দর্পণ ডেস্ক
পদার্থবিদ্যায় অসামান্য অবদান রাখায় চলতি বছর সম্মানজনক নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন ফ্রান্সিস হালজেন। আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো (কণা) আবিষ্কারের জন্য এই পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়।
আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় বেলা ৩টা ৪৫ মিনিটে সুইডেনের রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্স তাঁর নাম ঘোষণা করে।
নোবেল পুরস্কারের ওয়েবসাইটে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ফ্রান্সিস হালজেন জ্যোতির্বিজ্ঞানের সম্পূর্ণ নতুন এক ধারার ভিত্তি তৈরি করেছেন। তাঁর ধারণা ছিল, দক্ষিণ মেরুর হিমবাহের বরফ ব্যবহার করে নিউট্রিনো নামের রহস্যময় ও শনাক্ত করা কঠিন কণাগুলোকে খুঁজে বের করা।
এই ধারণার ফল হলো আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি (IceCube Neutrino Observatory)। এটি এমন এক বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণব্যবস্থা, যার মাধ্যমে দূরবর্তী মহাজাগতিক অঞ্চল থেকে আসা নিউট্রিনোগুলোর গতিপথ শনাক্ত ও অনুসরণ করা যায়।
ফ্রান্সিস হালজেন বেলজিয়ামে জন্মগ্রহণ করলেও বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনে কাজ করছেন। তাঁর দেওয়া ধারণার ওপর ভিত্তি করেই বিজ্ঞানীরা আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি তৈরি করেন।
ফ্রান্সিস হালজেন বুঝতে পেরেছিলেন, দক্ষিণ মেরুর বরফ ব্যবহার করে নিউট্রিনো নামে পরিচিত কণাগুলো শনাক্ত ও অনুসরণ করা সম্ভব। তাঁর এই দূরদর্শী চিন্তা ও বৈজ্ঞানিক নেতৃত্ব আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এটি প্রায় এক ঘনকিলোমিটার আয়তনের বরফের বিশাল কাঠামো। যার মধ্যে আলো শনাক্ত করার জন্য বিশেষ লাইট সেন্সর স্থাপন করা হয়েছে।
এই আইসকিউব ব্যবহার করে গবেষকেরা এখন দূরবর্তী মহাবিশ্বের অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিপুল শক্তি উৎপন্নকারী প্রক্রিয়া থেকে আসা নিউট্রিনো কণা শনাক্ত করতে পারেন।
এর আগে, গত বছর পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার লাভ করেন—জন ক্লার্ক, মিশেল এইচ ডেভোরে ও জন এম মার্টিনিস। ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে এই তিনজন একসঙ্গে এমন একটি বৈদ্যুতিক সার্কিটে পরীক্ষা চালান, যেখানে ব্যবহার করা হয় সুপার কন্ডাক্টর। সুপার কন্ডাক্টর এমন এক পদার্থ, যা কোনো বৈদ্যুতিক প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে। এই সার্কিটে তাঁরা সুপার কন্ডাক্টরের মাঝে পাতলা এক অপরিবাহী স্তর বসান।
এভাবে তৈরি যন্ত্রকে বলা হয় জোসেফসন জাংশন। গবেষকেরা ধাপে ধাপে সার্কিটের বৈশিষ্ট্য মেপে ও নিয়ন্ত্রণ করে দেখেছেন, যখন বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয় তখন এর ভেতর কী কী ঘটনা ঘটে। এ অবস্থায় সুপার কন্ডাক্টরের ভেতরে চলমান চার্জ কণাগুলো এমনভাবে আচরণ করে, যেন তারা মিলে একটি একক কণায় রূপ নিয়েছে এবং পুরো সার্কিট জুড়ে ছড়িয়ে আছে।
এই বৃহৎ কণা-সদৃশ সিস্টেম প্রথমে থাকে এমন এক অবস্থায়, যেখানে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয় কিন্তু কোনো ভোল্টেজ তৈরি হয় না। এই অবস্থাকে ধরা হয় একটি ফাঁদে আটকে থাকা বা অতিক্রম অযোগ্য প্রতিবন্ধকতার পেছনে থাকা অবস্থা হিসেবে। কিন্তু পরীক্ষায় দেখা যায়—সিস্টেম হঠাৎই কোয়ান্টাম চরিত্র প্রকাশ করে। এটি টানেলিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শূন্য ভোল্টেজের অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসে। আর তখনই সার্কিটে ভোল্টেজের উপস্থিতি ধরা পড়ে।
গবেষকেরা আরও দেখিয়েছেন, সিস্টেমের আচরণ একেবারে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের পূর্বাভাসের সঙ্গে মিলে যায়। অর্থাৎ এর শক্তি ধাপে ধাপে বিন্যস্ত—এটি নির্দিষ্ট মাত্রার শক্তি গ্রহণ বা ত্যাগ করতে পারে।
এর আগে, ২০২৪ কৃত্রিম ‘নিউরাল নেটওয়ার্কের সাহায্যে মেশিন লার্নিংকে সক্ষম করে তোলার’ মৌলিক আবিষ্কারের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পান জন হপফিল্ড ও জিওফ্রে হিনটন। জন হপফিল্ড যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং জিওফ্রে হিনটন কানাডার ইউনিভার্সিটি অব টরোন্টোর অধ্যাপক। ২০২৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পান যুক্তরাষ্ট্রের পিয়েরে অগস্তিনি, জার্মানির ফেরেন্স ক্রাউস এবং সুইডেনের অ্যানে হুইলিয়ে। আলোর স্বল্পতম স্পন্দন তৈরি করে অতি সংক্ষিপ্ত মুহূর্তকে বন্দী করার কৌশল নিয়ে গবেষণা করার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁদের নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
তার আগে ২০২২ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল জেতেন তিনজন। তাঁরা হলেন অ্যালাইন আসপেক্ট, জন এফ ক্লসার ও আন্তন জেলিঙ্গার। ইনট্যাঙ্গলড ফোটনস, ভায়োলেশন অব বেল ইনইকুয়ালিটিস প্রতিষ্ঠা এবং কোয়ান্টাম ইনফরমেশন সায়েন্সে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় তাঁদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়। তাঁদের আবিষ্কার কোয়ান্টাম ইনফরমেশন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। তিনজনের মধ্যে বিজ্ঞানী অ্যালাইন আসপেক্ট ফরাসি, জন এফ ক্লসার মার্কিন এবং আন্তন জেলিঙ্গার অস্ট্রিয়ার নাগরিক।


















