ্রসারী।
সমাজের বর্তমান বিন্যাসে আমরা যে কৃত্রিমতা দেখি, তা স্থায়ী নয়। এটি একটি অন্তর্বর্তী অবস্থা—যেখানে ভারসাম্যহীনতা ক্রমশ নিজের সীমা অতিক্রম করছে। এই অতিক্রমণই একসময় ভাঙনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যে কাঠামো ন্যায় ও সমতার ভিত্তিতে নির্মিত নয়, তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না—কারণ তার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে পতনের বীজ।
অতএব, আমাদের প্রয়োজন আত্মসমালোচনা—ব্যক্তিগত এবং সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে। আমাদের বুঝতে হবে, উন্নতি শুধু বাহ্যিক পরিমাপে নির্ধারিত হয় না; এটি নির্ভর করে আমাদের মূল্যবোধ, আমাদের আচরণ, এবং আমাদের সিদ্ধান্তের ওপর। আমরা যদি মানবিকতাকে উপেক্ষা করি, তবে আমাদের সমস্ত অগ্রগতি অর্থহীন হয়ে পড়ে।
শেষ পর্যন্ত, সমাজ একটি প্রতিফলন—যেখানে আমরা নিজেদেরই প্রতিচ্ছবি দেখি। আমরা যেমন, আমাদের সমাজও তেমনই। তাই পরিবর্তনের সূচনা হতে হবে ব্যক্তি থেকে—চিন্তা থেকে, দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, এবং আচরণ থেকে। ক্ষমতার ছদ্মবিন্যাস ভেঙে দিয়ে মানবিকতার অন্তঃস্রোতকে প্রবাহিত করতে পারলেই আমরা একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায্য সমাজের দিকে এগোতে পারব।
কারণ সত্যিকারের অগ্রগতি সেইখানেই, যেখানে মানুষ শুধু নিয়ন্ত্রিত সত্তা নয়—বরং সচেতন, স্বাধীন, এবং নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ এক পূর্ণাঙ্গ অস্তিত্ব।
লেখক : প্রভাষক সমাজকর্ম , কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ,
চাঁদপুর
ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

লক ডাউন পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় ফ্রান্সে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি

যুক্তরাজ্যে করোনার মধ্যেই শিশুদের মাঝে নতুন রোগের হানা

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় জেট ফুয়েল সংকট

“সময়ের প্রহেলিকা ও ন্যায়বোধের বিচ্যুতি”

আপডেট সময় ০৯:১৯:১৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
মেশকাতুন নাহার: সমকাল যেন এক অদৃশ্য স্থপতির নির্মিত জটিল স্থাপত্য—যেখানে মানুষ আর স্বাধীন সত্তা নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়ার এক বহুমাত্রিক বিন্যাস। বাহ্যত আমরা চলি, কথা বলি, সিদ্ধান্ত নিই; কিন্তু অন্তরালে এক নিঃশব্দ নিয়ন্ত্রণচক্র আমাদের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। অর্থ সেখানে প্রাধান্যের ভাষা, ক্ষমতা তার ব্যাকরণ, আর নৈতিকতা—একটি অপ্রয়োজনীয় অলংকার, যা প্রয়োজনমতো সরিয়ে রাখা যায়। মানবিকতা যেন এখন একটি অপশনাল গুণ—যা প্রদর্শনের জন্য ব্যবহৃত হয়, কিন্তু প্রয়োগের ক্ষেত্রে অবহেলিত থাকে।
এই সময়ের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো—উন্নতির প্রচ্ছদ যতই উজ্জ্বল হোক, অন্তর্গত অবক্ষয়ের রেখাচিত্র ততই গাঢ়। আমরা প্রযুক্তিতে অগ্রসর, কিন্তু মূল্যবোধে অনিশ্চিত; আমরা তথ্যসমৃদ্ধ, কিন্তু প্রজ্ঞায় দারিদ্র্যপীড়িত। সত্য আর মিথ্যার সীমারেখা এতটাই অস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, তা আর নির্ণয়ের বিষয় নয়—বরং সুবিধামতো নির্ধারণের একটি কৌশল। ফলে ন্যায়বোধ আর একটি স্থির নীতি নয়, বরং পরিস্থিতিনির্ভর এক নমনীয় ধারণা।
ক্ষমতার প্রকৃতি চিরকালই দ্বৈত—এটি যেমন সৃষ্টির সম্ভাবনা বহন করে, তেমনি ধ্বংসের বীজও ধারণ করে। কিন্তু সমকালীন প্রেক্ষাপটে এই দ্বৈততা যেন আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। ক্ষমতা লাভের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভেতরে এক অদ্ভুত আত্মবিস্তার ঘটে—নিজস্ব সীমা তখন অপ্রতুল মনে হয়, আর অপরের পরিসর অযৌক্তিকভাবে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। ফলে শুরু হয় অনধিকার অনুপ্রবেশ, নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা, এবং পরোক্ষ আধিপত্যের এক নীরব প্রতিযোগিতা।
এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে সহজ শিকার হলো দুর্বল ও নির্ভরশীল মানুষ। বিশেষত শিশুরা—যাদের কণ্ঠস্বর এখনো সুস্পষ্ট নয়, যাদের প্রতিবাদ সংগঠিত নয়, যাদের স্বপ্ন এখনো নির্মাণাধীন। তাদের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করা সহজ, তাদের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করা আরও সহজতর। বর্তমানের ক্ষণস্থায়ী লাভের জন্য ভবিষ্যতের এই অবচেতন বিসর্জন সভ্যতার এক গভীর আত্মবিরোধিতা—যেখানে আমরা নিজেদেরই সম্ভাবনাকে ধ্বংস করছি অজ্ঞাতসারে।
সমাজের বহিরঙ্গে যে সৌজন্য ও শালীনতার আবরণ আমরা দেখি, তার অন্তরালে লুকিয়ে থাকে এক জটিল কৌশলগত বাস্তবতা। হাসিমুখে করমর্দন, মধুর বাক্য, পরিশীলিত আচরণ—সবই যেন এক ধরনের নান্দনিক ছদ্মবেশ। এর আড়ালে থাকে হিসাব, প্রতিযোগিতা, এবং সুযোগসন্ধানী মানসিকতা। এই দ্বৈততা এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং একটি স্বীকৃত সামাজিক রীতি—যেখানে সততা প্রায়শই অদক্ষতার প্রতিশব্দে পরিণত হয়।
সম্পদের বণ্টনেও আমরা দেখি এক অদ্ভুত বৈষম্য। ধনসম্পদের বিস্তার যত দ্রুত ঘটছে, ততই গভীর হচ্ছে বঞ্চনার খাদ। যাদের কিছুই নেই, তাদের জন্য নিয়ম কঠোর, শর্ত জটিল, এবং প্রমাণের ভার অসহনীয়। আর যাদের সবই আছে, তাদের জন্য নিয়ম কেবল একটি নমনীয় কাঠামো—যা প্রয়োজনমতো পরিবর্তিত হয়। এই বৈষম্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি একটি মানসিক কাঠামো—যেখানে ক্ষমতা নিজের স্বার্থকে বৈধতা দেয়, আর দুর্বলতা নিজের অধিকারকে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়।
পরিবারের ভেতরেও এই বৈষম্যের প্রতিফলন স্পষ্ট। নিজের সন্তান যেন সম্ভাবনার প্রতিমূর্তি—তার জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা হয়, নিয়ম শিথিল করা হয়, পথ সহজ করে দেওয়া হয়। অন্যের সন্তান যেন পরীক্ষার উপকরণ—যার ওপর প্রয়োগ চলে, যার ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়া হয়, কিন্তু যার সাফল্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এই অসমতা ভবিষ্যতের সমাজকে এক অসম ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়—যেখানে প্রতিযোগিতা শুরু হয় ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান থেকে।
ন্যায়বোধের এই পরিবর্তিত রূপ আমাদের সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এটি আর একটি চিরন্তন নীতি নয়, বরং একটি কৌশলগত উপাদান—যা পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োগ করা হয়। ফলে প্রাপ্যতা ও প্রাপ্তির মধ্যে ব্যবধান ক্রমশ বৃদ্ধি পায়, এবং সেই ব্যবধানকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়ার প্রবণতাও বৃদ্ধি পায়। এই স্বাভাবিকীকরণই সবচেয়ে বিপজ্জনক—কারণ এটি অন্যায়কে প্রশ্নাতীত করে তোলে।
তবুও ইতিহাসের নিজস্ব একটি গতি আছে—যা ধীর, কিন্তু অবিচল। এটি তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখায় না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বিচার করে। আজ যারা নিজেদের অপরিবর্তনীয় মনে করে, কাল তাদের অবস্থানই হয়ে ওঠে উদাহরণ—কখনো সতর্কবার্তা, কখনো শিক্ষণীয় উপাখ্যান। ক্ষমতা কখনো স্থায়ী নয়; এটি একটি অস্থায়ী বিন্যাস, যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়।
মানুষের ভেতরে একটি মৌলিক সত্তা আছে—যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে, যা স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় চিরজাগ্রত। এই সত্তাকে দীর্ঘদিন দমন করে রাখা যায় না। যখন নিয়ন্ত্রণের চাপ অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন সেই সত্তা প্রতিরোধে রূপ নেয়। এই প্রতিরোধ কখনো প্রকাশ্য, কখনো নীরব; কিন্তু তার প্রভাব গভীর এবং সুদূরপ্রসারী।
সমাজের বর্তমান বিন্যাসে আমরা যে কৃত্রিমতা দেখি, তা স্থায়ী নয়। এটি একটি অন্তর্বর্তী অবস্থা—যেখানে ভারসাম্যহীনতা ক্রমশ নিজের সীমা অতিক্রম করছে। এই অতিক্রমণই একসময় ভাঙনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যে কাঠামো ন্যায় ও সমতার ভিত্তিতে নির্মিত নয়, তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না—কারণ তার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে পতনের বীজ।
অতএব, আমাদের প্রয়োজন আত্মসমালোচনা—ব্যক্তিগত এবং সামষ্টিক উভয় পর্যায়ে। আমাদের বুঝতে হবে, উন্নতি শুধু বাহ্যিক পরিমাপে নির্ধারিত হয় না; এটি নির্ভর করে আমাদের মূল্যবোধ, আমাদের আচরণ, এবং আমাদের সিদ্ধান্তের ওপর। আমরা যদি মানবিকতাকে উপেক্ষা করি, তবে আমাদের সমস্ত অগ্রগতি অর্থহীন হয়ে পড়ে।
শেষ পর্যন্ত, সমাজ একটি প্রতিফলন—যেখানে আমরা নিজেদেরই প্রতিচ্ছবি দেখি। আমরা যেমন, আমাদের সমাজও তেমনই। তাই পরিবর্তনের সূচনা হতে হবে ব্যক্তি থেকে—চিন্তা থেকে, দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, এবং আচরণ থেকে। ক্ষমতার ছদ্মবিন্যাস ভেঙে দিয়ে মানবিকতার অন্তঃস্রোতকে প্রবাহিত করতে পারলেই আমরা একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায্য সমাজের দিকে এগোতে পারব।
কারণ সত্যিকারের অগ্রগতি সেইখানেই, যেখানে মানুষ শুধু নিয়ন্ত্রিত সত্তা নয়—বরং সচেতন, স্বাধীন, এবং নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ এক পূর্ণাঙ্গ অস্তিত্ব।
লেখক : প্রভাষক সমাজকর্ম , কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ,
চাঁদপুর