দর্পণ ডেস্ক
মরক্কো থেকে স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতায় নজিরবিহীনভাবে প্রবেশ করা ৪৮ হাজারের বেশি অভিবাসী স্বেচ্ছায় মরক্কোয় ফিরে গেছে। বৃহস্পতিবার থেকে শুক্রবারের মধ্যে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ স্থল ও সমুদ্রপথে সেউতায় ঢোকার চেষ্টা করেন। এ সময় পদদলিত ও পানিতে ডুবে অন্তত ৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
ঘটনার পর সেউতায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে স্পেন। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীও মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি পরিদর্শনে শুক্রবার সেউতা সফর করেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ।
সানচেজ এ ঘটনাকে স্পেনের ‘আঞ্চলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন’ হিসেবে উল্লেখ করে এর জন্য মানবপাচারকারী চক্রকে দায়ী করেছেন। তাঁর দাবি, পাচারকারী চক্র স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক একটি রায়ের ভুল ব্যাখ্যা ছড়িয়ে অভিবাসীদের সেউতায় প্রবেশে উৎসাহিত করেছে।
স্পেনের কর্মকর্তারা জানান, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৪৮ হাজারের বেশি অভিবাসী স্বেচ্ছায় মরক্কোয় ফিরে গেছেন। বিপুলসংখ্যক মানুষ একসঙ্গে সেউতায় ঢুকে পড়ায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শহরটির স্বাভাবিক পরিস্থিতি ভেঙে পড়ে। সেউতার জনসংখ্যা প্রায় ৮৫ হাজার হওয়ায় এই ঢল শহরটির জন্য বড় ধরনের মানবিক ও নিরাপত্তা সংকট তৈরি করে।
ঘটনাস্থলের একজন অভিবাসী রয়টার্সকে বলেন, তিনি মরক্কোয় ফিরে যাচ্ছেন। তাঁর ভাষায়, ‘এখানে মানুষ মারা যাচ্ছে।’ যারা এখনো আসেননি, তাদের এমন ঝুঁকি না নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
উত্তর আফ্রিকার উপকূলে অবস্থিত সেউতা স্পেনের একটি ছিটমহল। জিব্রাল্টার প্রণালির কাছে অবস্থিত এই অঞ্চলটি ইউরোপে প্রবেশের প্রত্যাশী অভিবাসীদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ। মরক্কো থেকে সাঁতরে, সীমান্তের বেড়া টপকে কিংবা জেটির পাথুরে বাঁধ ধরে হেঁটে সেউতায় ঢোকার চেষ্টা করেন অভিবাসীরা।
এবারের ঘটনায় অনেকে কয়েক কিলোমিটার সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সেউতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। অন্যরা সীমান্তের পাথুরে অংশ ধরে এগিয়ে যান। এ সময় বিপুলসংখ্যক মানুষের চাপে অনেকে পানিতে পড়ে যান এবং কেউ কেউ পদদলিত হয়ে মারা যান। স্পেনের পক্ষ থেকে সীমান্তে ৫৭টি মরদেহ উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছে। মরক্কোর অংশে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সেউতায় অভিবাসীদের এই ঢল এমন সময়ে ঘটল, যখন স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে—সেউতা বা মেলিলায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে সমুদ্রে আটক হওয়া অভিবাসীদের সরাসরি মরক্কোয় ফেরত পাঠানো যাবে না। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মানবপাচারকারী চক্র ওই রায়ের একটি ‘স্বার্থান্বেষী ব্যাখ্যা’ ছড়িয়ে দেওয়ার পর অভিবাসীদের মধ্যে সেউতায় প্রবেশের প্রবণতা হঠাৎ বেড়ে যায়।
স্পেন সরকার জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মরক্কোর সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা আরও জোরদারের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। যারা সীমান্ত পেরিয়ে সেউতায় ঢুকেছিলেন, তাদের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে মরক্কোয় ফিরে গেছেন।
অভিবাসীদের মধ্যে নারী, শিশু ও কোলের শিশুও ছিল। সীমান্তে আটকে পড়া অনেকের খাবার ও আশ্রয়ের সংকট দেখা দেয়। সেউতার স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এত বড় জনসমাগমকে নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেছে।
এদিকে সেউতার পাশাপাশি স্পেনের আরেক উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল মেলিলাতেও সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা হয়েছে। সেখানে কয়েক শ অভিবাসী সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করেন। দুই এলাকায় পরিস্থিতি সামাল দিতে স্পেন অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করেছে।
ঘটনাটি ইউরোপজুড়ে রাজনৈতিক উদ্বেগও তৈরি করেছে। স্পেনের অভিবাসন নীতি নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ইতালি স্পেনের সঙ্গে শেনজেন ব্যবস্থার আওতায় সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সাময়িক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেউতা ও মেলিলায় অভিবাসী প্রবেশের সংখ্যা বাড়ছিল। তবে একসঙ্গে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের এমন ঢলকে স্পেনের উত্তর আফ্রিকান সীমান্তে নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।








