ফেরত আসাদের ভাষ্য
দর্পণ ডেস্ক
দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার ১৩ থেকে ১৫টি দেশ বাসে ও হেঁটে পাড়ি দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে জনপ্রতি গড়ে ৫০ থেকে ৬৫ লাখ টাকা খরচ করেছেন বাংলাদেশিরা। উন্নত জীবনের আশায় বিপুল অর্থ ব্যয় করে নানান ঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গেলেও শেষ পর্যন্ত অভিবাসনসংক্রান্ত আইনি জটিলতায় পড়ে তাদের দেশে ফিরতে হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের চলমান অভিবাসনবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) আরও ২৩ বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এদিন বেলা ১১টার দিকে বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তারা।
ফেরত আসা ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে ২০ জন ব্রাজিল থেকে বলিভিয়া, পেরু, ইকুয়েডর, কলম্বিয়া, পানামা, কোস্টারিকা, নিকারাগুয়া, হন্ডুরাস ও গুয়াতেমালা হয়ে মেক্সিকো সীমান্ত অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন।
এ যাত্রাপথে তাদের কারও ১৩টি, কারও ১৫টি দেশ পাড়ি দিতে হয়েছে। তাদের বাসে ও হেঁটে দীর্ঘপথ অতিক্রম করতে হয়েছে। এছাড়া একজন দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ব্রাজিল হয়ে একই রুট ব্যবহার করেন এবং একজন নিউইয়র্ক রুট দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান বলেন, প্রাথমিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফেরত আসা ব্যক্তিদের অধিকাংশই দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার দীর্ঘ, ব্যয়বহুল ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ রুট ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে জনপ্রতি গড়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
তিনি বলেন, উন্নত জীবনের আশায় বিপুল অর্থ ব্যয় করেও শেষ পর্যন্ত তারা অভিবাসন-সংক্রান্ত আইনি জটিলতায় পড়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। তাই অনিয়মিত পথে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
ফেরত আসা ব্যক্তিরা জানান, ব্রাজিল রুট ব্যবহারকারীদের অধিকাংশই জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র নিয়ে ব্রাজিলে যান। অন্যরা ট্যুরিস্ট ভিসায় ব্রাজিলে প্রবেশের পর দালালচক্রের সহায়তায় একই অনিয়মিত রুটে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে তাদের কেউ কেউ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজও করেন। তবে বৈধ অভিবাসনের প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে না পারায় তারা দেশটির অভিবাসন কর্তৃপক্ষের নজরে পড়েন। পরে মার্কিন অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
মার্কিন আইন অনুযায়ী, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থানকারী অভিবাসীদের আদালতের রায় বা প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো যায়। আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে মার্কিন অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা (আইসিই) প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করে। সাম্প্রতিক সময়ে এ প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হওয়ায় চার্টার্ড ও বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবহারও বেড়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর অনিয়মিত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের একাধিক দফায় নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
এদিকে, বৃহস্পতিবার সকালে ২৩ জন প্রবাসী বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক ও এভিয়েশন সিকিউরিটির (এভসেক) সহায়তায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ফেরত আসা ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক সহায়তা, প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য পরিবহন সহায়তা দেয়।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্যানুযায়ী, ফেরত আসা ২৩ জনের মধ্যে ১৩ জন নোয়াখালীর বাসিন্দা। এছাড়া সিলেটের তিনজন এবং কক্সবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মুন্সিগঞ্জ, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, ঢাকা ও অন্যান্য জেলার বাসিন্দারাও রয়েছেন।
ব্র্যাকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে মোট ৩৬৯ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছর ২০ জানুয়ারি ৩৬ জন, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২৯ জন এবং ৩০ জুলাই ২৩ জন বাংলাদেশি ফেরত আসেন।
এর আগে ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ৩১ জন, ২৮ নভেম্বর চার্টার্ড ফ্লাইটে ৩৯ জন এবং ৮ জুন চার্টার্ড ফ্লাইটে ৪২ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। এছাড়া ২০২৫ সালের ৬ মার্চ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত একাধিক ফ্লাইটে অন্তত ৩৪ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল।


















