ঢাকা ০৮:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্রিটিশ মুসলিমদের অগ্রগতির নেতৃত্বে বাংলাদেশিরা

  • আপডেট সময় ০২:২৭:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৭ বার পড়া হয়েছে

দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন

দর্পণ ডেস্ক

সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ব্রিটিশ মুসলমানরা কতটা ব্রিটিশ সমাজে একীভ‚ত হতে পেরেছেন? এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হতে পারে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বসবাসকারী প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার বাংলাদেশি। এই জনগোষ্ঠীর ৯০ শতাংশেরও বেশি মুসলমান।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ জানিয়েছেÑ১৯৮৭ সালে তৎকালীন প্রিন্স চার্লস (বর্তমান রাজা তৃতীয় চার্লস) পূর্ব লন্ডনের স্পিটালফিল্ডস এলাকা পরিদর্শন করেছিলেন। ১৯৪৫ সালের পর থেকে সেখানে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বসতি গড়ে তুলেছিলেন। তাঁদের জীবনযাত্রা দেখে চার্লস হতাশা প্রকাশ করে বলেছিলেনÑবাংলাদেশিদের বসবাস ও কর্মপরিবেশ ভারতীয় উপমহাদেশের তৎকালীন পরিস্থিতির মতোই খারাপ। পরে ব্রিটেনের ‘জাতিগত সমতা বিষয়ক কমিশন’-ও জানায়, বাংলাদেশিদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি দুর্বল এবং কর্মসংস্থানের হার অত্যন্ত কম।
১৯৮৫ সালে সরকারি এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশি শিশুদের শিক্ষাগত অর্জনকে ‘খুবই নিম্নমানের’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। তাঁদের অনেকেই গ্রামীণ বাংলাদেশ থেকে ব্রিটেনে গিয়ে খুব সামান্য শিক্ষার সুযোগ পেয়েছিল এবং ইংরেজিতেও দক্ষ ছিল না। অনেক শিক্ষকও তাদের কাছ থেকে বেশি কিছু প্রত্যাশা করতেন না। বর্ণবাদী হামলার আশঙ্কায় অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে পাঠাতেও ভয় পেতেন।
সেই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ এখনো দরিদ্র। আবাসন ব্যয় বাদ দেওয়ার পরও তাঁদের প্রতি দুজনের একজনের আয় জাতীয়ভাবে সর্বনিম্ন ২০ শতাংশের মধ্যে। একটি মধ্যম সারির বাংলাদেশি পরিবারের সম্পদের পরিমাণ ১ লাখ পাউন্ডেরও কম; যেখানে সব জাতিগোষ্ঠী মিলিয়ে গড় সম্পদ প্রায় ৩ লাখ পাউন্ড।
তবে শিক্ষাক্ষেত্রে চিত্রটি দ্রæত বদলেছে। ২০১০-এর দশকের শুরুর দিকেই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা জিসিএসই পরীক্ষায় শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের সমপর্যায়ে পৌঁছে যায়। এখন তারা আরও অনেক এগিয়ে গেছে। ২০২১ সালে জিসিএসই দেওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ৬৭ শতাংশ ১৯ বছর বয়সের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল; শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের ক্ষেত্রে এই হার ৩৮ শতাংশ। প্রকৌশল ও প্রযুক্তিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা গত এক দশকে দ্বিগুণ হয়েছে, আর চিকিৎসা ও দন্ত চিকিৎসায় বেড়েছে তিন গুণ।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও পরিবর্তন হচ্ছে। ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী বাংলাদেশি নারীদের ৬৮ শতাংশ কর্মরত ছিলেন; শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ নারীদের ক্ষেত্রে হার ৭৯ শতাংশ। পেশাজীবী বা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের চাকরিতেও ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশিরা পিছিয়ে নেই। একই বয়সী বাংলাদেশিদের ১৪ শতাংশ এমন চাকরিতে ছিলেনÑযা শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের প্রায় সমান।
বাংলাদেশিদের অগ্রগতির পেছনে লন্ডনের মতো অর্থনৈতিকভাবে গতিশীল শহরে বসবাসও ভ‚মিকা রাখছে। গবেষকদের মতে, শিক্ষিত বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি নারীদের সামাজিক ও বৈবাহিক অবস্থানও ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে।
বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেকই ব্রিটেনের বাইরে জন্মগ্রহণ করেছেন। নতুন অভিবাসীদের আগমন অব্যাহত থাকায় সামগ্রিক অগ্রগতি অনেক সময় চোখে পড়ে না। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, ব্রিটিশ সমাজে বাংলাদেশিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক একীভ‚তকরণ ধীরে হলেও স্পষ্টভাবেই এগিয়ে চলছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

লক ডাউন পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় ফ্রান্সে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি

যুক্তরাজ্যে করোনার মধ্যেই শিশুদের মাঝে নতুন রোগের হানা

ব্রিটিশ মুসলিমদের অগ্রগতির নেতৃত্বে বাংলাদেশিরা

ব্রিটিশ মুসলিমদের অগ্রগতির নেতৃত্বে বাংলাদেশিরা

আপডেট সময় ০২:২৭:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন

দর্পণ ডেস্ক

সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ব্রিটিশ মুসলমানরা কতটা ব্রিটিশ সমাজে একীভ‚ত হতে পেরেছেন? এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হতে পারে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বসবাসকারী প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার বাংলাদেশি। এই জনগোষ্ঠীর ৯০ শতাংশেরও বেশি মুসলমান।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ জানিয়েছেÑ১৯৮৭ সালে তৎকালীন প্রিন্স চার্লস (বর্তমান রাজা তৃতীয় চার্লস) পূর্ব লন্ডনের স্পিটালফিল্ডস এলাকা পরিদর্শন করেছিলেন। ১৯৪৫ সালের পর থেকে সেখানে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বসতি গড়ে তুলেছিলেন। তাঁদের জীবনযাত্রা দেখে চার্লস হতাশা প্রকাশ করে বলেছিলেনÑবাংলাদেশিদের বসবাস ও কর্মপরিবেশ ভারতীয় উপমহাদেশের তৎকালীন পরিস্থিতির মতোই খারাপ। পরে ব্রিটেনের ‘জাতিগত সমতা বিষয়ক কমিশন’-ও জানায়, বাংলাদেশিদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি দুর্বল এবং কর্মসংস্থানের হার অত্যন্ত কম।
১৯৮৫ সালে সরকারি এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশি শিশুদের শিক্ষাগত অর্জনকে ‘খুবই নিম্নমানের’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। তাঁদের অনেকেই গ্রামীণ বাংলাদেশ থেকে ব্রিটেনে গিয়ে খুব সামান্য শিক্ষার সুযোগ পেয়েছিল এবং ইংরেজিতেও দক্ষ ছিল না। অনেক শিক্ষকও তাদের কাছ থেকে বেশি কিছু প্রত্যাশা করতেন না। বর্ণবাদী হামলার আশঙ্কায় অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে পাঠাতেও ভয় পেতেন।
সেই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ এখনো দরিদ্র। আবাসন ব্যয় বাদ দেওয়ার পরও তাঁদের প্রতি দুজনের একজনের আয় জাতীয়ভাবে সর্বনিম্ন ২০ শতাংশের মধ্যে। একটি মধ্যম সারির বাংলাদেশি পরিবারের সম্পদের পরিমাণ ১ লাখ পাউন্ডেরও কম; যেখানে সব জাতিগোষ্ঠী মিলিয়ে গড় সম্পদ প্রায় ৩ লাখ পাউন্ড।
তবে শিক্ষাক্ষেত্রে চিত্রটি দ্রæত বদলেছে। ২০১০-এর দশকের শুরুর দিকেই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা জিসিএসই পরীক্ষায় শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের সমপর্যায়ে পৌঁছে যায়। এখন তারা আরও অনেক এগিয়ে গেছে। ২০২১ সালে জিসিএসই দেওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ৬৭ শতাংশ ১৯ বছর বয়সের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল; শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের ক্ষেত্রে এই হার ৩৮ শতাংশ। প্রকৌশল ও প্রযুক্তিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা গত এক দশকে দ্বিগুণ হয়েছে, আর চিকিৎসা ও দন্ত চিকিৎসায় বেড়েছে তিন গুণ।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও পরিবর্তন হচ্ছে। ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী বাংলাদেশি নারীদের ৬৮ শতাংশ কর্মরত ছিলেন; শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ নারীদের ক্ষেত্রে হার ৭৯ শতাংশ। পেশাজীবী বা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের চাকরিতেও ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশিরা পিছিয়ে নেই। একই বয়সী বাংলাদেশিদের ১৪ শতাংশ এমন চাকরিতে ছিলেনÑযা শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের প্রায় সমান।
বাংলাদেশিদের অগ্রগতির পেছনে লন্ডনের মতো অর্থনৈতিকভাবে গতিশীল শহরে বসবাসও ভ‚মিকা রাখছে। গবেষকদের মতে, শিক্ষিত বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি নারীদের সামাজিক ও বৈবাহিক অবস্থানও ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে।
বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেকই ব্রিটেনের বাইরে জন্মগ্রহণ করেছেন। নতুন অভিবাসীদের আগমন অব্যাহত থাকায় সামগ্রিক অগ্রগতি অনেক সময় চোখে পড়ে না। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, ব্রিটিশ সমাজে বাংলাদেশিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক একীভ‚তকরণ ধীরে হলেও স্পষ্টভাবেই এগিয়ে চলছে।