ঢাকা ১০:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় জেট ফুয়েল সংকট

  • আপডেট সময় ০২:৩০:৪০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
  • ১২ বার পড়া হয়েছে

দর্পণ ডেস্ক

জেট ফুয়েলের তীব্র সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বৈশ্বিক এভিয়েশন খাত। বিশেষ করে ইউরোপের দেশগুলোতে এই সংকট ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে যা আসন্ন গ্রীষ্মকালীন ছুটির মৌসুমে সাধারণ মানুষের ভ্রমণ পরিকল্পনাকে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয় করতে নামি-দামি এয়ারলাইন্সগুলো ইতোমধ্যে হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে পর্যটকরা শেষ মুহূর্তে ফ্লাইট বাতিলের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন এবং অনেক এয়ারলাইন্স তাদের টিকেটের দাম ও আনুষঙ্গিক খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

এই সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এবং হরমুজ প্রণালীতে চলা অস্থিরতা। ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার যুদ্ধাবস্থার কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মতে বিশ্বের মোট তেলের চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে এই সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বিশ্ব অর্থনীতি এক নজিরবিহীন জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে যা বিমান চলাচলের ওপর সরাসরি আঘাত হেনেছে।

ইউরোপের দেশগুলো নিজস্ব শোধনাগারে জেট ফুয়েল উৎপাদন করলেও তা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত সামান্য। ইউরোপের বিমান খাতের জন্য প্রয়োজনীয় জেট ফুয়েলের প্রায় ৭৫ শতাংশই আমদানি করা হয় মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে। হরমুজ প্রণালীতে নৌ-অবরোধ এবং উত্তেজনার কারণে এই সরবরাহ চেইন সম্পূর্ণ তছনছ হয়ে গেছে। এর ফলে ইউরোপের দেশগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছে না এবং মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে যা মহাদেশটির যোগাযোগ ব্যবস্থাকে স্থবির করে দেওয়ার উপক্রম হয়েছে।

জেট ফুয়েলের দুষ্প্রাপ্যতার আরেকটি বড় কারণ হলো অপরিশোধিত তেল থেকে এর উৎপাদন প্রক্রিয়া। সাধারণত মোট উত্তোলিত তেলের মাত্র দশ শতাংশের মতো জেট ফুয়েলে রূপান্তরিত করা সম্ভব হয় যা চাইলেই হুট করে বাড়ানো সম্ভব নয়। একটি বড় যাত্রীবাহী বিমান প্রতি ঘণ্টায় প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার লিটার জ্বালানি খরচ করে। সেই হিসেবে একটি পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি ট্যাংকারের তেল দিয়ে একটি বিমান মাত্র ১০ ঘণ্টার মতো উড়তে পারে। এই বিপুল চাহিদার বিপরীতে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় এয়ারলাইন্সগুলো কার্যক্রম সীমিত করতে বাধ্য হচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে জার্মানির লুৎহানসা এয়ারলাইন্স আগামী অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার ফ্লাইট বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একইভাবে রায়ানএয়ার, এসএএস এবং এয়ার লিঙ্গাসের মতো বড় বড় সংস্থাগুলো তাদের শিডিউল কাটছাঁট করছে। একদিকে জ্বালানির দাম গত কয়েক মাসে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। অন্যদিকে, সরবরাহের নিশ্চয়তা নেই। এই বাড়তি খরচের বোঝা শেষ পর্যন্ত যাত্রীদের ওপরই চাপানো হচ্ছে। ভাড়া বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাগেজ ফি এবং অন্যান্য সেবার খরচ বাড়িয়ে এয়ারলাইন্সগুলো লোকসান সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।

এই অনিশ্চয়তার কারণে পর্যটন বাজারেও বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ব্রিটিশ পর্যটকরা এখন বিদেশ ভ্রমণের চেয়ে নিজ দেশেই ছুটি কাটানোর দিকে বেশি ঝুঁকছেন। ট্রাভেল অপারেটরদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শেষ মুহূর্তে ফ্লাইট বাতিলের ভয়ে মানুষ এখন অনেক পরে টিকেট বুক করছে। অনেক পর্যটকই এখন আকাশপথের বদলে স্থলপথের ভ্রমণকে নিরাপদ মনে করছেন। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যটন ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্ট বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ব্যবসায়িক ধসের আশঙ্কা করছে।

সংকট উত্তরণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন দেশের সরকার জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবহন কমিশনার জানিয়েছেন যে সদস্য দেশগুলোর জরুরি জ্বালানি মজুত একে অপরের সাথে ভাগ করে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প হিসেবে আমেরিকা থেকে জ্বালানি আমদানির পথ খোঁজা হচ্ছে। তবে এই প্রক্রিয়াটি বেশ সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল হওয়ায় স্বল্প মেয়াদে খুব একটা স্বস্তির খবর পাওয়া যাচ্ছে না।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি আজকেই মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রশমিত হয় এবং জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয়, তবুও বাজার স্থিতিশীল হতে অন্তত আগামী জুলাই পর্যন্ত সময় লেগে যাবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ালেও নৌ-অবরোধ বজায় রাখার ঘোষণা দিয়েছেন যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

লক ডাউন পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় ফ্রান্সে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি

যুক্তরাজ্যে করোনার মধ্যেই শিশুদের মাঝে নতুন রোগের হানা

বার্লিনে রেজা পাহলভীর ওপর লাল তরল নিক্ষেপ

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় জেট ফুয়েল সংকট

আপডেট সময় ০২:৩০:৪০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬

দর্পণ ডেস্ক

জেট ফুয়েলের তীব্র সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বৈশ্বিক এভিয়েশন খাত। বিশেষ করে ইউরোপের দেশগুলোতে এই সংকট ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে যা আসন্ন গ্রীষ্মকালীন ছুটির মৌসুমে সাধারণ মানুষের ভ্রমণ পরিকল্পনাকে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয় করতে নামি-দামি এয়ারলাইন্সগুলো ইতোমধ্যে হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে পর্যটকরা শেষ মুহূর্তে ফ্লাইট বাতিলের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন এবং অনেক এয়ারলাইন্স তাদের টিকেটের দাম ও আনুষঙ্গিক খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

এই সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এবং হরমুজ প্রণালীতে চলা অস্থিরতা। ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার যুদ্ধাবস্থার কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মতে বিশ্বের মোট তেলের চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে এই সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বিশ্ব অর্থনীতি এক নজিরবিহীন জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে যা বিমান চলাচলের ওপর সরাসরি আঘাত হেনেছে।

ইউরোপের দেশগুলো নিজস্ব শোধনাগারে জেট ফুয়েল উৎপাদন করলেও তা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত সামান্য। ইউরোপের বিমান খাতের জন্য প্রয়োজনীয় জেট ফুয়েলের প্রায় ৭৫ শতাংশই আমদানি করা হয় মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে। হরমুজ প্রণালীতে নৌ-অবরোধ এবং উত্তেজনার কারণে এই সরবরাহ চেইন সম্পূর্ণ তছনছ হয়ে গেছে। এর ফলে ইউরোপের দেশগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছে না এবং মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে যা মহাদেশটির যোগাযোগ ব্যবস্থাকে স্থবির করে দেওয়ার উপক্রম হয়েছে।

জেট ফুয়েলের দুষ্প্রাপ্যতার আরেকটি বড় কারণ হলো অপরিশোধিত তেল থেকে এর উৎপাদন প্রক্রিয়া। সাধারণত মোট উত্তোলিত তেলের মাত্র দশ শতাংশের মতো জেট ফুয়েলে রূপান্তরিত করা সম্ভব হয় যা চাইলেই হুট করে বাড়ানো সম্ভব নয়। একটি বড় যাত্রীবাহী বিমান প্রতি ঘণ্টায় প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার লিটার জ্বালানি খরচ করে। সেই হিসেবে একটি পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি ট্যাংকারের তেল দিয়ে একটি বিমান মাত্র ১০ ঘণ্টার মতো উড়তে পারে। এই বিপুল চাহিদার বিপরীতে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় এয়ারলাইন্সগুলো কার্যক্রম সীমিত করতে বাধ্য হচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে জার্মানির লুৎহানসা এয়ারলাইন্স আগামী অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার ফ্লাইট বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একইভাবে রায়ানএয়ার, এসএএস এবং এয়ার লিঙ্গাসের মতো বড় বড় সংস্থাগুলো তাদের শিডিউল কাটছাঁট করছে। একদিকে জ্বালানির দাম গত কয়েক মাসে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। অন্যদিকে, সরবরাহের নিশ্চয়তা নেই। এই বাড়তি খরচের বোঝা শেষ পর্যন্ত যাত্রীদের ওপরই চাপানো হচ্ছে। ভাড়া বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাগেজ ফি এবং অন্যান্য সেবার খরচ বাড়িয়ে এয়ারলাইন্সগুলো লোকসান সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।

এই অনিশ্চয়তার কারণে পর্যটন বাজারেও বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ব্রিটিশ পর্যটকরা এখন বিদেশ ভ্রমণের চেয়ে নিজ দেশেই ছুটি কাটানোর দিকে বেশি ঝুঁকছেন। ট্রাভেল অপারেটরদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শেষ মুহূর্তে ফ্লাইট বাতিলের ভয়ে মানুষ এখন অনেক পরে টিকেট বুক করছে। অনেক পর্যটকই এখন আকাশপথের বদলে স্থলপথের ভ্রমণকে নিরাপদ মনে করছেন। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যটন ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্ট বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ব্যবসায়িক ধসের আশঙ্কা করছে।

সংকট উত্তরণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন দেশের সরকার জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবহন কমিশনার জানিয়েছেন যে সদস্য দেশগুলোর জরুরি জ্বালানি মজুত একে অপরের সাথে ভাগ করে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প হিসেবে আমেরিকা থেকে জ্বালানি আমদানির পথ খোঁজা হচ্ছে। তবে এই প্রক্রিয়াটি বেশ সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল হওয়ায় স্বল্প মেয়াদে খুব একটা স্বস্তির খবর পাওয়া যাচ্ছে না।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি আজকেই মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রশমিত হয় এবং জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয়, তবুও বাজার স্থিতিশীল হতে অন্তত আগামী জুলাই পর্যন্ত সময় লেগে যাবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ালেও নৌ-অবরোধ বজায় রাখার ঘোষণা দিয়েছেন যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।