ড. মাহরুফ চৌধুরী
প্রবাসীদের কাছে বাংলাদেশ কেবল একটি রাষ্ট্র নয়; এটি তাঁদের আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁদের চিন্তা-চেতনা, আবেগ-অনুভূতি, ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা-স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বড় একটি অংশজুড়ে থাকে প্রিয় স্বদেশ। বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে যখন তাঁরা বাংলা ভাষায় কথা বলেন, সন্তানের কাছে বাংলাদেশের গল্প বলেন, জাতীয় দিবসগুলো পালন করেন; কিংবা দেশের খবর অনুসরণ করেন, তখন প্রকৃতপক্ষে তাঁরা তাঁদের অস্তিত্বের একটি অংশকে দৈনন্দিন জীবনচর্চায় বাঁচিয়ে রাখেন। নাড়ির এই অদৃশ্য সংযোগই প্রবাসীদের স্বদেশচেতনাকে জীবন্ত রাখে। তাই দেশের সংকট তাঁদের হৃদয়কে নাড়া দেয়, আর জাতীয় অর্জন তাঁদের গর্বিত করে। দেশের মানুষ যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তখন প্রবাসীরাও মানসিকভাবে সেই সংগ্রামের অংশ হয়ে ওঠেন। ঐতিহাসিক সত্যের অংশ হিসেবে চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের সময়ও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।
স্বদেশচেতনার পাশাপাশি প্রবাসীদের উদ্বেগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো দেশে রেখে আসা আপনজনদের কল্যাণচিন্তা ও স্বদেশের প্রতি গভীর টান। পৃথিবীর যেখানেই তাঁরা থাকুন না কেন, তাঁদের ধ্যানজ্ঞান জুড়ে থাকে বাবা-মা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং ফেলে আসা জীবনের অসংখ্য দূর-অতীত ও নিকট-অতীতের স্মৃতি। দূরদেশে অবস্থান করলেও প্রতিদিন তাঁদের মন পড়ে থাকে দেশের খোঁজখবরে। কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা সামাজিক সংকট দেখা দিলে প্রথমেই তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগে, ‘আমার আপনজনেরা কেমন আছে?’ চব্বিশের জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সময় এই উদ্বেগ বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত, সহিংসতা, দমনপীড়ন এবং অনিশ্চয়তার খবর তাঁদের উৎকণ্ঠিত করে তুলেছিল। উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় অনেকেই রাত জেগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ করেছেন, ফোনে পরিবারের খোঁজ নিয়েছেন, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং তাঁদের নিরাপত্তার সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রেখেছেন। কেউ বারবার একই নম্বরে ফোন করেছেন, কেউ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পরিচিতজনদের খুঁজেছেন, কেউ আবার সামান্য একটি বার্তার অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছেন। প্রবাসীদের এই মানসিক অবস্থাকে কেবল রাজনৈতিক উদ্বেগ বলে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে; এটি ছিল স্বজন, স্বজাতি এবং স্বদেশের প্রতি গভীর আবেগ, দায়িত্ববোধ ও মানবিক সংযোগের বহিঃপ্রকাশ।
চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের দিনগুলোতে প্রবাসীদের জন্য সবচেয়ে বিভীষিকাময় মুহূর্ত ছিল যখন স্বৈরাচারী সরকার বাংলাদেশে ইন্টারনেট সংযোগ কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল। আধুনিক বিশ্বে ইন্টারনেট কেবল একটি প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামোগত সুযোগসুবিধা কিংবা উপযোগিতা নয়; এটি প্রবাসীদের জন্য স্বদেশের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান সেতুবন্ধ। প্রতিদিনের ফোনকল, ভিডিও আলাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা কিংবা সংবাদপত্রের অনলাইন সংস্করণ- সব মিলিয়ে নানা মাধ্যমে প্রবাসীরা তাঁদের দেশকে কাছে অনুভব করেন। সেই সেতুবন্ধ যখন হঠাৎ ভেঙে পড়ে, তখন দূরত্বের বাস্তবতা নির্মমভাবে সামনে এসে দাঁড়ায়, নিজেদের ভাবতে হয় ভিনগ্রহের বাসিন্দা। ১৯ জুলাই ২০২৪-এর সেই যোগাযোগবিচ্ছিন্নতার মুহূর্তে অসংখ্য প্রবাসীর কাছে মনে হয়েছিল যেন বাংলাদেশ হঠাৎ করেই পৃথিবীর মানচিত্র থেকে আড়াল হয়ে গেছে।
রাষ্ট্র যখন তথ্যপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ বন্ধ করে দেয়, তখন মানুষের কল্পনা ও আশঙ্কা বাস্তবতার চেয়েও দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, তথ্যের অভাব প্রায়ই মানুষের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। কারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ভয় পায় সেই অজানাকে, যার সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য ও ধারণা পাওয়া যায় না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসরত অসংখ্য বাংলাদেশির কাছে সেই দিনগুলো ছিল অসহায়ত্ব, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং মানসিক যন্ত্রণার এক দীর্ঘ অধ্যায়। অনেক প্রবাসী রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটিয়েছেন। কর্মস্থলে থেকেও কাজে মনোযোগ দিতে পারেননি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে বসেও মন পড়ে ছিল বাংলাদেশের অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে। দেশে বাবা-মা, ভাইবোন, সন্তানসন্তুতি, আত্মীয়স্বজন কিংবা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো সুযোগ না থাকায় তাঁদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটছিল অনিশ্চয়তার মধ্যে। কোনো অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলে মনে হতো হয়তো দেশের কারও খবর পাওয়া যাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামান্য কোনো তথ্যের সন্ধানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিয়েছেন অনেকে। কিন্তু তথ্যের চেয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, ভয়তাড়িত অস্থিরতা এবং অনিশ্চয়তার ভারই তখন ছিল বেশি। আমি নিজেও সত্যিকার অর্থে সেই জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে কোনো কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারিনি। প্রবাস জীবনের ব্যস্ততা, পেশাগত দায়িত্ব কিংবা ব্যক্তিগত কাজ- সবই যেন অর্থহীন মনে হচ্ছিল। সারাক্ষণ মনে হতো, দেশে কী হচ্ছে? আমাদের আত্মীয়স্বজন কেমন আছে? পরিচিতজনদের কেউ বিপদে পড়েছে কি না? নানাভাবে মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বহু প্রবাসী আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বাংলাদেশের সর্বশেষ সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার জন্য। কেউ তাঁদের পরিবারের খোঁজ জানতে চেয়েছেন, কেউ বন্ধুদের খবর জানতে চেয়েছেন, আবার কেউ কেবল নিশ্চিত হতে চেয়েছেন যে তাঁদের প্রিয় মানুষগুলো এখনো নিরাপদ আছেন।
প্রবাসীদের জীবনে হয়তো অনেক স্মৃতি আসে-যায়, কিন্তু দেশের সঙ্গে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার জুলাইয়ের সেই মুহূর্তগুলো তাঁরা কোনো দিন ভুলতে পারবেন না। তখন ভৌগোলিক দূরত্ব যেন হঠাৎ করেই বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল। প্রবাসীরা নতুন করে উপলব্ধি করেছিলেন যে দূরে থাকলেও তাঁদের হৃদয়, চিন্তা এবং অস্তিত্বের একটি বড় অংশ বাংলাদেশের সঙ্গেই বাঁধা। স্বদেশের সংকট তখন তাঁদের ব্যক্তিগত সংকটে পরিণত হয়েছিল। সেই ঘুমহীন রাতগুলো, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কাটানো দীর্ঘ প্রহরগুলো এবং একটি ফোনকলের অপেক্ষায় থাকা অসংখ্য মানুষের মুখ আজ চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের ইতিহাসের এক নীরব কিন্তু গভীর মানবিক দলিল হয়ে আছে। প্রবাসীদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা। দেশের লাখো পরিবার প্রবাসীদের উপার্জনের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। পরিবারপরিজনের শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, ব্যবসা কিংবা দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় নির্বাহে প্রবাসীদের অবদান অপরিসীম। তাঁরা কেবল অর্থ পাঠান না; দেশের সুখদুঃখ, উন্নয়ন ও সংকটের অর্থনৈতিক দায়ভারও বহন করেন।
চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানে প্রবাসীরাফলে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তাঁদের জন্য কেবল একটি সংবাদ নয়; বরং তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীরা দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছেন। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স শুধু পরিবারের জীবনমান উন্নত করে না; জাতীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। ফলে প্রবাসীরা যখন দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হন, তখন সেই উদ্বেগের সঙ্গে অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকে। তাঁরা জানেন, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন কেবল দেশের মানুষের জন্যই নয়; তাঁদের নিজেদের পরিবার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপরে তুলে ধরা এই তিনটি বাস্তবতা তথা স্বদেশচেতনা, আপনজনের প্রতি আবেগগত বন্ধন এবং অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা- চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের সময় প্রবাসীদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। ফলে তাঁরা কেবল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাননি; বরং নানা পন্থায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণও করেছেন এই নাগরিক অধিকার আদায়ের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সংগ্রামে। ভৌগোলিক দূরত্ব তাঁদের শারীরিক উপস্থিতিকে সীমিত করতে পেরেছিল, কিন্তু তাঁদের চিন্তাভাবনা, গণদাবির পক্ষে অবস্থান এবং স্বৈরাচারী সরকারবিরোধী কর্মতৎপরতাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে দূর থেকে পরিস্থিতিকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ তাঁদের আন্দোলনের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন এবং বৈশ্বিক যোগাযোগব্যবস্থাকে কাজে লাগানোর বিশেষ সক্ষমতা দিয়েছে। ফলে চব্বিশের গণ অভ্যুত্থান কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নাগরিকদের আন্দোলন ছিল না; এটি ধীরে ধীরে একটি বৈশ্বিক বাংলাদেশি চেতনারও বহিঃপ্রকাশে পরিণত হয়েছিল, যার সক্রিয় অংশীদার ছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

গণ অভ্যুত্থানে প্রবাসীদের সবচেয়ে দৃশ্যমান ভূমিকা ছিল তথ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় তথ্য কেবল সংবাদ নয়; এটি ক্ষমতা, প্রতিরোধ এবং জনমত গঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, যখন কোনো রাষ্ট্র তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, তখন বিকল্প তথ্যব্যবস্থা সামাজিক প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারে পরিণত হয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যখন তথ্যপ্রবাহ নানা সীমাবদ্ধতা, বিভ্রান্তি এবং নিয়ন্ত্রণের মুখে পড়েছিল, তখন প্রবাসীরা বিকল্প তথ্যপ্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ওয়েবিনার, লাইভ আলোচনা, ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তাঁরা দেশের পরিস্থিতি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাওয়া খণ্ডিত তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা, ভিডিওচিত্র, আলোকচিত্র এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রচারে অনেক প্রবাসী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একই সঙ্গে দেশের ভিতরের আন্দোলনকারী, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মধ্যে একটি কার্যকর যোগাযোগ-সেতু তৈরি হয়।
প্রবাসীদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল অর্থনৈতিক সহযোগিতা। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী, আহত ব্যক্তি, নিহত ব্যক্তিদের পরিবার এবং সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে বহু প্রবাসী ব্যক্তি ও সংগঠন আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছেন। বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা নিজ নিজ উদ্যোগে তহবিল সংগ্রহ করেছেন, সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন এবং সংকটাপন্ন পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন। মানবিক সহায়তার এই প্রবণতা কেবল রাজনৈতিক অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; বরং এটি ছিল জাতীয় সংহতি এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের একটি শক্তিশালী প্রকাশ। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মধ্যে রেমিট্যান্স প্রবাহ সাময়িকভাবে স্থগিত বা সীমিত করার আহ্বানও দেখা যায়, যা সরকারের প্রতি এক ধরনের প্রতীকী এবং অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। প্রবাসীদের একটি অংশ মনে করেছিল, রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তাঁদের অবস্থান প্রকাশের অধিকার রয়েছে।
প্রবাসীদের এই ভূমিকা অবশ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ও প্রবাসীরা আন্তর্জাতিক জনমত গঠন, অর্থনৈতিক সহায়তা এবং কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। লন্ডন, নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন শহরে তখনকার প্রবাসী বাংলাদেশিরা যে জনমত-সংগ্রাম পরিচালনা করেছিলেন, তা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি স্বীকৃত অধ্যায়। ইতিহাসের সেই ধারাবাহিকতারই আধুনিক রূপ আমরা চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানে প্রত্যক্ষ করেছি। পার্থক্য শুধু এই যে আজকের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে প্রবাসীদের প্রভাব বিস্তারের পরিধি, গতি এবং কার্যকারিতা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। চব্বিশের অভিজ্ঞতা আমাদের নতুন করে উপলব্ধি করিয়েছে যে প্রবাসীদের ভূমিকা কেবল রেমিট্যান্স পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের উন্নয়ন-আলোচনায় প্রবাসীদের অবদানকে প্রায়শই অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো, তাঁরা দেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাঁরা রাষ্ট্রকে কেবল একটি সরকার বা রাজনৈতিক দলের সমার্থক হিসেবে দেখেন না; বরং একটি বৃহত্তর জাতীয় চুক্তি, নাগরিক অধিকার এবং সম্মিলিত ভবিষ্যতের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করেন। তাই রাষ্ট্র যখন সংকটে পড়ে, তখন তাঁদের উদ্বেগও নাগরিক দায়িত্ববোধের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ হয়ে ওঠে।
♦ লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য











