ঢাকা ০১:৩০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে সহিংসতা, আটক ৪৪০

  • আপডেট সময় ০২:০৮:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১১ বার পড়া হয়েছে

দর্পণ ডেস্ক

ফ্রান্সজুড়ে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মঙ্গলবার সহিংস রূপ নিয়েছে। শিক্ষা খাতে শিক্ষক ও কর্মী সংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, দীর্ঘ ক্লাসসূচি এবং পর্যাপ্ত সম্পদের অভাবের প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে দেশটির বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় অন্তত ৪৪০ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ। আটক ব্যক্তিদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সংখ্যা এখনো নিশ্চিত হয়নি।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে প্যারিসের আশপাশের আইল–দে–ফ্রাঁন্স অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। মঙ্গলবার তা ছড়িয়ে পড়ে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে। অনেক শিক্ষার্থী স্কুলের প্রবেশপথ অবরোধ করে ক্লাস বন্ধ রাখার চেষ্টা করে।

ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার প্রায় ৪০০টি স্কুল বিক্ষোভ বা এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪০টি স্কুল অবরোধ করা হয় এবং আরও ৪৪টি স্কুলে অবরোধের চেষ্টা চালানো হয়।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অনেক শ্রেণিকক্ষে ৩২ থেকে ৩৫ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী থাকায় শিক্ষকদের ওপর কাজের চাপ বেড়েছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর কারণে স্বাভাবিক পরিবেশে পাঠদান ও পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘ ক্লাসসূচি এবং শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত গরমের বিষয়টিও আন্দোলনে উঠে এসেছে।

বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ

মঙ্গলবার কয়েকটি এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। ফরাসি গণমাধ্যম ও বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোথাও আবর্জনার বাক্সে আগুন দেওয়া হয় এবং পুলিশের দিকে বোতল ও পাথর ছোড়া হয়। কয়েকটি স্থানে বাসস্টপ ও বিজ্ঞাপনের কাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। সংঘর্ষে অন্তত ১০ শিক্ষক ও কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৪৮ সদস্যও। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ জানিয়েছেন, কিছু ঘটনায় পুলিশের দিকে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ছোড়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ১৬ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী বলেন, তাঁদের উদ্দেশ্য কোনো কারণ ছাড়াই ভাঙচুর করা নয়; বরং শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যাগুলো তুলে ধরা। তাঁর ভাষ্য, একটি শ্রেণিতে ৩৪ জন শিক্ষার্থী থাকায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েই চাপের মধ্যে রয়েছেন।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সরকারের বক্তব্য

সেন্ট্রাল হাইস্কুল স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সভাপতি রিয়াদ রনি সরকারের বিরুদ্ধে দমন-পীড়নের অভিযোগ তুলেছেন। একই সঙ্গে পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগেরও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, শিক্ষা খাতে সম্পদের ঘাটতি, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক-কর্মীর সংকটের প্রতিবাদেই শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছে।

তবে ফরাসি শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে বলেন, শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সহিংসতার ঘটনাকে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, স্কুল অবরোধের মাত্রা বাড়ানোর আহ্বান শিক্ষার্থী ও সরকারি কর্মীদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুও আন্দোলন আরও তীব্র হওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। এর আগে সোমবার ১৬৪ জনকে আটকের পর তিনি বলেন, স্কুলের সামনে আতশবাজি, আগুন বা সহিংসতার ঘটনা শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মী কিংবা পুলিশের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। একই সঙ্গে উচ্চবিদ্যালয়গুলোর সমস্যাগুলো গুরুত্ব দিয়ে শুনে সমাধানের প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি স্বীকার করেন।

একই দিনে সরকারি কর্মীদের ধর্মঘট

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পাশাপাশি মঙ্গলবার ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষক, হাসপাতালকর্মী ও সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন ইউনিয়ন ধর্মঘট ও কর্মবিরতি পালন করে। কম বেতন, কর্মপরিবেশের অবনতি এবং সরকারের প্রস্তাবিত বাজেট কাটছাঁটের বিরোধিতা ছিল তাদের দাবির অন্যতম।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজের হিসাবে, এসব কর্মসূচিতে অন্তত ২ লাখ মানুষ অংশ নেন। তাঁর দাবি, অধিকাংশ কর্মসূচিই বড় ধরনের সহিংসতা ছাড়াই শেষ হয়েছে।

এদিকে ২০২৭ সালের বাজেটকে ঘিরে ফরাসি সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। সরকারি ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা নিয়ে দেশটিতে অসন্তোষের মধ্যে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-সংক্রান্ত আন্দোলন এবং সরকারি কর্মীদের ধর্মঘট একই দিনে রাজপথে দেখা গেল। ফলে পৃথক দাবিতে শুরু হওয়া দুটি আন্দোলন একসঙ্গে ফ্রান্সের সাম্প্রতিক সামাজিক অসন্তোষের চিত্র সামনে এনেছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

লক ডাউন পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় ফ্রান্সে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি

যুক্তরাজ্যে করোনার মধ্যেই শিশুদের মাঝে নতুন রোগের হানা

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে সহিংসতা, আটক ৪৪০

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে সহিংসতা, আটক ৪৪০

আপডেট সময় ০২:০৮:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দর্পণ ডেস্ক

ফ্রান্সজুড়ে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মঙ্গলবার সহিংস রূপ নিয়েছে। শিক্ষা খাতে শিক্ষক ও কর্মী সংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, দীর্ঘ ক্লাসসূচি এবং পর্যাপ্ত সম্পদের অভাবের প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে দেশটির বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় অন্তত ৪৪০ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ। আটক ব্যক্তিদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সংখ্যা এখনো নিশ্চিত হয়নি।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে প্যারিসের আশপাশের আইল–দে–ফ্রাঁন্স অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। মঙ্গলবার তা ছড়িয়ে পড়ে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে। অনেক শিক্ষার্থী স্কুলের প্রবেশপথ অবরোধ করে ক্লাস বন্ধ রাখার চেষ্টা করে।

ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার প্রায় ৪০০টি স্কুল বিক্ষোভ বা এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪০টি স্কুল অবরোধ করা হয় এবং আরও ৪৪টি স্কুলে অবরোধের চেষ্টা চালানো হয়।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অনেক শ্রেণিকক্ষে ৩২ থেকে ৩৫ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী থাকায় শিক্ষকদের ওপর কাজের চাপ বেড়েছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর কারণে স্বাভাবিক পরিবেশে পাঠদান ও পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘ ক্লাসসূচি এবং শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত গরমের বিষয়টিও আন্দোলনে উঠে এসেছে।

বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ

মঙ্গলবার কয়েকটি এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। ফরাসি গণমাধ্যম ও বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোথাও আবর্জনার বাক্সে আগুন দেওয়া হয় এবং পুলিশের দিকে বোতল ও পাথর ছোড়া হয়। কয়েকটি স্থানে বাসস্টপ ও বিজ্ঞাপনের কাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। সংঘর্ষে অন্তত ১০ শিক্ষক ও কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৪৮ সদস্যও। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ জানিয়েছেন, কিছু ঘটনায় পুলিশের দিকে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ছোড়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ১৬ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী বলেন, তাঁদের উদ্দেশ্য কোনো কারণ ছাড়াই ভাঙচুর করা নয়; বরং শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যাগুলো তুলে ধরা। তাঁর ভাষ্য, একটি শ্রেণিতে ৩৪ জন শিক্ষার্থী থাকায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েই চাপের মধ্যে রয়েছেন।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সরকারের বক্তব্য

সেন্ট্রাল হাইস্কুল স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সভাপতি রিয়াদ রনি সরকারের বিরুদ্ধে দমন-পীড়নের অভিযোগ তুলেছেন। একই সঙ্গে পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগেরও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, শিক্ষা খাতে সম্পদের ঘাটতি, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক-কর্মীর সংকটের প্রতিবাদেই শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছে।

তবে ফরাসি শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে বলেন, শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সহিংসতার ঘটনাকে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, স্কুল অবরোধের মাত্রা বাড়ানোর আহ্বান শিক্ষার্থী ও সরকারি কর্মীদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুও আন্দোলন আরও তীব্র হওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। এর আগে সোমবার ১৬৪ জনকে আটকের পর তিনি বলেন, স্কুলের সামনে আতশবাজি, আগুন বা সহিংসতার ঘটনা শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মী কিংবা পুলিশের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। একই সঙ্গে উচ্চবিদ্যালয়গুলোর সমস্যাগুলো গুরুত্ব দিয়ে শুনে সমাধানের প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি স্বীকার করেন।

একই দিনে সরকারি কর্মীদের ধর্মঘট

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পাশাপাশি মঙ্গলবার ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষক, হাসপাতালকর্মী ও সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন ইউনিয়ন ধর্মঘট ও কর্মবিরতি পালন করে। কম বেতন, কর্মপরিবেশের অবনতি এবং সরকারের প্রস্তাবিত বাজেট কাটছাঁটের বিরোধিতা ছিল তাদের দাবির অন্যতম।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজের হিসাবে, এসব কর্মসূচিতে অন্তত ২ লাখ মানুষ অংশ নেন। তাঁর দাবি, অধিকাংশ কর্মসূচিই বড় ধরনের সহিংসতা ছাড়াই শেষ হয়েছে।

এদিকে ২০২৭ সালের বাজেটকে ঘিরে ফরাসি সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। সরকারি ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা নিয়ে দেশটিতে অসন্তোষের মধ্যে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-সংক্রান্ত আন্দোলন এবং সরকারি কর্মীদের ধর্মঘট একই দিনে রাজপথে দেখা গেল। ফলে পৃথক দাবিতে শুরু হওয়া দুটি আন্দোলন একসঙ্গে ফ্রান্সের সাম্প্রতিক সামাজিক অসন্তোষের চিত্র সামনে এনেছে।