ঢাকা ০৩:১৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
মরক্কো-স্পেন সীমান্তে মহাবিপর্যয়! জালাবাদ এসোসিয়েশনের নির্বাচনে ডা: কামরুল হাসান সভাপতি এডভোকেট জসিম উদ্দিন সাধারণ সম্পাদক শক্তিশালী ভূমিকম্পে ইতালির নেপলসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সার্জিও গরের সাক্ষাৎ : তারেক রহমানের নেতৃত্বে পূর্ণ আস্থা যুক্তরাষ্ট্রের সেউতায় ঢোকা ৪৮ হাজার অভিবাসী ফিরল মরক্কোয়, নিহত ৫৭ মরক্কো সীমান্তে অভিবাসী নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৮ স্পেনকে ‘শেনজেন জোন’ থেকে বাদ দেওয়ার দাবি মেলোনির স্পেনে সমুদ্র সাঁতরে ঢুকে পড়েছে হাজারো অবৈধ অভিবাসী হেঁটে-বাসে ১৩ দেশ পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র শূন্যহাতে ফিরলেন ২৩ বাংলাদেশি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার পরবর্তী ম্যাচের সূচি প্রকাশ

মরক্কো-স্পেন সীমান্তে মহাবিপর্যয়!

  • আপডেট সময় ০২:৪০:৩৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬
  • ১৭ বার পড়া হয়েছে

দর্পণ ডেস্ক

স্পেনের ছিটমহল সেউটায় পাড়ি জমাতে গিয়ে ভয়াবহ এক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি প্রায় ৫০ হাজার মানুষ মরক্কো থেকে স্পেনের এই ভূখণ্ডে ঢোকার চেষ্টা করে। বিপজ্জনক এই যাত্রায় প্রাণ হারিয়েছেন এখন পর্যন্ত ৫৭ জন। কিন্তু হঠাৎ কেন এই পরিস্থিতি?

কী ঘটেছে এবং কোথায়?

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মরক্কো এবং স্পেনের ছোট্ট ভূখণ্ড সেউটার মধ্যবর্তী সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ে। এর সুযোগ নিয়ে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ বিশৃঙ্খল ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে স্পেনের অংশে প্রবেশ করে, যার জেরে ৫৭ জন মানুষের মৃত্যু হয়।

এই অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা সেউটার মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশের চেয়েও বেশি। শুক্রবার সেখানে চরম এক মানবিক সংকট তৈরি হয়। তবে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৩৭ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষকে সীমান্তের মরক্কো অংশে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং প্রতি ঘণ্টায় আরও শত শত মানুষকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

উত্তর আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল বরাবর ২৫০ মাইল পূর্বে অবস্থিত সেউটা এবং মেলিলা হলো স্পেনের দুটি ছিটমহল। আফ্রিকা মহাদেশের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একমাত্র স্থল সীমান্ত এটিই।

১৫৮০ সাল থেকে স্পেনের অধীনে থাকা সেউটায় খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের মিশ্র বাস। স্প্যানিশ ও মরক্কোর বাসিন্দা এবং দিনমজুররা এখানে বেশ মিলেমিশেই বসবাস করেন। তবে মরক্কো কখনোই সেউটা ও মেলিলাকে স্পেনের ভূখণ্ড হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি; বরং তারা এগুলোকে দখলকৃত ভূমি হিসেবেই উল্লেখ করে থাকে।

সেউটা কেন অভিবাসীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু?

উন্নত অর্থনৈতিক সুযোগের সন্ধানে কিংবা নিজ দেশে সহিংসতা থেকে বাঁচতে ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হলো স্পেন। মরক্কো এবং আফ্রিকার অন্যান্য অংশ থেকে স্পেনে পৌঁছানোর চেষ্টা করা মানুষদের মূল গন্তব্য হিসেবে সেউটা এবং মেলিলা অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তায় ঘেরা থাকে।

সেউটা বা মেলিলায় পৌঁছানো অনেক অভিবাসীকে তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো হয়। তবে অনেককে অভিবাসী আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়, যাতে তারা স্পেনে আশ্রয়ের (অ্যাসাইলাম) জন্য আবেদন করতে পারেন। সেউটায় পৌঁছাতে অভিবাসীরা প্রায়ই মরক্কোর ফিনাইদেক শহর থেকে প্রায় ৩ মাইল (৫ কিলোমিটার) সাঁতার কাটেন। অনেকেই আবার নিকটবর্তী বেলিউনেচ শহর থেকে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করেন।

২০২২ সালে মরক্কো থেকে মেলিলায় প্রবেশের চেষ্টাকালে সাব-সাহারান আফ্রিকার প্রায় ২ হাজার মানুষের মধ্যে ২৩ জন নিহত হন। এর আগে ২০১৪ সালে প্রায় ২০০ মানুষ সীমান্ত বেড়া টপকে বা সাগরের ব্রেকওয়াটার সাঁতরে পার হওয়ার সময় অন্তত ১৪ জনের মৃত্যু হয়। তবে স্পেনের ক্যানারি এবং ব্যালেরিক দ্বীপপুঞ্জ হয়ে পৌঁছানো অভিবাসীদের তুলনায় সেউটা এবং মেলিলায় আগত অভিবাসীর সংখ্যা সাধারণত অনেক কম।

সাম্প্রতিক দশকগুলোতে স্পেনে অভিবাসী জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ৫ কোটি মানুষের এই দেশে প্রায় ১ কোটি মানুষই ভিনদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন। এদের অনেকেই কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা এবং মরক্কো থেকে এসেছেন এবং স্পেনের কৃষি, পর্যটন ও সেবা খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে কাজ করছেন।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ আশ্রয়ের সন্ধানে উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো এবং তুরস্ক থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে আসছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে ভূমধ্যসাগরে ৩৫ হাজার ১৫৩ জন অভিবাসীর মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসেই ১ হাজার ৪৯৩ জন মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন।

এত বিপুলসংখ্যক মানুষ কীভাবে সীমান্ত পার হলো?

বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি। মরক্কো কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি এবং অনুপ্রবেশ ঠেকাতে তারা কতটা কঠোর ছিল, সেটিও পরিষ্কার নয়। তবে এই গণ-অনুপ্রবেশের সঙ্গে মরক্কো ও আলজেরিয়ার মধ্যকার দ্বন্দ্ব এবং সম্প্রতি স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের আলজিয়ার্স সফরের একটা যোগসূত্র থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এর আগে, ২০২১ সালের মে মাসে সর্বশেষ এমন গণ-অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছিল। সেবার পশ্চিম সাহারার স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতাকে (পোলিসারিও ফ্রন্ট) স্পেনে কোভিড-১৯ চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় স্পেনের সঙ্গে মরক্কোর কূটনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়। এর জেরেই সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেছিল মরক্কো। পশ্চিম সাহারার মালিকানা নিয়ে মরক্কো এবং পোলিসারিও ফ্রন্ট—উভয়ই দাবি করে আসছে।

২০২২ সালে মাদ্রিদ তাদের দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষতার নীতি থেকে সরে এসে পশ্চিম সাহারা নিয়ে মরক্কোর পরিকল্পনাকে সমর্থন জানালে সেই কূটনৈতিক সংকটের অবসান ঘটে। তবে এর ফলে আলজিয়ার্সের সঙ্গে মাদ্রিদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে, কারণ আলজিয়ার্স পোলিসারিও গ্রুপকে সমর্থন করে। গত ২০ জুলাই আলজিয়ার্স সফর করেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী সানচেজ। গত চার বছরের মধ্যে স্পেনের কোনো সরকারপ্রধানের এটিই প্রথম আলজিয়ার্স সফর, যা আলজেরিয়ার সঙ্গে স্পেনের সম্পর্কের বরফ গলার ইঙ্গিত দেয়।

শুক্রবার সেউটা থেকে দেওয়া এক বক্তব্যে সানচেজ এই আকস্মিক অনুপ্রবেশের জন্য মানবপাচারকারীদের দায়ী করেন। তিনি দাবি করেন, সম্প্রতি স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের এক রায়কে কেন্দ্র করে পাচারকারীরা গুজব ছড়িয়েছে যে সমুদ্রপথে আসা অবৈধ অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না।

তবে ইতালিয়ান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিকাল স্টাডিজের অভিবাসন বিষয়ক গবেষক মাত্তেও ভিলার মতে, এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য জড়িত। তিনি বলেন, গতকাল যা ঘটেছে, তা মূলত ২০২১ সালের ঘটনারই একটি বড় সংস্করণ। রাতারাতি ৫০ হাজার মানুষ এমনি এমনি চলে আসে না, যেখানে সাধারণত প্রতি মাসে কয়েক শ মানুষ আসে। সানচেজের আলজেরিয়া সফরটা মরক্কো ভালোভাবে নেয়নি।

ভিলা আরও ইঙ্গিত দেন যে, নিজেদের ‘ক্ষমতার দাপট’ দেখাতে মরক্কো সম্ভবত সীমান্ত শিথিল করে দিয়েছে। কারণ তারা জানে, এর ফলে ইউরোপে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে।

সরকার ও কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া কী?

এই অনুপ্রবেশের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্পেন তাদের সশস্ত্র বাহিনী ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করেছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী সানচেজ এই ঘটনাকে স্পেনের আঞ্চলিক অখণ্ডতার চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন।

সীমান্তের এই বিশৃঙ্খলার ছবি ও ভিডিও স্প্যানিশ সরকারের জন্য এক নতুন সংকট তৈরি করেছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ভেতরেও বিভাজন সৃষ্টি করেছে। ইইউ-এর ডানপন্থি রাজনীতিকরা এই ঘটনার জন্য স্পেনের এ বছরের লাখ লাখ অনিয়মিত অভিবাসীকে বৈধতা দেওয়ার নীতিকেই দায়ী করছেন।

ইতালির কট্টর ডানপন্থি সরকার তো স্পেনকে শেনজেন (মুক্ত-চলাচল অঞ্চল) থেকে সাময়িক বরখাস্ত করার দাবি তুলেছে, যদিও সেউটা এবং মেলিলা স্বাভাবিকভাবে শেনজেন চুক্তির আওতাভুক্ত নয়। অন্যদিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে ফ্রান্সও স্পেনের সঙ্গে তাদের সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করেছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

লক ডাউন পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় ফ্রান্সে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি

যুক্তরাজ্যে করোনার মধ্যেই শিশুদের মাঝে নতুন রোগের হানা

মরক্কো-স্পেন সীমান্তে মহাবিপর্যয়!

মরক্কো-স্পেন সীমান্তে মহাবিপর্যয়!

আপডেট সময় ০২:৪০:৩৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬

দর্পণ ডেস্ক

স্পেনের ছিটমহল সেউটায় পাড়ি জমাতে গিয়ে ভয়াবহ এক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি প্রায় ৫০ হাজার মানুষ মরক্কো থেকে স্পেনের এই ভূখণ্ডে ঢোকার চেষ্টা করে। বিপজ্জনক এই যাত্রায় প্রাণ হারিয়েছেন এখন পর্যন্ত ৫৭ জন। কিন্তু হঠাৎ কেন এই পরিস্থিতি?

কী ঘটেছে এবং কোথায়?

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মরক্কো এবং স্পেনের ছোট্ট ভূখণ্ড সেউটার মধ্যবর্তী সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ে। এর সুযোগ নিয়ে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ বিশৃঙ্খল ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে স্পেনের অংশে প্রবেশ করে, যার জেরে ৫৭ জন মানুষের মৃত্যু হয়।

এই অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা সেউটার মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশের চেয়েও বেশি। শুক্রবার সেখানে চরম এক মানবিক সংকট তৈরি হয়। তবে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৩৭ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষকে সীমান্তের মরক্কো অংশে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং প্রতি ঘণ্টায় আরও শত শত মানুষকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

উত্তর আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল বরাবর ২৫০ মাইল পূর্বে অবস্থিত সেউটা এবং মেলিলা হলো স্পেনের দুটি ছিটমহল। আফ্রিকা মহাদেশের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একমাত্র স্থল সীমান্ত এটিই।

১৫৮০ সাল থেকে স্পেনের অধীনে থাকা সেউটায় খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের মিশ্র বাস। স্প্যানিশ ও মরক্কোর বাসিন্দা এবং দিনমজুররা এখানে বেশ মিলেমিশেই বসবাস করেন। তবে মরক্কো কখনোই সেউটা ও মেলিলাকে স্পেনের ভূখণ্ড হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি; বরং তারা এগুলোকে দখলকৃত ভূমি হিসেবেই উল্লেখ করে থাকে।

সেউটা কেন অভিবাসীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু?

উন্নত অর্থনৈতিক সুযোগের সন্ধানে কিংবা নিজ দেশে সহিংসতা থেকে বাঁচতে ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হলো স্পেন। মরক্কো এবং আফ্রিকার অন্যান্য অংশ থেকে স্পেনে পৌঁছানোর চেষ্টা করা মানুষদের মূল গন্তব্য হিসেবে সেউটা এবং মেলিলা অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তায় ঘেরা থাকে।

সেউটা বা মেলিলায় পৌঁছানো অনেক অভিবাসীকে তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো হয়। তবে অনেককে অভিবাসী আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়, যাতে তারা স্পেনে আশ্রয়ের (অ্যাসাইলাম) জন্য আবেদন করতে পারেন। সেউটায় পৌঁছাতে অভিবাসীরা প্রায়ই মরক্কোর ফিনাইদেক শহর থেকে প্রায় ৩ মাইল (৫ কিলোমিটার) সাঁতার কাটেন। অনেকেই আবার নিকটবর্তী বেলিউনেচ শহর থেকে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করেন।

২০২২ সালে মরক্কো থেকে মেলিলায় প্রবেশের চেষ্টাকালে সাব-সাহারান আফ্রিকার প্রায় ২ হাজার মানুষের মধ্যে ২৩ জন নিহত হন। এর আগে ২০১৪ সালে প্রায় ২০০ মানুষ সীমান্ত বেড়া টপকে বা সাগরের ব্রেকওয়াটার সাঁতরে পার হওয়ার সময় অন্তত ১৪ জনের মৃত্যু হয়। তবে স্পেনের ক্যানারি এবং ব্যালেরিক দ্বীপপুঞ্জ হয়ে পৌঁছানো অভিবাসীদের তুলনায় সেউটা এবং মেলিলায় আগত অভিবাসীর সংখ্যা সাধারণত অনেক কম।

সাম্প্রতিক দশকগুলোতে স্পেনে অভিবাসী জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ৫ কোটি মানুষের এই দেশে প্রায় ১ কোটি মানুষই ভিনদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন। এদের অনেকেই কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা এবং মরক্কো থেকে এসেছেন এবং স্পেনের কৃষি, পর্যটন ও সেবা খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে কাজ করছেন।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ আশ্রয়ের সন্ধানে উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো এবং তুরস্ক থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে আসছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে ভূমধ্যসাগরে ৩৫ হাজার ১৫৩ জন অভিবাসীর মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসেই ১ হাজার ৪৯৩ জন মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন।

এত বিপুলসংখ্যক মানুষ কীভাবে সীমান্ত পার হলো?

বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি। মরক্কো কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি এবং অনুপ্রবেশ ঠেকাতে তারা কতটা কঠোর ছিল, সেটিও পরিষ্কার নয়। তবে এই গণ-অনুপ্রবেশের সঙ্গে মরক্কো ও আলজেরিয়ার মধ্যকার দ্বন্দ্ব এবং সম্প্রতি স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের আলজিয়ার্স সফরের একটা যোগসূত্র থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এর আগে, ২০২১ সালের মে মাসে সর্বশেষ এমন গণ-অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছিল। সেবার পশ্চিম সাহারার স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতাকে (পোলিসারিও ফ্রন্ট) স্পেনে কোভিড-১৯ চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় স্পেনের সঙ্গে মরক্কোর কূটনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়। এর জেরেই সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেছিল মরক্কো। পশ্চিম সাহারার মালিকানা নিয়ে মরক্কো এবং পোলিসারিও ফ্রন্ট—উভয়ই দাবি করে আসছে।

২০২২ সালে মাদ্রিদ তাদের দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষতার নীতি থেকে সরে এসে পশ্চিম সাহারা নিয়ে মরক্কোর পরিকল্পনাকে সমর্থন জানালে সেই কূটনৈতিক সংকটের অবসান ঘটে। তবে এর ফলে আলজিয়ার্সের সঙ্গে মাদ্রিদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে, কারণ আলজিয়ার্স পোলিসারিও গ্রুপকে সমর্থন করে। গত ২০ জুলাই আলজিয়ার্স সফর করেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী সানচেজ। গত চার বছরের মধ্যে স্পেনের কোনো সরকারপ্রধানের এটিই প্রথম আলজিয়ার্স সফর, যা আলজেরিয়ার সঙ্গে স্পেনের সম্পর্কের বরফ গলার ইঙ্গিত দেয়।

শুক্রবার সেউটা থেকে দেওয়া এক বক্তব্যে সানচেজ এই আকস্মিক অনুপ্রবেশের জন্য মানবপাচারকারীদের দায়ী করেন। তিনি দাবি করেন, সম্প্রতি স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের এক রায়কে কেন্দ্র করে পাচারকারীরা গুজব ছড়িয়েছে যে সমুদ্রপথে আসা অবৈধ অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না।

তবে ইতালিয়ান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিকাল স্টাডিজের অভিবাসন বিষয়ক গবেষক মাত্তেও ভিলার মতে, এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য জড়িত। তিনি বলেন, গতকাল যা ঘটেছে, তা মূলত ২০২১ সালের ঘটনারই একটি বড় সংস্করণ। রাতারাতি ৫০ হাজার মানুষ এমনি এমনি চলে আসে না, যেখানে সাধারণত প্রতি মাসে কয়েক শ মানুষ আসে। সানচেজের আলজেরিয়া সফরটা মরক্কো ভালোভাবে নেয়নি।

ভিলা আরও ইঙ্গিত দেন যে, নিজেদের ‘ক্ষমতার দাপট’ দেখাতে মরক্কো সম্ভবত সীমান্ত শিথিল করে দিয়েছে। কারণ তারা জানে, এর ফলে ইউরোপে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে।

সরকার ও কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া কী?

এই অনুপ্রবেশের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্পেন তাদের সশস্ত্র বাহিনী ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করেছে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী সানচেজ এই ঘটনাকে স্পেনের আঞ্চলিক অখণ্ডতার চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন।

সীমান্তের এই বিশৃঙ্খলার ছবি ও ভিডিও স্প্যানিশ সরকারের জন্য এক নতুন সংকট তৈরি করেছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ভেতরেও বিভাজন সৃষ্টি করেছে। ইইউ-এর ডানপন্থি রাজনীতিকরা এই ঘটনার জন্য স্পেনের এ বছরের লাখ লাখ অনিয়মিত অভিবাসীকে বৈধতা দেওয়ার নীতিকেই দায়ী করছেন।

ইতালির কট্টর ডানপন্থি সরকার তো স্পেনকে শেনজেন (মুক্ত-চলাচল অঞ্চল) থেকে সাময়িক বরখাস্ত করার দাবি তুলেছে, যদিও সেউটা এবং মেলিলা স্বাভাবিকভাবে শেনজেন চুক্তির আওতাভুক্ত নয়। অন্যদিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে ফ্রান্সও স্পেনের সঙ্গে তাদের সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করেছে।