ঢাকা ০১:০৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পরিমিতির প্রকোষ্ঠে নির্বাসিত অরণ্য – মেশকাতুন নাহার

  • আপডেট সময় ১২:৩১:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬
  • ১১২ বার পড়া হয়েছে
আমি তখনো মহীরুহের স্বপ্নে উন্মুখ—
মৃত্তিকার অতল গর্ভে শিকড় প্রোথিত করে
অস্তিত্বকে স্থিতির দর্শনে স্থাপন করতে চাইতাম;
প্রখর রৌদ্রে দণ্ডায়মান থেকে
ঝঞ্ঝার সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে,
পাতার অন্তঃস্রোতে নিজস্ব ভাষ্যের লিপি উৎকীর্ণ করতে।
কিন্তু আমাকে প্রতিস্থাপিত করা হলো এক অলঙ্কৃত সীমানায়—
টবের সুশৃঙ্খল আবদ্ধতায়;
পরিমিত জল,
পরিমিত আলোক,
পরিমিত আকাঙ্ক্ষা—
যেন জীবনও একটি মাপজোখের প্রকল্প।
অদৃশ্য কাঁচির শীতল নিষ্ঠুরতায়
আমার শিকড়সমূহ ছেদন করা হলো নিঃশব্দে;
শাখাপল্লব কেটে দেওয়া হলো শৃঙ্খলার সুমধুর অজুহাতে।
তারা বলেছিল—
“সংকোচই শোভন,
সীমারেখাই সৌন্দর্য,
বিস্তারের স্পর্ধা অশোভন।”
ক্রমাগত নীরবতার অনুশীলনে
আমি রূপান্তরিত হলাম—
অরণ্যের অসীম সম্ভাবনা থেকে
কারুকার্য-নির্মিত এক সুশৃঙ্খল বনসাইয়ে;
বাহ্যিক পূর্ণতায় পরিপাটি,
অন্তর্গত বিস্তারে রুদ্ধ।
আমার উচ্চতা আর নক্ষত্রস্পর্শী নয়,
আমার ছায়া আর কারও ক্লান্তি আশ্রয় দেয় না;
বৃদ্ধির দিগন্তকে নান্দনিকতার নামে
কেউ একদিন পরিকল্পিতভাবে নির্বাসিত করেছে।
তবু এই অবরুদ্ধতার দায়
শুধু আমার নীরবতার উপর ন্যস্ত নয়—
দায় তাদেরও,
যারা শিষ্টতার কাঁটাতারে আমার কণ্ঠ পরিবেষ্টিত করেছিল;
যারা উচ্চারণকে অবাধ্যতা ঘোষণা করে বলেছিল—
“তোমার ক্ষুদ্রতাই তোমার গৌরব।”
আজ আমি অভিযোজিত—
নিস্তব্ধতার অভ্যাসে অর্জিত হয়েছে এক প্রকার স্থৈর্য,
এক প্রকার শূন্য-সমাহিত প্রশান্তি;
যেন আত্মসমর্পণও এক দার্শনিক অবস্থান।
তবু নিশীথের গভীর স্তব্ধতায়,
শুকনো পাতার ক্ষীণ ঘর্ষণে শুনতে পাই—
আমার অন্তঃকরণে এখনো এক সুপ্ত অরণ্য স্পন্দিত।
সে অরণ্য অবগত—
বনসাইয়েরও জিনগত স্মৃতিতে
মহীরুহের বীজ সুপ্ত থাকে;
স্বপ্নের অন্তত ভূগোলে
সে একদিন পূর্ণ বৃক্ষে পরিণত হবেই।
ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

লক ডাউন পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় ফ্রান্সে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি

যুক্তরাজ্যে করোনার মধ্যেই শিশুদের মাঝে নতুন রোগের হানা

মেসির বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা

পরিমিতির প্রকোষ্ঠে নির্বাসিত অরণ্য – মেশকাতুন নাহার

আপডেট সময় ১২:৩১:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬
আমি তখনো মহীরুহের স্বপ্নে উন্মুখ—
মৃত্তিকার অতল গর্ভে শিকড় প্রোথিত করে
অস্তিত্বকে স্থিতির দর্শনে স্থাপন করতে চাইতাম;
প্রখর রৌদ্রে দণ্ডায়মান থেকে
ঝঞ্ঝার সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে,
পাতার অন্তঃস্রোতে নিজস্ব ভাষ্যের লিপি উৎকীর্ণ করতে।
কিন্তু আমাকে প্রতিস্থাপিত করা হলো এক অলঙ্কৃত সীমানায়—
টবের সুশৃঙ্খল আবদ্ধতায়;
পরিমিত জল,
পরিমিত আলোক,
পরিমিত আকাঙ্ক্ষা—
যেন জীবনও একটি মাপজোখের প্রকল্প।
অদৃশ্য কাঁচির শীতল নিষ্ঠুরতায়
আমার শিকড়সমূহ ছেদন করা হলো নিঃশব্দে;
শাখাপল্লব কেটে দেওয়া হলো শৃঙ্খলার সুমধুর অজুহাতে।
তারা বলেছিল—
“সংকোচই শোভন,
সীমারেখাই সৌন্দর্য,
বিস্তারের স্পর্ধা অশোভন।”
ক্রমাগত নীরবতার অনুশীলনে
আমি রূপান্তরিত হলাম—
অরণ্যের অসীম সম্ভাবনা থেকে
কারুকার্য-নির্মিত এক সুশৃঙ্খল বনসাইয়ে;
বাহ্যিক পূর্ণতায় পরিপাটি,
অন্তর্গত বিস্তারে রুদ্ধ।
আমার উচ্চতা আর নক্ষত্রস্পর্শী নয়,
আমার ছায়া আর কারও ক্লান্তি আশ্রয় দেয় না;
বৃদ্ধির দিগন্তকে নান্দনিকতার নামে
কেউ একদিন পরিকল্পিতভাবে নির্বাসিত করেছে।
তবু এই অবরুদ্ধতার দায়
শুধু আমার নীরবতার উপর ন্যস্ত নয়—
দায় তাদেরও,
যারা শিষ্টতার কাঁটাতারে আমার কণ্ঠ পরিবেষ্টিত করেছিল;
যারা উচ্চারণকে অবাধ্যতা ঘোষণা করে বলেছিল—
“তোমার ক্ষুদ্রতাই তোমার গৌরব।”
আজ আমি অভিযোজিত—
নিস্তব্ধতার অভ্যাসে অর্জিত হয়েছে এক প্রকার স্থৈর্য,
এক প্রকার শূন্য-সমাহিত প্রশান্তি;
যেন আত্মসমর্পণও এক দার্শনিক অবস্থান।
তবু নিশীথের গভীর স্তব্ধতায়,
শুকনো পাতার ক্ষীণ ঘর্ষণে শুনতে পাই—
আমার অন্তঃকরণে এখনো এক সুপ্ত অরণ্য স্পন্দিত।
সে অরণ্য অবগত—
বনসাইয়েরও জিনগত স্মৃতিতে
মহীরুহের বীজ সুপ্ত থাকে;
স্বপ্নের অন্তত ভূগোলে
সে একদিন পূর্ণ বৃক্ষে পরিণত হবেই।