ঢাকা ০৯:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
যুক্তরাজ্যে কি ভেঙে যাবে? ভবিষ্যৎ নিয়ে কার্ডিফে বৈঠক

স্বাধীনতার গণভোটের অধিকার চাইছেন স্কটল্যান্ড-ওয়েলস-নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের নেতারা

  • আপডেট সময় ১২:৫৩:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১৪ বার পড়া হয়েছে

CREATOR: gd-jpeg v1.0 (using IJG JPEG v62), default quality?

লন্ডন, ১৪ সেপ্টেম্বর: যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতাপন্থী রাজনৈতিক নেতৃত্ব সোমবার ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফে বৈঠকে বসেছে। বৈঠকে তিন অঞ্চলের জনগণের নিজেদের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার এবং প্রয়োজন হলে গণভোট আয়োজনের পথ সুগম করার দাবি তোলা হচ্ছে।

স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার ও স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির (SNP) নেতা জন সুইনি, ওয়েলসের ফার্স্ট মিনিস্টার ও প্লেইড কামরুর নেতা রুন আপ আইওয়ার্থ এবং নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার ও সিন ফেইনের ভাইস প্রেসিডেন্ট মিশেল ও’নিল বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। সিন ফেইনের সভাপতি মেরি লু ম্যাকডোনাল্ডও এতে উপস্থিত রয়েছেন।

তবে বৈঠকটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তিন ফার্স্ট মিনিস্টার এখানে তাঁদের নিজ নিজ দলীয় নেতা হিসেবে অংশ নিচ্ছেন; এটি স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের সরকারগুলোর আনুষ্ঠানিক যৌথ আন্তঃসরকারি বৈঠক নয়।

স্বাধীনতার গণভোটের দাবি

বৈঠকে একটি সমঝোতা স্মারক বা যৌথ রাজনৈতিক ঘোষণায় নিজেদের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা রয়েছে। আলোচনার চারটি প্রধান ক্ষেত্র হচ্ছে অর্থনীতি, জ্বালানি, ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ বা self-determination।

এর আগে জন সুইনি যুক্তি দিয়েছেন, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড—তিনটিতেই এখন স্বাধীনতা বা অধিকতর স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে থাকা রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকা যুক্তরাজ্যের প্রচলিত সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। তাঁর মতে, ওয়েস্টমিনস্টারকে যুক্তরাজ্যের সম্ভাব্য সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে কার্ডিফের উদ্যোগটিকে যুক্তরাজ্য ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যে একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে আয়োজকদের বক্তব্য ও অন্যান্য প্রতিবেদনে বিষয়টি মূলত তিন অঞ্চলের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার এবং সাংবিধানিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে সমন্বিত রাজনৈতিক চাপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

স্কটল্যান্ডে দ্বিতীয় গণভোটের প্রশ্ন

কার্ডিফ বৈঠকের আগে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্কও নতুন করে তীব্র হয়েছে। গত সপ্তাহে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম পার্লামেন্টে বলেন, স্কটল্যান্ডে দ্বিতীয় স্বাধীনতা গণভোটের পক্ষে বর্তমানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমর্থনের প্রমাণ নেই এবং সেটি পরিবর্তিত না হওয়া পর্যন্ত এমন গণভোট হবে না।

বার্নহামের এই বক্তব্যকে সুইনি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, প্রধানমন্ত্রী প্রথমবারের মতো এমন একটি নীতি মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে স্কটল্যান্ডের জনগণের মধ্যে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন তৈরি হলে তাদের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ভোটের প্রশ্ন বিবেচনা করা হতে পারে। এরপর সুইনি বার্নহামকে চিঠি দিয়ে গণভোট আয়োজনের জন্য একটি আইনগত প্রক্রিয়া নির্ধারণে আলোচনার আহ্বান জানান।

তবে ডাউনিং স্ট্রিট পরে স্পষ্ট করেছে, সরকারের নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। বিশেষ করে আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগে দ্বিতীয় স্বাধীনতা গণভোট আয়োজনের বিষয়ে সরকার সমর্থন দিচ্ছে না।

নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে ভিন্ন সাংবিধানিক ব্যবস্থা

নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ প্রশ্নটি স্কটল্যান্ডের তুলনায় আলাদা। গুড ফ্রাইডে চুক্তির অধীনে সেখানে সীমান্ত গণভোট বা border poll আয়োজনের একটি আইনগত ব্যবস্থা রয়েছে। নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ যুক্তরাজ্য ত্যাগ করে আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হতে চাইতে পারে—এমন সম্ভাবনা দেখা দিলে ব্রিটিশ সরকারের নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডবিষয়ক মন্ত্রীর মাধ্যমে গণভোটের প্রশ্নটি তোলা যেতে পারে।

সিন ফেইন দীর্ঘদিন ধরে আয়ারল্যান্ডের পুনরেকত্রীকরণের পক্ষে। দলটির নেতারা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এমন গণভোটের সম্ভাবনা তৈরি হলে তার জন্য রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি এখন থেকেই নেওয়া প্রয়োজন।

ওয়েলসের ক্ষমতা বৃদ্ধির দাবি

কার্ডিফের আলোচনায় ওয়েলসের জন্য অধিকতর ক্ষমতা ও আর্থিক স্বাধীনতার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। প্লেইড কামরু দীর্ঘদিন ধরে ওয়েলস সরকারের কর ও ব্যয়সংক্রান্ত ক্ষমতা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছে। পুলিশ, রেল, জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও ওয়েলসের অধিকতর নিয়ন্ত্রণের দাবি রয়েছে।

বিশেষ করে সেল্টিক সাগরে অফশোর উইন্ড বা সমুদ্রভিত্তিক বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সুবিধার একটি বড় অংশ ওয়েলসে রাখার দাবি রয়েছে। ওয়েলসের ফার্স্ট মিনিস্টার রুন আপ আইওয়ার্থ এর আগে অফশোর উইন্ডকে ওয়েলসের শিল্প, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বড় সম্ভাবনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক

কার্ডিফের উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ইউরোপের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক। বৈঠকে অংশ নেওয়া স্বাধীনতাপন্থী দলগুলো যুক্তরাজ্যের বর্তমান অবস্থানের তুলনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভবিষ্যতে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষে। অর্থনীতি, জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পাশাপাশি ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কও আলোচনার অন্যতম ক্ষেত্র।

ট্রাম্পের মন্তব্যে নতুন মাত্রা

কার্ডিফ বৈঠকের ঠিক আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যও বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক মাত্রা দিয়েছে। আয়ারল্যান্ড সফরের সময় ট্রাম্প বলেছেন, তিনি একটি ঐক্যবদ্ধ আয়ারল্যান্ড দেখতে আগ্রহী এবং তাঁর মতে আয়ারল্যান্ডের একীভূত হওয়া শেষ পর্যন্ত ঘটবে।

ট্রাম্পের মন্তব্য নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ব্রিটিশপন্থী রাজনৈতিক মহলে অস্বস্তি তৈরি করেছে। তবে আইরিশ প্রধানমন্ত্রী মিশেল মার্টিন বিষয়টিকে তাৎক্ষণিক গণভোটের আহ্বান হিসেবে দেখেননি এবং বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন ভোটের ফল কী হবে সে বিষয়ে বাস্তব রাজনৈতিক হিসাবও রয়েছে।

যুক্তরাজ্য কি ভাঙনের দিকে?

কার্ডিফের বৈঠক নিঃসন্দেহে যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক কাঠামোর ওপর নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে। প্রথমবারের মতো স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা বা জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের পক্ষে থাকা তিন রাজনৈতিক নেতৃত্ব একই মঞ্চে এসে সমন্বিত অবস্থান তুলে ধরছে।

তবে এই বৈঠককে সরাসরি যুক্তরাজ্য ভেঙে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যাবে না। তিন অঞ্চলের সাংবিধানিক অবস্থান, আইনগত কাঠামো এবং স্বাধীনতার প্রশ্নে জনসমর্থনের মাত্রা এক নয়। স্কটল্যান্ডে নতুন গণভোটের জন্য ওয়েস্টমিনস্টারের সঙ্গে সাংবিধানিক সমঝোতা প্রয়োজন; ওয়েলসের স্বাধীনতার প্রশ্ন এখনো রাজনৈতিকভাবে তুলনামূলকভাবে প্রাথমিক পর্যায়ে; আর নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ক্ষেত্রে গুড ফ্রাইডে চুক্তির অধীনে আলাদা আইনগত ব্যবস্থা রয়েছে।

ফলে কার্ডিফের বৈঠকের তাৎক্ষণিক গুরুত্ব যুক্তরাজ্য ভেঙে যাওয়ার চেয়ে বরং ওয়েস্টমিনস্টারের কেন্দ্রীভূত সাংবিধানিক কাঠামোর বিরুদ্ধে তিন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তির সমন্বিত চাপ তৈরি হওয়া। এর মাধ্যমে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা, ওয়েলসের অধিকতর স্বায়ত্তশাসন এবং আয়ারল্যান্ডের পুনরেকত্রীকরণের প্রশ্ন একই রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।

আগামী দিনে এই সমন্বয় কতটা স্থায়ী হয়, জনসমর্থন কতটা বাড়ে এবং ওয়েস্টমিনস্টার কীভাবে এর জবাব দেয়—তার ওপরই নির্ভর করবে যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক বিতর্ক নতুন কোনো বড় রাজনৈতিক মোড় নেয় কি না।

 

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

লক ডাউন পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় ফ্রান্সে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি

যুক্তরাজ্যে করোনার মধ্যেই শিশুদের মাঝে নতুন রোগের হানা

যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার নিয়মে আসছে বড় পরিবর্তন

যুক্তরাজ্যে কি ভেঙে যাবে? ভবিষ্যৎ নিয়ে কার্ডিফে বৈঠক

স্বাধীনতার গণভোটের অধিকার চাইছেন স্কটল্যান্ড-ওয়েলস-নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের নেতারা

আপডেট সময় ১২:৫৩:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লন্ডন, ১৪ সেপ্টেম্বর: যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতাপন্থী রাজনৈতিক নেতৃত্ব সোমবার ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফে বৈঠকে বসেছে। বৈঠকে তিন অঞ্চলের জনগণের নিজেদের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার এবং প্রয়োজন হলে গণভোট আয়োজনের পথ সুগম করার দাবি তোলা হচ্ছে।

স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার ও স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির (SNP) নেতা জন সুইনি, ওয়েলসের ফার্স্ট মিনিস্টার ও প্লেইড কামরুর নেতা রুন আপ আইওয়ার্থ এবং নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার ও সিন ফেইনের ভাইস প্রেসিডেন্ট মিশেল ও’নিল বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। সিন ফেইনের সভাপতি মেরি লু ম্যাকডোনাল্ডও এতে উপস্থিত রয়েছেন।

তবে বৈঠকটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তিন ফার্স্ট মিনিস্টার এখানে তাঁদের নিজ নিজ দলীয় নেতা হিসেবে অংশ নিচ্ছেন; এটি স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের সরকারগুলোর আনুষ্ঠানিক যৌথ আন্তঃসরকারি বৈঠক নয়।

স্বাধীনতার গণভোটের দাবি

বৈঠকে একটি সমঝোতা স্মারক বা যৌথ রাজনৈতিক ঘোষণায় নিজেদের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা রয়েছে। আলোচনার চারটি প্রধান ক্ষেত্র হচ্ছে অর্থনীতি, জ্বালানি, ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ বা self-determination।

এর আগে জন সুইনি যুক্তি দিয়েছেন, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড—তিনটিতেই এখন স্বাধীনতা বা অধিকতর স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে থাকা রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকা যুক্তরাজ্যের প্রচলিত সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। তাঁর মতে, ওয়েস্টমিনস্টারকে যুক্তরাজ্যের সম্ভাব্য সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে কার্ডিফের উদ্যোগটিকে যুক্তরাজ্য ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যে একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে আয়োজকদের বক্তব্য ও অন্যান্য প্রতিবেদনে বিষয়টি মূলত তিন অঞ্চলের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার এবং সাংবিধানিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে সমন্বিত রাজনৈতিক চাপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

স্কটল্যান্ডে দ্বিতীয় গণভোটের প্রশ্ন

কার্ডিফ বৈঠকের আগে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্কও নতুন করে তীব্র হয়েছে। গত সপ্তাহে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম পার্লামেন্টে বলেন, স্কটল্যান্ডে দ্বিতীয় স্বাধীনতা গণভোটের পক্ষে বর্তমানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমর্থনের প্রমাণ নেই এবং সেটি পরিবর্তিত না হওয়া পর্যন্ত এমন গণভোট হবে না।

বার্নহামের এই বক্তব্যকে সুইনি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, প্রধানমন্ত্রী প্রথমবারের মতো এমন একটি নীতি মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে স্কটল্যান্ডের জনগণের মধ্যে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন তৈরি হলে তাদের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ভোটের প্রশ্ন বিবেচনা করা হতে পারে। এরপর সুইনি বার্নহামকে চিঠি দিয়ে গণভোট আয়োজনের জন্য একটি আইনগত প্রক্রিয়া নির্ধারণে আলোচনার আহ্বান জানান।

তবে ডাউনিং স্ট্রিট পরে স্পষ্ট করেছে, সরকারের নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। বিশেষ করে আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগে দ্বিতীয় স্বাধীনতা গণভোট আয়োজনের বিষয়ে সরকার সমর্থন দিচ্ছে না।

নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে ভিন্ন সাংবিধানিক ব্যবস্থা

নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ প্রশ্নটি স্কটল্যান্ডের তুলনায় আলাদা। গুড ফ্রাইডে চুক্তির অধীনে সেখানে সীমান্ত গণভোট বা border poll আয়োজনের একটি আইনগত ব্যবস্থা রয়েছে। নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ যুক্তরাজ্য ত্যাগ করে আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হতে চাইতে পারে—এমন সম্ভাবনা দেখা দিলে ব্রিটিশ সরকারের নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডবিষয়ক মন্ত্রীর মাধ্যমে গণভোটের প্রশ্নটি তোলা যেতে পারে।

সিন ফেইন দীর্ঘদিন ধরে আয়ারল্যান্ডের পুনরেকত্রীকরণের পক্ষে। দলটির নেতারা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এমন গণভোটের সম্ভাবনা তৈরি হলে তার জন্য রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি এখন থেকেই নেওয়া প্রয়োজন।

ওয়েলসের ক্ষমতা বৃদ্ধির দাবি

কার্ডিফের আলোচনায় ওয়েলসের জন্য অধিকতর ক্ষমতা ও আর্থিক স্বাধীনতার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। প্লেইড কামরু দীর্ঘদিন ধরে ওয়েলস সরকারের কর ও ব্যয়সংক্রান্ত ক্ষমতা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছে। পুলিশ, রেল, জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও ওয়েলসের অধিকতর নিয়ন্ত্রণের দাবি রয়েছে।

বিশেষ করে সেল্টিক সাগরে অফশোর উইন্ড বা সমুদ্রভিত্তিক বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সুবিধার একটি বড় অংশ ওয়েলসে রাখার দাবি রয়েছে। ওয়েলসের ফার্স্ট মিনিস্টার রুন আপ আইওয়ার্থ এর আগে অফশোর উইন্ডকে ওয়েলসের শিল্প, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বড় সম্ভাবনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক

কার্ডিফের উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ইউরোপের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক। বৈঠকে অংশ নেওয়া স্বাধীনতাপন্থী দলগুলো যুক্তরাজ্যের বর্তমান অবস্থানের তুলনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভবিষ্যতে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষে। অর্থনীতি, জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পাশাপাশি ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কও আলোচনার অন্যতম ক্ষেত্র।

ট্রাম্পের মন্তব্যে নতুন মাত্রা

কার্ডিফ বৈঠকের ঠিক আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যও বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক মাত্রা দিয়েছে। আয়ারল্যান্ড সফরের সময় ট্রাম্প বলেছেন, তিনি একটি ঐক্যবদ্ধ আয়ারল্যান্ড দেখতে আগ্রহী এবং তাঁর মতে আয়ারল্যান্ডের একীভূত হওয়া শেষ পর্যন্ত ঘটবে।

ট্রাম্পের মন্তব্য নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ব্রিটিশপন্থী রাজনৈতিক মহলে অস্বস্তি তৈরি করেছে। তবে আইরিশ প্রধানমন্ত্রী মিশেল মার্টিন বিষয়টিকে তাৎক্ষণিক গণভোটের আহ্বান হিসেবে দেখেননি এবং বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন ভোটের ফল কী হবে সে বিষয়ে বাস্তব রাজনৈতিক হিসাবও রয়েছে।

যুক্তরাজ্য কি ভাঙনের দিকে?

কার্ডিফের বৈঠক নিঃসন্দেহে যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক কাঠামোর ওপর নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে। প্রথমবারের মতো স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা বা জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের পক্ষে থাকা তিন রাজনৈতিক নেতৃত্ব একই মঞ্চে এসে সমন্বিত অবস্থান তুলে ধরছে।

তবে এই বৈঠককে সরাসরি যুক্তরাজ্য ভেঙে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যাবে না। তিন অঞ্চলের সাংবিধানিক অবস্থান, আইনগত কাঠামো এবং স্বাধীনতার প্রশ্নে জনসমর্থনের মাত্রা এক নয়। স্কটল্যান্ডে নতুন গণভোটের জন্য ওয়েস্টমিনস্টারের সঙ্গে সাংবিধানিক সমঝোতা প্রয়োজন; ওয়েলসের স্বাধীনতার প্রশ্ন এখনো রাজনৈতিকভাবে তুলনামূলকভাবে প্রাথমিক পর্যায়ে; আর নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ক্ষেত্রে গুড ফ্রাইডে চুক্তির অধীনে আলাদা আইনগত ব্যবস্থা রয়েছে।

ফলে কার্ডিফের বৈঠকের তাৎক্ষণিক গুরুত্ব যুক্তরাজ্য ভেঙে যাওয়ার চেয়ে বরং ওয়েস্টমিনস্টারের কেন্দ্রীভূত সাংবিধানিক কাঠামোর বিরুদ্ধে তিন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তির সমন্বিত চাপ তৈরি হওয়া। এর মাধ্যমে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা, ওয়েলসের অধিকতর স্বায়ত্তশাসন এবং আয়ারল্যান্ডের পুনরেকত্রীকরণের প্রশ্ন একই রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।

আগামী দিনে এই সমন্বয় কতটা স্থায়ী হয়, জনসমর্থন কতটা বাড়ে এবং ওয়েস্টমিনস্টার কীভাবে এর জবাব দেয়—তার ওপরই নির্ভর করবে যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক বিতর্ক নতুন কোনো বড় রাজনৈতিক মোড় নেয় কি না।