ঢাকা ০৯:০৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
বিশ্বকাপ ২০২৬: কেন আবারও শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার ফ্রান্স? জেনেভায় প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীকে প্রবাসীদের ১৮ দফা দাবি সম্বলিত স্বারকলিপি প্রদান বাংলাদেশিসহ ১০ লক্ষাধিক মানুষের আমেরিকার স্বপ্ন ধূলিসাতের পথে বিসিবি নির্বাচন আজ, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিচালক হলেন সিলেটের আব্দুল কাইয়ুম ফ্রান্সসহ ইউরোপে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য সতর্কবার্তা মধ্যপ্রাচ্যের ১৪ দেশে নতুন সতর্কতা জারি করলো যুক্তরাষ্ট্র মার্কিন ভিসা প্রার্থীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে বিশেষ নির্দেশনা আজারবাইজানে ইসরায়েলের গোপন ঘাঁটির তথ্য ফাঁস পাকিস্তানে তিন সন্তানের সামনে ফরাসি পর্যটককে গণধর্ষণ, ২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল বাংলাদেশের প্রার্থী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত

বিশ্বকাপ ২০২৬: কেন আবারও শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার ফ্রান্স?

  • আপডেট সময় ০১:২১:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
  • ৯ বার পড়া হয়েছে

France's President Emmanuel Macron (first row, C-L) and his wife Brigitte Macron (first row, C-R) pose with the French national football team during a visit at the national team training grounds in Clairefontaine-en-Yvelines, southwest of Paris on June 2, 2026, ahead of 2026 FIFA World Cup football tournament. (Photo by Thomas Padilla / POOL / AFP via Getty Images)

শামসুল ইসলাম : কয়েকদিন আগেও ছিল ফিফা রেংকিং এর শীর্ষ দল, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট। ২০১৮ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। গত এক দশকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ধারাবাহিকতার সবচেয়ে বড় প্রতীক ফ্রান্স। তাই যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিতব্য ২০২৬ ফিফা বিশ্বকপে ফ্রান্সকে আবারও অন্যতম হট ফেভারিট বলা মোটেও অতিরঞ্জন নয়।

কোচ দিদিয়ে দেশমের শিষ্যরা এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে, যেখানে অভিজ্ঞতা, তারুণ্য, স্কোয়াড ডেপথ, ট্যাকটিক্যাল ভারসাম্য এবং বড় মঞ্চে মানসিক দৃঢ়তা—সবকিছুই একসঙ্গে মিলেছে। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ ও স্কোয়াড ঘোষণার পর ফুটবল বিশ্বের বড় অংশই মনে করছে, উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিতব্য ২০২৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্স আবারও ফাইনালে ওঠার অন্যতম দাবিদার।

কেমন হলো ফ্রান্সের ঘোষিত দল:

কোচ দেশমের ঘোষিত স্কোয়াড বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, ফ্রান্স এবার আগের চেয়েও বেশি ভারসাম্যপূর্ণ, গতিময় এবং কৌশলগতভাবে পরিণত একটি দল। বলা হচ্ছে লে ব্লুজদের আক্রমণভাগ বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর!
বর্তমান বিশ্ব ফুটবলে ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় শক্তি নিঃসন্দেহে তাদের আক্রমণভাগ। অধিনায়ক কিলান এম্বাপে এখনও দলের প্রাণভোমরা। ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালে হ্যাটট্রিক করা এই সুপারস্টার এখন আরও পরিণত, আরও কার্যকর। ফরাসি দলের আক্রমণভাগে তার সঙ্গে আছেন সর্বশেষ ভেলন ডি’অর জেতা প্যারিস সেইন্ট জার্মান ফরোয়ার্ড ওসমান ডেম্বেলে, তরুণ তুর্কি মাইকেল ওলিজ,ডেসিরে দো এবং উদীয়মান প্রতিভা রায়ান চেরকি। এদের মধ্যে বিশেষ করে দেম্বেলের সাম্প্রতিক ফর্ম ফ্রান্সকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে। ফিফা ও বিভিন্ন ইউরোপীয় বিশ্লেষকদের মতে, ফরাসি আক্রমণভাগ এখন গতির সঙ্গে সৃজনশীলতার এক দুর্দান্ত সমন্বয়। বলা হচ্ছে দেশমের সম্ভাব্য আক্রমণাত্মক ফর্মেশন ৪-২-৩-১ এ এমবাপ্পে মূল স্ট্রাইকার হলেও অলিজ ও দেম্বেলের গতিময় উইং প্লে প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ক্রমাগত চাপে রাখবে।

এই দুই জনের রসায়নের উপর অনেকাংশে নির্ভর করছে এবারের ফ্রান্সের জয়রথ

মিডফিল্ড: শক্তি, গতি ও বল নিয়ন্ত্রণের নিখুঁত মিশ্রণ
বিশ্বকাপ জয়ের জন্য কেবল তারকা ফরোয়ার্ডই যথেষ্ট নয়; মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই জায়গায়ও ফ্রান্স অত্যন্ত সমৃদ্ধ। যদিও অনেক সমালোচক ফ্রান্সের দূর্বলতার যায়গা হিসাবে মিডফিল্ডকে নির্দেশ করছেন। আবার কারো কারো মতে ২০২৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে তাদের মিডফিল্ড। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এডোয়ার্ড কামাভিংগার অনুপস্থিতি। ইনজুরি ও ফিটনেস পরিস্থিতির কারণে তিনি বর্তমান দলে যায়গা পাননি। চ্যাম্পিয়নস লীগেও ছিলেন ম্রিয়মাণ। কিন্তু তবুও ফরাসি মাঝমাঠের গভীরতায় বড় কোনো ঘাটতি দেখা যাচ্ছে না। ট্রুয়েমেনি বর্তমানে দলের প্রধান ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। বল পুনরুদ্ধার, পজিশনিং এবং রক্ষণভাগকে সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কান্তে এখনও বড় ম্যাচের খেলোয়াড়। বয়স বাড়লেও তার ম্যাচ রিডিং এবং বল কেটে নেওয়ার দক্ষতা ফ্রান্সকে আলাদা সুবিধা দেয়। অন্যদিকে প্যারিস সেইন্ট জার্মান তারকা ওয়ারেন জায়ের এমেরি এবং এ এস রোমার মানু কনে ফরাসি ফুটবলের নতুন প্রজন্মের প্রতীক। তাদের গতি, এনার্জি ও প্রেসিং ক্ষমতা আধুনিক টুর্নামেন্ট ফুটবলে অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। ফ্রান্সের মিডফিল্ডের আরেকটি বড় সুবিধা হলো “বহুমুখিতা”। একই খেলোয়াড় ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী ডিফেন্সিভ বা আক্রমণাত্মক ভূমিকায় সহজেই মানিয়ে নিতে পারেন।

রক্ষণভাগ: আগের তুলনায় আরও পরিণত
২০২২ বিশ্বকাপে ইনজুরি ছিল ফ্রান্সের বড় সমস্যা। কিন্তু এবার পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো।
ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ জেতা আর্সেনাল ডিফেন্ডার ইউলিয়াম সালিভা এবং বায়ার্ন মিউনিখের ভরসা দায়ত উপামেকানো জুটি এখন ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী সেন্টার-ব্যাক কম্বিনেশন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফুল-ব্যাক পজিশনে আল হিলালের থিও হার্নান্দেজ ও লা লিগা চ্যাম্পিয়ন বার্সিলোনার জোলেস কন্ডে ফ্রান্সকে আক্রমণ ও রক্ষণ—দুই ক্ষেত্রেই বাড়তি সুবিধা দেবে।

সংক্ষেপে বলা যায় সালিবা বর্তমানে ইউরোপের সবচেয়ে স্থির ও পরিণত সেন্টার-ব্যাকদের একজন। উপামেকানোর শারীরিক শক্তি ও গতি ফ্রান্সকে হাই-লাইন ডিফেন্স খেলতে সাহায্য করে। কনাতে বাতাসে দুর্দান্ত, আর কোন্ডে আধুনিক আক্রমণাত্মক ফুল-ব্যাকের ভূমিকায় অত্যন্ত কার্যকর।
থেও হার্নান্দেজ ফ্রান্সের আক্রমণ তৈরির অন্যতম বড় অস্ত্র। বাম প্রান্ত দিয়ে তার দৌড় ও ওভারল্যাপিং প্রতিপক্ষের ডিফেন্সে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।

গোলপোস্টে মাইক মেইগ্নান বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম নির্ভরযোগ্য গোলরক্ষক হিসেবে বিবেচিত। তার বল ডিস্ট্রিবিউশন ও রিফ্লেক্স ফ্রান্সের বিল্ড-আপ ফুটবলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সবচেয়ে বড় শক্তি: স্কোয়াড ডেপথ
ফ্রান্সকে অন্য দলগুলোর চেয়ে আলাদা করে তাদের স্কোয়াড গভীরতা। তাদের “দ্বিতীয় সারির” খেলোয়াড়রাও অন্য যেকোনো দেশের মূল একাদশে সহজেই যায়গা করে নিতে পারে। বেঞ্চ থেকে নামতে পারেন এমন ফুটবলারদের অনেকেই অন্য দেশের প্রথম একাদশে অনায়াসে খেলতে পারতেন।
ফিফার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৬ স্কোয়াডে অভিজ্ঞতা ও তরুণ প্রতিভার দুর্দান্ত সমন্বয় রয়েছে।
এই গভীরতাই দীর্ঘ টুর্নামেন্টে ফ্রান্সকে বাড়তি সুবিধা দেবে। কারণ বিশ্বকাপ এখন ৪৮ দলের, ম্যাচও বেশি। ফলে রোটেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

ট্যাকটিক্যাল দিক: দিদিয়ের দেশমের শেষ অভিযান?
২০২৬ বিশ্বকাপের পর কোচ দিদিয়ে দেশম দায়িত্ব ছাড়তে পারেন—এমন আলোচনা ইউরোপীয় গণমাধ্যমে জোরালো। দেশমের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো টুর্নামেন্ট ম্যানেজমেন্ট। তিনি নান্দনিক ফুটবলের চেয়ে ফলাফলকে অগ্রাধিকার দেন। তার দল কখনও অতিরিক্ত ঝুঁকি নেয় না, আবার প্রয়োজন হলে মুহূর্তেই গতি বাড়িয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
২০১৮ সালে শিরোপা এবং ২০২২ সালে ফাইনাল—এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, নকআউট ম্যাচে দেশমের কৌশল এখনও অত্যন্ত কার্যকর।

দুর্বলতার জায়গা কোথায়?
তবে ফ্রান্স একেবারে দুর্বলতাহীন নয়।
প্রথমত, দলের অনেক বড় তারকার ওপর নির্ভরতা এখনও বেশি। এমবাপ্পে বা দেম্বেলের কেউ ইনজুরিতে পড়লে আক্রমণভাগের ভারসাম্যে প্রভাব পড়তে পারে।
দ্বিতীয়ত, মাঝে মাঝে ফ্রান্সের রক্ষণে মনোযোগের ঘাটতি দেখা যায়, বিশেষ করে দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক সামলানোর ক্ষেত্রে।
তৃতীয়ত, গ্রুপ পর্বে সবকিছু ঠিকঠাক মতো এগুলে ফাইনালের পথে ফ্রান্সকে জার্মানি ,স্পেনের মতো সাবেক চ্যাম্পিয়নদের হারাতে হবে। এই স্কোয়াডগুলো শিরোপা জয়ের অন্যতম দাবিদার । বিশেষ করে স্পেনের সাম্প্রতিক পারফর্মেন্স ফ্রান্সের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

২০২৬ বিশ্বকাপের আগে ফ্রান্সকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নয় তারা ফেভারিট কি না; বরং প্রশ্ন হলো—এই দলকে থামাবে কে? এমবাপ্পের নেতৃত্ব, দেম্বেলের অভিজ্ঞতা, তরুণদের উত্থান এবং দেশমের ট্যাকটিক্যাল দক্ষতা—সব মিলিয়ে ফ্রান্স নিঃসন্দেহে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দলগুলোর একটি। যদি বড় ধরনের ইনজুরি সমস্যা না হয় এবং আক্রমণভাগ তাদের সেরা ফর্ম ধরে রাখতে পারে, তাহলে উত্তর আমেরিকার মাটিতে ফ্রান্সের প্রথম ও সবমিলিয়ে তৃতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা অত্যন্ত বাস্তব বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে আটলান্টিকের পশ্চিম পার থেকে মাত্র একবারই শিরোপা এসে পূর্ব পারে। দেখার বিষয় এবার জার্মানির পর ফ্রান্স কি দ্বিতীয় দেশ হতে পারবে যারা আটলান্টিকের পশ্চিম পার থেকে কাপ নিয়ে আসবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

লক ডাউন পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় ফ্রান্সে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি

যুক্তরাজ্যে করোনার মধ্যেই শিশুদের মাঝে নতুন রোগের হানা

বিশ্বকাপ ২০২৬: কেন আবারও শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার ফ্রান্স?

বিশ্বকাপ ২০২৬: কেন আবারও শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার ফ্রান্স?

আপডেট সময় ০১:২১:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ জুন ২০২৬

শামসুল ইসলাম : কয়েকদিন আগেও ছিল ফিফা রেংকিং এর শীর্ষ দল, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট। ২০১৮ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। গত এক দশকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ধারাবাহিকতার সবচেয়ে বড় প্রতীক ফ্রান্স। তাই যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিতব্য ২০২৬ ফিফা বিশ্বকপে ফ্রান্সকে আবারও অন্যতম হট ফেভারিট বলা মোটেও অতিরঞ্জন নয়।

কোচ দিদিয়ে দেশমের শিষ্যরা এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে, যেখানে অভিজ্ঞতা, তারুণ্য, স্কোয়াড ডেপথ, ট্যাকটিক্যাল ভারসাম্য এবং বড় মঞ্চে মানসিক দৃঢ়তা—সবকিছুই একসঙ্গে মিলেছে। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ ও স্কোয়াড ঘোষণার পর ফুটবল বিশ্বের বড় অংশই মনে করছে, উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিতব্য ২০২৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্স আবারও ফাইনালে ওঠার অন্যতম দাবিদার।

কেমন হলো ফ্রান্সের ঘোষিত দল:

কোচ দেশমের ঘোষিত স্কোয়াড বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, ফ্রান্স এবার আগের চেয়েও বেশি ভারসাম্যপূর্ণ, গতিময় এবং কৌশলগতভাবে পরিণত একটি দল। বলা হচ্ছে লে ব্লুজদের আক্রমণভাগ বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর!
বর্তমান বিশ্ব ফুটবলে ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় শক্তি নিঃসন্দেহে তাদের আক্রমণভাগ। অধিনায়ক কিলান এম্বাপে এখনও দলের প্রাণভোমরা। ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালে হ্যাটট্রিক করা এই সুপারস্টার এখন আরও পরিণত, আরও কার্যকর। ফরাসি দলের আক্রমণভাগে তার সঙ্গে আছেন সর্বশেষ ভেলন ডি’অর জেতা প্যারিস সেইন্ট জার্মান ফরোয়ার্ড ওসমান ডেম্বেলে, তরুণ তুর্কি মাইকেল ওলিজ,ডেসিরে দো এবং উদীয়মান প্রতিভা রায়ান চেরকি। এদের মধ্যে বিশেষ করে দেম্বেলের সাম্প্রতিক ফর্ম ফ্রান্সকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে। ফিফা ও বিভিন্ন ইউরোপীয় বিশ্লেষকদের মতে, ফরাসি আক্রমণভাগ এখন গতির সঙ্গে সৃজনশীলতার এক দুর্দান্ত সমন্বয়। বলা হচ্ছে দেশমের সম্ভাব্য আক্রমণাত্মক ফর্মেশন ৪-২-৩-১ এ এমবাপ্পে মূল স্ট্রাইকার হলেও অলিজ ও দেম্বেলের গতিময় উইং প্লে প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ক্রমাগত চাপে রাখবে।

এই দুই জনের রসায়নের উপর অনেকাংশে নির্ভর করছে এবারের ফ্রান্সের জয়রথ

মিডফিল্ড: শক্তি, গতি ও বল নিয়ন্ত্রণের নিখুঁত মিশ্রণ
বিশ্বকাপ জয়ের জন্য কেবল তারকা ফরোয়ার্ডই যথেষ্ট নয়; মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই জায়গায়ও ফ্রান্স অত্যন্ত সমৃদ্ধ। যদিও অনেক সমালোচক ফ্রান্সের দূর্বলতার যায়গা হিসাবে মিডফিল্ডকে নির্দেশ করছেন। আবার কারো কারো মতে ২০২৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে তাদের মিডফিল্ড। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এডোয়ার্ড কামাভিংগার অনুপস্থিতি। ইনজুরি ও ফিটনেস পরিস্থিতির কারণে তিনি বর্তমান দলে যায়গা পাননি। চ্যাম্পিয়নস লীগেও ছিলেন ম্রিয়মাণ। কিন্তু তবুও ফরাসি মাঝমাঠের গভীরতায় বড় কোনো ঘাটতি দেখা যাচ্ছে না। ট্রুয়েমেনি বর্তমানে দলের প্রধান ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। বল পুনরুদ্ধার, পজিশনিং এবং রক্ষণভাগকে সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কান্তে এখনও বড় ম্যাচের খেলোয়াড়। বয়স বাড়লেও তার ম্যাচ রিডিং এবং বল কেটে নেওয়ার দক্ষতা ফ্রান্সকে আলাদা সুবিধা দেয়। অন্যদিকে প্যারিস সেইন্ট জার্মান তারকা ওয়ারেন জায়ের এমেরি এবং এ এস রোমার মানু কনে ফরাসি ফুটবলের নতুন প্রজন্মের প্রতীক। তাদের গতি, এনার্জি ও প্রেসিং ক্ষমতা আধুনিক টুর্নামেন্ট ফুটবলে অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। ফ্রান্সের মিডফিল্ডের আরেকটি বড় সুবিধা হলো “বহুমুখিতা”। একই খেলোয়াড় ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী ডিফেন্সিভ বা আক্রমণাত্মক ভূমিকায় সহজেই মানিয়ে নিতে পারেন।

রক্ষণভাগ: আগের তুলনায় আরও পরিণত
২০২২ বিশ্বকাপে ইনজুরি ছিল ফ্রান্সের বড় সমস্যা। কিন্তু এবার পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো।
ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ জেতা আর্সেনাল ডিফেন্ডার ইউলিয়াম সালিভা এবং বায়ার্ন মিউনিখের ভরসা দায়ত উপামেকানো জুটি এখন ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী সেন্টার-ব্যাক কম্বিনেশন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফুল-ব্যাক পজিশনে আল হিলালের থিও হার্নান্দেজ ও লা লিগা চ্যাম্পিয়ন বার্সিলোনার জোলেস কন্ডে ফ্রান্সকে আক্রমণ ও রক্ষণ—দুই ক্ষেত্রেই বাড়তি সুবিধা দেবে।

সংক্ষেপে বলা যায় সালিবা বর্তমানে ইউরোপের সবচেয়ে স্থির ও পরিণত সেন্টার-ব্যাকদের একজন। উপামেকানোর শারীরিক শক্তি ও গতি ফ্রান্সকে হাই-লাইন ডিফেন্স খেলতে সাহায্য করে। কনাতে বাতাসে দুর্দান্ত, আর কোন্ডে আধুনিক আক্রমণাত্মক ফুল-ব্যাকের ভূমিকায় অত্যন্ত কার্যকর।
থেও হার্নান্দেজ ফ্রান্সের আক্রমণ তৈরির অন্যতম বড় অস্ত্র। বাম প্রান্ত দিয়ে তার দৌড় ও ওভারল্যাপিং প্রতিপক্ষের ডিফেন্সে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।

গোলপোস্টে মাইক মেইগ্নান বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম নির্ভরযোগ্য গোলরক্ষক হিসেবে বিবেচিত। তার বল ডিস্ট্রিবিউশন ও রিফ্লেক্স ফ্রান্সের বিল্ড-আপ ফুটবলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সবচেয়ে বড় শক্তি: স্কোয়াড ডেপথ
ফ্রান্সকে অন্য দলগুলোর চেয়ে আলাদা করে তাদের স্কোয়াড গভীরতা। তাদের “দ্বিতীয় সারির” খেলোয়াড়রাও অন্য যেকোনো দেশের মূল একাদশে সহজেই যায়গা করে নিতে পারে। বেঞ্চ থেকে নামতে পারেন এমন ফুটবলারদের অনেকেই অন্য দেশের প্রথম একাদশে অনায়াসে খেলতে পারতেন।
ফিফার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৬ স্কোয়াডে অভিজ্ঞতা ও তরুণ প্রতিভার দুর্দান্ত সমন্বয় রয়েছে।
এই গভীরতাই দীর্ঘ টুর্নামেন্টে ফ্রান্সকে বাড়তি সুবিধা দেবে। কারণ বিশ্বকাপ এখন ৪৮ দলের, ম্যাচও বেশি। ফলে রোটেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

ট্যাকটিক্যাল দিক: দিদিয়ের দেশমের শেষ অভিযান?
২০২৬ বিশ্বকাপের পর কোচ দিদিয়ে দেশম দায়িত্ব ছাড়তে পারেন—এমন আলোচনা ইউরোপীয় গণমাধ্যমে জোরালো। দেশমের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো টুর্নামেন্ট ম্যানেজমেন্ট। তিনি নান্দনিক ফুটবলের চেয়ে ফলাফলকে অগ্রাধিকার দেন। তার দল কখনও অতিরিক্ত ঝুঁকি নেয় না, আবার প্রয়োজন হলে মুহূর্তেই গতি বাড়িয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
২০১৮ সালে শিরোপা এবং ২০২২ সালে ফাইনাল—এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে, নকআউট ম্যাচে দেশমের কৌশল এখনও অত্যন্ত কার্যকর।

দুর্বলতার জায়গা কোথায়?
তবে ফ্রান্স একেবারে দুর্বলতাহীন নয়।
প্রথমত, দলের অনেক বড় তারকার ওপর নির্ভরতা এখনও বেশি। এমবাপ্পে বা দেম্বেলের কেউ ইনজুরিতে পড়লে আক্রমণভাগের ভারসাম্যে প্রভাব পড়তে পারে।
দ্বিতীয়ত, মাঝে মাঝে ফ্রান্সের রক্ষণে মনোযোগের ঘাটতি দেখা যায়, বিশেষ করে দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক সামলানোর ক্ষেত্রে।
তৃতীয়ত, গ্রুপ পর্বে সবকিছু ঠিকঠাক মতো এগুলে ফাইনালের পথে ফ্রান্সকে জার্মানি ,স্পেনের মতো সাবেক চ্যাম্পিয়নদের হারাতে হবে। এই স্কোয়াডগুলো শিরোপা জয়ের অন্যতম দাবিদার । বিশেষ করে স্পেনের সাম্প্রতিক পারফর্মেন্স ফ্রান্সের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

২০২৬ বিশ্বকাপের আগে ফ্রান্সকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নয় তারা ফেভারিট কি না; বরং প্রশ্ন হলো—এই দলকে থামাবে কে? এমবাপ্পের নেতৃত্ব, দেম্বেলের অভিজ্ঞতা, তরুণদের উত্থান এবং দেশমের ট্যাকটিক্যাল দক্ষতা—সব মিলিয়ে ফ্রান্স নিঃসন্দেহে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দলগুলোর একটি। যদি বড় ধরনের ইনজুরি সমস্যা না হয় এবং আক্রমণভাগ তাদের সেরা ফর্ম ধরে রাখতে পারে, তাহলে উত্তর আমেরিকার মাটিতে ফ্রান্সের প্রথম ও সবমিলিয়ে তৃতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা অত্যন্ত বাস্তব বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে আটলান্টিকের পশ্চিম পার থেকে মাত্র একবারই শিরোপা এসে পূর্ব পারে। দেখার বিষয় এবার জার্মানির পর ফ্রান্স কি দ্বিতীয় দেশ হতে পারবে যারা আটলান্টিকের পশ্চিম পার থেকে কাপ নিয়ে আসবে।