বন্যায় মরদেহ ভেসে গেছে অনেক দূরে,
মর্গগুলোতেও আর জায়গা নেই
দর্পণ ডেস্ক
নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া মরদেহগুলো শত শত কিলোমিটার দূরের এলাকায় গিয়ে পড়ছে। বিভিন্ন জেলা থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের পর হাসপাতালের মর্গগুলোতে জায়গা সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে মরদেহ সংরক্ষণ ও পরিচয় শনাক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
বুধবার ২৬ (আগস্ট) নেপালের রাসুয়া জেলার ভোটেকোশী নদীতে শক্তিশালী আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে। পরে বন্যার পানি ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদী হয়ে ভাটির দিকে প্রবাহিত হয়। এর ফলে রাসুয়া ও নুয়াকোটের মানুষের মরদেহ চিতওয়ান, তানাহুন, নাওয়ালপারাসি ও অন্যান্য এলাকায় উদ্ধার করা হচ্ছে।
মরদেহের সংখ্যা বাড়তে থাকায় নুয়াকোট, ধাদিং ও নাওয়ালপারাসির মর্গগুলোতে জায়গা ফুরিয়ে এসেছে। কিছু মরদেহ পার্শ্ববর্তী জেলায় পাঠানো হয়েছে। চিতওয়ান ও পোখরার হাসপাতালগুলোতেও ধারণক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
চিতওয়ানের ভারতপুরে একটি অস্থায়ী মরদেহ সংরক্ষণকেন্দ্র তৈরি করছে কর্তৃপক্ষ। শিল্প উদ্যোগ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের একটি অব্যবহৃত ভবনকে এ কাজে ব্যবহার করা হবে। সেখানে প্রায় ২৫০টি মরদেহ রাখা যাবে। চিতওয়ানের হাসপাতালগুলোর মর্গে একসঙ্গে মাত্র ৩০ থেকে ৫০টি মরদেহ রাখার সক্ষমতা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত চিতওয়ানের ফিশলিং থেকে গোলাঘাট পর্যন্ত ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদীর অংশ থেকে ১৩৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযান তখনও চলছিল।
অস্থায়ী সংরক্ষণকেন্দ্রে মরদেহের পচন ধীর করতে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র এবং শুষ্ক বরফ ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ কেন্দ্রের ধারণক্ষমতাও ছাড়িয়ে গেলে দেবঘাটের বৈদ্যুতিক শ্মশানকে অতিরিক্ত ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে ছুটছেন পরিবার
বন্যার পর নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে রাসুয়া, নুয়াকোট, গোরখা ও অন্যান্য জেলা থেকে মানুষ চিতওয়ানে আসছেন। অস্থায়ী সংরক্ষণকেন্দ্রের সামনে স্বজনদের ভিড়ও বাড়ছে।
অনেকেই নিখোঁজ পরিবারের সদস্যদের ছবি নিয়ে উদ্ধার হওয়া মরদেহের পরিচয় শনাক্তের অপেক্ষায় রয়েছেন।
এদিকে পোখরাতেও মর্গে জায়গা সংকট দেখা দিয়েছে। তানাহুন, গোরখা, পূর্ব নাওয়ালপারাসি ও ধাদিং থেকে মোট ৯৩টি মরদেহ পোখরায় পাঠানো হয়েছে। জেলার হাসপাতালগুলোতে মোট ৮৮টি মরদেহ রাখার ব্যবস্থা থাকলেও বন্যার আগে সেখানে পাঁচটি মরদেহ ছিল।
ফলে বন্যায় উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা হাসপাতালগুলোর সম্মিলিত ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি হয়ে গেছে। আরও মরদেহ এলে পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
পোখরা স্বাস্থ্যবিজ্ঞান একাডেমির মর্গে মরদেহগুলো ২ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখা হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই তাপমাত্রায় সাধারণত মরদেহ ১০ দিন থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। এর বেশি সময় রাখতে হলে শূন্য ডিগ্রির নিচে তাপমাত্রা ধরে রাখার মতো বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা পোখরায় নেই।
পরিচয়হীন মরদেহ দাফনের প্রস্তুতি
পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হলে মরদেহ ব্যবস্থাপনার জন্যও প্রস্তুতি নিচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
পুলিশ প্রথমে মরদেহের ছবি তোলে, আঙুলের ছাপ নেয়, ময়নাতদন্ত করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে। মুখ দেখে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হলে পরিবারের সদস্যদের সহায়তার জন্য ছবি প্রকাশ করা হয়।
পরিচয় শনাক্ত করা না গেলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপদ স্থানে মরদেহ দাফনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। প্রতিটি মরদেহের জন্য আলাদা নম্বরযুক্ত পরিচিতি ট্যাগ রাখা হবে এবং দাফনের তথ্য সংরক্ষণ করা হবে।
ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা কাঠমান্ডুতে পাঠানো হবে। নেপাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি একাডেমি এবং নেপাল পুলিশের কেন্দ্রীয় ফরেনসিক বিজ্ঞান গবেষণাগারে এসব পরীক্ষা করা হবে।
বিভিন্ন জেলায় বাড়ছে মরদেহের সংখ্যা
মর্গে জায়গা না থাকায় গোরখা থেকে ১১টি মরদেহ পোখরার গান্ডাকি প্রাদেশিক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ত্রিশূলী নদীসংলগ্ন গোরখার বিভিন্ন এলাকা থেকে মোট ৩৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পূর্ব নাওয়ালপারাসিতেও সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের মর্গে জায়গা না থাকায় কিছু মরদেহ পোখরা, বুটওয়াল, ভৈরহাওয়া ও পালপায় পাঠানো হয়েছে। ৪১টি মরদেহ পোখরায় এবং আটটি পালপা জেলা হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে ধাদিংয়ে ৩৭টি মরদেহ ও মানবদেহের বিভিন্ন অংশ উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত মর্গ ও শীতলীকরণ ব্যবস্থা না থাকায় ছয়টি মরদেহ কাঠমান্ডুতে পাঠানো হয়েছে। বাকি মরদেহ ও দেহাবশেষ পোখরায় পাঠানো হয়েছে।
বন্যার পর উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় আরও মরদেহ উদ্ধারের আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ। ফলে মরদেহ সংরক্ষণ, পরিচয় শনাক্ত এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের কাছে তথ্য পৌঁছানো সব মিলিয়ে নেপালে নতুন করে বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে।



















