নজমুল কবিরঃ পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইলের আকাশজুড়ে অকস্মাৎ এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের দেখা মিললো! ভিন্নমাত্রিক উজ্জ্বলতা। এমন আলো কেউ যেন এর আগে দেখেনি। বিচ্ছুরিত সেই আলোয় আমরা যেন রাজনৈতিক অন্ধকার পথে হেঁটে এগুবার ভরসা পাচ্ছি। সাধারন জনতার মনের কথাগুলো যেন তার মুখ দিয়ে উচ্চারিত হতে থাকলো। প্রচন্ড রকম আশাবাদী এক যুবক। হ্যামিলনের বাঁশীওয়ালার মত উজ্জীবনী বাঁশি বাজিয়ে দেশের আপামর জনসাধারন্যে জায়গা করে নিচ্ছে। বাঁশির সুরে যেন সকলেই ‘গোল হয়ে’ আসতে শুরু করলো, ‘ঘন হয়ে’ আসতে শুরু করলো!

তিনি পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙবার স্বপ্ন দেখতেন, স্বপ্ন দেখাতেন! প্রবল শত্রুর সাথেও তিনি ইনসাফের মাহাত্ম্যকে প্রাধান্য দেবার অঙ্গীকার করতেন। সাধাসিধে জীবনযাপন আর দেশমাতৃকার প্রতি তাঁর নিখাঁদ ভালবাসার এমন গভীরতা সমসাময়িককালে আর কাউকে ছুঁয়ে যেতে দেখা যায়নি।
প্রথাগত আদর্শিক রাজনীতির সাথে তার কোনো সখ্যতা ছিলো না। পরিমিতিবোধ বজায় রেখেই সকল দলের সমালোচনা করেছেন, প্রাপ্য জায়গায় সমীহ রেখেই তিনি বিদ্যমান রাজনৈতিক দল এবং নেতৃত্বের আদর্শিক মূল্যায়ন করেছেন। দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের সর্বনাশা বাংলাদেশী রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিদ্যমান প্যাটার্ন ভেঙে তিনি বেরিয়ে আসতে চেয়েছেন।

আধিপত্যবাদবিরোধী মনোভাব প্রকাশে তিনি ছিলেন একেবারেই নির্ভীক, আন্তরিক। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের অনিবার্য ধ্বংসের পরিনতি তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি গড়ে তুলেছেন ‘ইনকিলাব মঞ্চ’। তিনি চেয়েছেন আমাদের আবহমান কাল থেকে চর্চা করে আসা নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতেই হবে। বহুধাবিভক্ত বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিপরীতে তিনি পরমতসহিষ্ণুতা চর্চার মাধ্যমে দেশমাত্রিকার উন্নয়ন নিশ্চিত করা। তাবেদার রাষ্ট্রকাঠামোকে তিনি ভেঙে চুরমার করে আত্মনির্ভরশীল জাতিসত্তা নিশ্চিত করতে।
তিনি এক উৎসর্গীকৃত প্রাণ, দৃঢ়চেতা এবং নির্ভিক। ধর্মীয় দর্শন এবং শ্রষ্টার প্রতি গভীর বিশ্বাস তাঁকে জীবন অকাতরে বিলিয়ে দেয়ার মন্ত্রণা শিখিয়েছে। তিনি মনে করতেন নিখাঁদ বিশ্বাসে ভর করা জীবন ধ্বংস করা যায় না। একজন বীর প্রচ্ছন্নভাবে অসংখ্য বীর তৈরি করে যায়।

ক্ষণজন্মা এই বীরের নাম শহীদ ওসমান হাদি। দলভিত্তিক কোনো রাজনৈতিক বিশ্বাসের গন্ডির বাইরে একটি ভিন্ন স্রোতধারা তৈরির রোল মডেল হয়ে উঠেছিলেন মেধাবী এই যুবক। চব্বিশের গণআন্দোলনের পূর্বে তাঁকে তেমন করে ক’জনাই বা চিনতো! অথচ বছর ঘুরতে না ঘুরতে তিনি অবিশ্বাস্য গতিতে সকলের মন জয় করতে থাকে। ভীষনরকম জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
কিন্তু ওসমান হাদীর রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন অদৃশ্য কোনো শক্তিকে ঈর্ষান্বিত করে। আধিপত্যবাদীদের মাঝে আতংক ছড়িয়ে দেয়। ঘাতকের একটি বুলেট ওসমান হাদীকে চিরজীনের মত স্তব্ধ করে দেয়। হতবিহ্বল হয়ে পড়ে সমগ্র বাংলাদেশ! সারাবিশ্বের সংবাদপত্রের অন্যতম আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে হাদীর হত্যাকান্ড। নিন্দার ঝড় বয়ে যায়। রাজনৈতিক দলের কোনো নেতা না হয়েও দলনির্বিশেষে তার জনপ্রিয়তায় উদীয়মান এই নেতা দলমত নির্বিশেষে সকলের নেতা হয়ে ওঠেন।
ওসমান হাদীকে হত্যা করা হলো। তাঁর স্বপ্ন, আদর্শ, ভিশনকে এগিয়ে নেয়ার দায়িত্ব প্রজন্মের। এক হাদীর রক্ত থেকে অসংখ্য হাদীর জন্ম হতে হবে। এটা বুঝতে হবে যে, ক্ষমতা কেন্দ্রে যে রাজনৈতিক শক্তিরই অধিষ্ঠান হোক, দেশকে বাঁচাতে হলে শহীদ ওসমান হাদীর আন্দোলনই প্রাসঙ্গিক। তাঁর ভেতরেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে।
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে এই ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করবার জন্য, হত্যাকারীদের বিচার এবং মরহুমের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করবার জন্য একটি আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) প্যারিসের অদূরে পন্তা এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় উক্ত আলোচনা সভা ও দোয়া অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন ফ্রান্সের বাংলাদেশ কমিউনিটির সিনিয়র সিটিজেন ও সাংবাদিক আবদুল মান্নান আজাদ।
সভা পরিচালনা করেন শহীদ ওসমান হাদী সমর্থক ফোরামের আহ্বায়ক ও সিনিয়র সাংবাদিক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান।
সভায় বক্তাদের মধ্যে অ্যাক্টিভিস্ট মনোয়ার পাটোয়ারী বলেন, “ওসমান হাদী এ ভূখণ্ডে রাজনৈতিক আধিপত্যবাদবিরোধী সংগ্রামের এক মহান জেনারেল। তাঁর সৈনিক হয়ে আমরা এ লড়াই চালিয়ে নেব।”
সিনিয়র সাংবাদিক ও এফবিজেএ সমন্বয়ক মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন বলেন, “সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ রুখতে শহীদ হাদীর দেখানো পথ আমাদের আজীবন দিশা দেখিয়ে যাবে।”
সভার সভাপতি মান্নান আজাদ বলেন, “সাম্রাজ্যবাদী শকুনদের থাবা থেকে দেশ ও জাতিকে বাঁচাতে হাদীর দেখানো পথে লড়াইয়ের কোনো বিকল্প নেই।”
কমিউনিটি নেতাদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট নজরুল গবেষক খোরশেদ আলম পাটোয়ারী, এফবিজেএ মুখপাত্র মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ, ব্যবসায়ী আজাদী আবুল বাশার (হেলাল), বিএনডিএ আহ্বায়ক মোহাম্মদ আলী চৌধুরী, কাজী নজরুল সেন্টার ফ্রান্সে সভাপতি কবি সোহেল আহমেদ, কবি চৌধুরী রেজাউল হায়দার, বিসিএফ সাধারণ সম্পাদক নজমুল কবির, ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম, কমিউনিটি নেতা ইমরান আহমেদ, রাজনীতিবিদ শাফওয়াত হোসেন (রাব্বি রাজ), রাজনীতিবিদ রেজওয়ান হিমেল, এক্টিভিস্ট আজিমুল হক খান, সাংবাদিক সরদার হাসান ইলিয়াস তানিম, গবেষক ইকরামুল কবির সালমান, অ্যাক্টিভিস্ট মোহাম্মদ আরাফাত, সাংবাদিক বদরুল বিন আফরুজ, সাংবাদিক ইয়াসির আরাফাত (খোকন), সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম ও মামুন মাহিনসহ প্রমুখ।










