ঢাকা ১১:৪৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অজ্ঞতার উত্তরাধিকার ভেঙে জ্ঞানের আলোকযাত্রা

  • আপডেট সময় ০২:০৯:১৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬
  • ৮ বার পড়া হয়েছে

Screenshot

মেশকাতুন নাহার :মানুষ জন্মের সঙ্গে শুধু রক্তের উত্তরাধিকার বহন করে না; সে বহন করে একটি পরিবারের চিন্তাধারা, বিশ্বাস, সংস্কার, মূল্যবোধ ও জীবনদর্শনের অদৃশ্য পুঁটুলি। কোনো পরিবারে সেই পুঁটুলিতে থাকে জ্ঞানের প্রদীপ, মানবিকতার সুবাস ও বিবেকের নির্মলতা; আবার কোনো পরিবারে জমে থাকে অজ্ঞতার ধুলো, কুসংস্কারের জাল, সংকীর্ণতার কুয়াশা এবং পুরোনো ভুল বিশ্বাসের পাথর। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—অজ্ঞতা কখনো কখনো সম্পদের মতোই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে উত্তরাধিকারসূত্রে স্থানান্তরিত হয়।
একটি পরিবারকে যদি একটি বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে পরিবারপ্রধান তার মূলের মতো। মূল যদি সুস্থ হয়, বৃক্ষের কাণ্ড দৃঢ় হয়, শাখা-প্রশাখা সবুজ হয়, ফুল ও ফলের সম্ভাবনাও বাড়ে। কিন্তু মূলের ভেতর যদি পচন বাসা বাঁধে, বাইরে থেকে বৃক্ষ যতই সবুজ দেখাক, তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তেমনি পরিবারের প্রধান ব্যক্তি যদি অজ্ঞতা, কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও সংকীর্ণতার আবর্তে বন্দী থাকেন, তবে তাঁর সন্তানদের সামনে পৃথিবীটি অনেক সময় একটি খোলা জানালা নয়—বরং হয়ে ওঠে লোহার শিকযুক্ত একটি ঘর।
তবে এখানে একটি সত্য মনে রাখা জরুরি—অজ্ঞতা কোনো বংশগত রোগ নয়, কিন্তু অজ্ঞতার সংস্কৃতি প্রজন্মগত হতে পারে। একজন বাবা-মা যে চিন্তার সীমারেখা আঁকেন, সন্তান অনেক সময় সেটিকেই পৃথিবীর শেষ সীমানা বলে মনে করে।
একজন পিতা যদি মনে করেন, “আমার সময়ে পড়াশোনা করে কী লাভ হয়েছে, তোমারও এত পড়াশোনার প্রয়োজন নেই”—তবে তাঁর একটি বাক্য হয়তো সন্তানের সামনে বহু বছরের সম্ভাবনার দরজা বন্ধ করে দিতে পারে। যে শিশু বইয়ের বদলে শুধু পারিবারিক সংকীর্ণতার পাঠ পায়, সে হয়তো বিদ্যালয়ের বেঞ্চে বসেও জ্ঞানের প্রকৃত অর্থ আবিষ্কার করতে পারে না। কারণ শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতা থেকে আসে না; শিক্ষা আসে প্রশ্ন করার সাহস থেকে, যুক্তি গ্রহণের মানসিকতা থেকে এবং ভুলকে সংশোধন করার বিনয় থেকে।
একটি প্রদীপের আলো যেমন ঘরের অন্ধকার দূর করে, তেমনি একটি শিক্ষিত ও সচেতন মানুষ পুরো পরিবারের মানসিক অন্ধকারে প্রথম আলোকরেখা হয়ে উঠতে পারেন। কখনো কখনো একটি সন্তানই সেই প্রদীপ, যে পূর্বপুরুষের অন্ধকার ঘরে প্রথমবার জানালা খুলে দেয়।
কিন্তু সেই জানালা খোলা সহজ নয়। কারণ দীর্ঘদিনের অন্ধকারেরও এক ধরনের অভ্যাস তৈরি হয়। অন্ধকারে থাকা মানুষ হঠাৎ আলো পেলে যেমন চোখ কুঁচকে ফেলে, তেমনি অজ্ঞতার দীর্ঘ অনুশীলনে অভ্যস্ত পরিবার জ্ঞান, যুক্তি ও নতুন চিন্তাকে অনেক সময় সন্দেহের চোখে দেখে। তখন শিক্ষিত সন্তানকে বলা হয়—“বেশি বুঝতে যেও না”, “আমাদের পরিবারে এসব কখনো হয়নি”, “বড়রা যা বলে সেটাই ঠিক”, “সমাজ কী বলবে?”
এই ‘সমাজ কী বলবে’ নামের অদৃশ্য প্রহরীটি বহু প্রতিভার কারাগারের রক্ষক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
একটি পাখিকে যদি খাঁচায় জন্ম দেওয়া হয়, সে অনেক সময় আকাশকে নিজের প্রয়োজন বলেই মনে করে না। খাঁচার তারগুলোই তার কাছে পৃথিবীর সীমানা। অথচ আকাশ তার জন্যই অপেক্ষা করছে। তেমনি অজ্ঞতার পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষ অনেক সময় নিজের সম্ভাবনার ব্যাপ্তিই বুঝতে পারে না। সে জানে না যে তার সামনে আরও একটি পৃথিবী আছে—যেখানে প্রশ্ন করা অপরাধ নয়, মতভিন্নতা শত্রুতা নয়, নারী-পুরুষের শিক্ষা বৈষম্যের বিষয় নয়, বিজ্ঞানকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই এবং মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখাই সভ্যতার প্রথম পাঠ। এখানেই সুশিক্ষার প্রকৃত ভূমিকা।
সুশিক্ষা কেবল পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার নাম নয়। ডিগ্রি মানুষের হাতে একটি কাগজ দিতে পারে, কিন্তু সুশিক্ষা মানুষের ভেতরে একটি আয়না স্থাপন করে। সেই আয়নায় মানুষ নিজের অজ্ঞতা, অহংকার, ভুল ও সীমাবদ্ধতাকে দেখতে শেখে। সত্যিকারের শিক্ষা মানুষকে শুধু ‘কী জানি’ শেখায় না; বরং ‘কী জানি না’—সেই উপলব্ধিও দেয়।
একজন অশিক্ষিত মানুষ হয়তো ভুল করতে পারেন; কিন্তু একজন শিক্ষিত অথচ অসচেতন মানুষ কখনো কখনো নিজের ভুলকে সত্য প্রমাণ করার জন্য আরও বিপজ্জনক যুক্তি তৈরি করতে পারেন। তাই শিক্ষার সঙ্গে বিবেক, মানবিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও নৈতিকতার সংযোগ অপরিহার্য।
ধরা যাক, একটি পরিবারের বাবা-মা মেয়েকে মনে করেন শুধু রান্নাঘর ও সংসারের জন্য তৈরি করা হয়েছে। মেয়েটির পড়াশোনা অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। সেই পরিবার হয়তো বুঝতে পারে না—তারা শুধু একটি মেয়ের ভবিষ্যৎ সংকুচিত করছে না; তারা একটি সম্ভাব্য চিকিৎসক, শিক্ষক, গবেষক, উদ্যোক্তা কিংবা সমাজনির্মাতার জন্মের পথও সংকুচিত করছে।
আবার কোনো পরিবারে যদি সন্তানকে বলা হয়, “তুমি আমাদের মতোই হবে”—তাহলে তার স্বপ্নের ওপর অদৃশ্য একটি ছাদ তৈরি হয়। অথচ সন্তানের প্রয়োজন কখনো কখনো পরিবারের অনুকরণ নয়; প্রয়োজন পরিবারের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার স্বাধীনতা।
প্রজন্মের অন্ধকার ভাঙতে তাই প্রয়োজন বিদ্রোহ নয়, প্রয়োজন বোধের বিপ্লব।
একটি নদী তার উৎসকে অস্বীকার করে না; কিন্তু সে উৎসের কাছে স্থিরও থাকে না। পাহাড়ের বুক থেকে জন্ম নিয়ে সে পথের পাথর ভাঙে, বাঁক নেয়, জনপদ অতিক্রম করে, শেষে সাগরের সঙ্গে মিলিত হয়। মানুষের জীবনও তেমন। পূর্বপুরুষ আমাদের সূচনা দিতে পারেন, কিন্তু আমাদের গন্তব্য নির্ধারণ করার অধিকার কেবল তাঁদের হাতে থাকা উচিত নয়।
অতীত আমাদের শিকড়; ভবিষ্যৎ আমাদের দিগন্ত।
শিকড় ছাড়া বৃক্ষ টেকে না, আবার শুধু শিকড় আঁকড়ে থাকলে বৃক্ষ আকাশও ছুঁতে পারে না।
আজকের পৃথিবীতে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি মানুষের হাতে পৃথিবী এনে দিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জ্ঞানের ভাণ্ডারকে হাতের মুঠোয় এনেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথ্যের স্রোত তৈরি করেছে। কিন্তু তথ্যের প্রাচুর্য আর জ্ঞানের প্রাচুর্য এক বিষয় নয়। ভুল তথ্য, গুজব, কুসংস্কার ও অর্ধসত্যের যুগে সুশিক্ষা এখন শুধু প্রয়োজনীয় নয়—অপরিহার্য।
একজন অভিভাবক যদি সন্তানকে বলেন, “ইন্টারনেটে যা দেখবে, সব বিশ্বাস করবে না; যাচাই করবে”—তবে তিনি শুধু একটি শিশুকে শিক্ষা দিচ্ছেন না; তিনি ভবিষ্যতের একজন সচেতন নাগরিক তৈরি করছেন।
একটি কম্পাস যেমন নাবিককে পথ চিনতে সাহায্য করে, সুশিক্ষা তেমনি মানুষকে তথ্যের সমুদ্রে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে শেখায়।
তবে পরিবারের অজ্ঞতার বেড়াজালে জন্ম নেওয়া কোনো সন্তানকে আজীবন সেই বেড়াজালের বন্দী থাকতে হবে—এমন কোনো বিধান প্রকৃতিতে নেই। ইতিহাসে বহু মানুষ প্রতিকূল পরিবেশ থেকে উঠে এসে নিজেদের ভাগ্যের ভাষা বদলেছেন। তাঁদের কেউ বইকে সঙ্গী করেছেন, কেউ শিক্ষককে পথপ্রদর্শক করেছেন, কেউ নিজের কৌতূহলকে জ্বালানি বানিয়েছেন। একজন মানুষের জাগরণ কখনো কখনো একটি পরিবারের বহু বছরের ঘুম ভাঙাতে পারে।
একটি আগুনের স্ফুলিঙ্গ যেমন শুকনো অরণ্যে দাবানলের সূচনা করতে পারে, তেমনি একটি জাগ্রত মন একটি পরিবারের চিন্তার কাঠামো পাল্টে দিতে পারে।
তাই পরিবারপ্রধানের অজ্ঞতা যদি সন্তানদের পথে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেই দেয়াল ভাঙার প্রথম হাতুড়ি হতে পারে শিক্ষা। কিন্তু সেই আঘাত হতে হবে ঘৃণার নয়, যুক্তির; অবজ্ঞার নয়, প্রজ্ঞার; সংঘাতের নয়, আলোর।
কারণ মানুষকে অজ্ঞতার জন্য অপমান করলে সে আরও শক্ত করে তার দরজা বন্ধ করতে পারে; কিন্তু তাকে সম্মান দিয়ে জ্ঞানের দরজা খুলে দিলে সে হয়তো নিজেই একদিন আলোকে ঘরে আমন্ত্রণ জানাবে।
একটি পরিবারের সত্যিকারের উন্নতি তখনই শুরু হয়, যখন সেখানে প্রশ্ন করার অধিকার জন্ম নেয়। সন্তান যখন বাবাকে প্রশ্ন করতে পারে, বাবা যখন সন্তানের কাছ থেকেও কিছু শিখতে প্রস্তুত থাকেন, মা যখন মেয়ের স্বপ্নকে নিজের অসম্পূর্ণ স্বপ্নের উত্তরাধিকার না বানিয়ে তার নিজস্ব আকাশটি নির্মাণে সাহায্য করেন—তখনই পরিবার একটি জীবন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
শেষ পর্যন্ত মানুষ তার পূর্বপুরুষের ভুলের জন্য দায়ী নয়; কিন্তু সেই ভুলকে পরবর্তী প্রজন্মের ভাগ্য বানিয়ে দেওয়ার দায় এড়াতে পারে না।
আমরা প্রত্যেকে কোনো না কোনো বৃক্ষের ফল। আমাদের শিকড়ে পূর্বপুরুষের মাটি, কিন্তু আমাদের ডালে ভবিষ্যতের পাখিরা বসবে। তাই প্রশ্ন শুধু—আমরা কী পেয়েছি? প্রশ্ন হলো—আমরা পরবর্তী প্রজন্মকে কী দিয়ে যাচ্ছি?অজ্ঞতার অন্ধকার, নাকি জ্ঞানের প্রদীপ?কুসংস্কারের শিকল, নাকি মুক্ত চিন্তার ডানা?ভয়ের উত্তরাধিকার, নাকি প্রশ্ন করার সাহস?
সুশিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য এখানেই—মানুষকে শুধু শিক্ষিত করা নয়, তাকে এমন এক আলোকিত মানুষে রূপান্তরিত করা, যে নিজের অন্ধকার চিনতে পারে এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি উন্মুক্ত আকাশ রেখে যেতে পারে। কারণ একটি পরিবারের ভাগ্য বদলাতে কখনো কখনো সম্পদের পাহাড় প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন হয় মাত্র একজন জাগ্রত মানুষের।
আর সেই একজন মানুষটি—হয়তো আপনার পরিবারেই জন্ম নিচ্ছে।।
লেখক:প্রভাষক সমাজকর্ম, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ,
চাঁদপুর।
ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

লক ডাউন পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় ফ্রান্সে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি

যুক্তরাজ্যে করোনার মধ্যেই শিশুদের মাঝে নতুন রোগের হানা

অজ্ঞতার উত্তরাধিকার ভেঙে জ্ঞানের আলোকযাত্রা

অজ্ঞতার উত্তরাধিকার ভেঙে জ্ঞানের আলোকযাত্রা

আপডেট সময় ০২:০৯:১৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬
মেশকাতুন নাহার :মানুষ জন্মের সঙ্গে শুধু রক্তের উত্তরাধিকার বহন করে না; সে বহন করে একটি পরিবারের চিন্তাধারা, বিশ্বাস, সংস্কার, মূল্যবোধ ও জীবনদর্শনের অদৃশ্য পুঁটুলি। কোনো পরিবারে সেই পুঁটুলিতে থাকে জ্ঞানের প্রদীপ, মানবিকতার সুবাস ও বিবেকের নির্মলতা; আবার কোনো পরিবারে জমে থাকে অজ্ঞতার ধুলো, কুসংস্কারের জাল, সংকীর্ণতার কুয়াশা এবং পুরোনো ভুল বিশ্বাসের পাথর। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—অজ্ঞতা কখনো কখনো সম্পদের মতোই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে উত্তরাধিকারসূত্রে স্থানান্তরিত হয়।
একটি পরিবারকে যদি একটি বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে পরিবারপ্রধান তার মূলের মতো। মূল যদি সুস্থ হয়, বৃক্ষের কাণ্ড দৃঢ় হয়, শাখা-প্রশাখা সবুজ হয়, ফুল ও ফলের সম্ভাবনাও বাড়ে। কিন্তু মূলের ভেতর যদি পচন বাসা বাঁধে, বাইরে থেকে বৃক্ষ যতই সবুজ দেখাক, তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তেমনি পরিবারের প্রধান ব্যক্তি যদি অজ্ঞতা, কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও সংকীর্ণতার আবর্তে বন্দী থাকেন, তবে তাঁর সন্তানদের সামনে পৃথিবীটি অনেক সময় একটি খোলা জানালা নয়—বরং হয়ে ওঠে লোহার শিকযুক্ত একটি ঘর।
তবে এখানে একটি সত্য মনে রাখা জরুরি—অজ্ঞতা কোনো বংশগত রোগ নয়, কিন্তু অজ্ঞতার সংস্কৃতি প্রজন্মগত হতে পারে। একজন বাবা-মা যে চিন্তার সীমারেখা আঁকেন, সন্তান অনেক সময় সেটিকেই পৃথিবীর শেষ সীমানা বলে মনে করে।
একজন পিতা যদি মনে করেন, “আমার সময়ে পড়াশোনা করে কী লাভ হয়েছে, তোমারও এত পড়াশোনার প্রয়োজন নেই”—তবে তাঁর একটি বাক্য হয়তো সন্তানের সামনে বহু বছরের সম্ভাবনার দরজা বন্ধ করে দিতে পারে। যে শিশু বইয়ের বদলে শুধু পারিবারিক সংকীর্ণতার পাঠ পায়, সে হয়তো বিদ্যালয়ের বেঞ্চে বসেও জ্ঞানের প্রকৃত অর্থ আবিষ্কার করতে পারে না। কারণ শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতা থেকে আসে না; শিক্ষা আসে প্রশ্ন করার সাহস থেকে, যুক্তি গ্রহণের মানসিকতা থেকে এবং ভুলকে সংশোধন করার বিনয় থেকে।
একটি প্রদীপের আলো যেমন ঘরের অন্ধকার দূর করে, তেমনি একটি শিক্ষিত ও সচেতন মানুষ পুরো পরিবারের মানসিক অন্ধকারে প্রথম আলোকরেখা হয়ে উঠতে পারেন। কখনো কখনো একটি সন্তানই সেই প্রদীপ, যে পূর্বপুরুষের অন্ধকার ঘরে প্রথমবার জানালা খুলে দেয়।
কিন্তু সেই জানালা খোলা সহজ নয়। কারণ দীর্ঘদিনের অন্ধকারেরও এক ধরনের অভ্যাস তৈরি হয়। অন্ধকারে থাকা মানুষ হঠাৎ আলো পেলে যেমন চোখ কুঁচকে ফেলে, তেমনি অজ্ঞতার দীর্ঘ অনুশীলনে অভ্যস্ত পরিবার জ্ঞান, যুক্তি ও নতুন চিন্তাকে অনেক সময় সন্দেহের চোখে দেখে। তখন শিক্ষিত সন্তানকে বলা হয়—“বেশি বুঝতে যেও না”, “আমাদের পরিবারে এসব কখনো হয়নি”, “বড়রা যা বলে সেটাই ঠিক”, “সমাজ কী বলবে?”
এই ‘সমাজ কী বলবে’ নামের অদৃশ্য প্রহরীটি বহু প্রতিভার কারাগারের রক্ষক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
একটি পাখিকে যদি খাঁচায় জন্ম দেওয়া হয়, সে অনেক সময় আকাশকে নিজের প্রয়োজন বলেই মনে করে না। খাঁচার তারগুলোই তার কাছে পৃথিবীর সীমানা। অথচ আকাশ তার জন্যই অপেক্ষা করছে। তেমনি অজ্ঞতার পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষ অনেক সময় নিজের সম্ভাবনার ব্যাপ্তিই বুঝতে পারে না। সে জানে না যে তার সামনে আরও একটি পৃথিবী আছে—যেখানে প্রশ্ন করা অপরাধ নয়, মতভিন্নতা শত্রুতা নয়, নারী-পুরুষের শিক্ষা বৈষম্যের বিষয় নয়, বিজ্ঞানকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই এবং মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখাই সভ্যতার প্রথম পাঠ। এখানেই সুশিক্ষার প্রকৃত ভূমিকা।
সুশিক্ষা কেবল পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার নাম নয়। ডিগ্রি মানুষের হাতে একটি কাগজ দিতে পারে, কিন্তু সুশিক্ষা মানুষের ভেতরে একটি আয়না স্থাপন করে। সেই আয়নায় মানুষ নিজের অজ্ঞতা, অহংকার, ভুল ও সীমাবদ্ধতাকে দেখতে শেখে। সত্যিকারের শিক্ষা মানুষকে শুধু ‘কী জানি’ শেখায় না; বরং ‘কী জানি না’—সেই উপলব্ধিও দেয়।
একজন অশিক্ষিত মানুষ হয়তো ভুল করতে পারেন; কিন্তু একজন শিক্ষিত অথচ অসচেতন মানুষ কখনো কখনো নিজের ভুলকে সত্য প্রমাণ করার জন্য আরও বিপজ্জনক যুক্তি তৈরি করতে পারেন। তাই শিক্ষার সঙ্গে বিবেক, মানবিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও নৈতিকতার সংযোগ অপরিহার্য।
ধরা যাক, একটি পরিবারের বাবা-মা মেয়েকে মনে করেন শুধু রান্নাঘর ও সংসারের জন্য তৈরি করা হয়েছে। মেয়েটির পড়াশোনা অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। সেই পরিবার হয়তো বুঝতে পারে না—তারা শুধু একটি মেয়ের ভবিষ্যৎ সংকুচিত করছে না; তারা একটি সম্ভাব্য চিকিৎসক, শিক্ষক, গবেষক, উদ্যোক্তা কিংবা সমাজনির্মাতার জন্মের পথও সংকুচিত করছে।
আবার কোনো পরিবারে যদি সন্তানকে বলা হয়, “তুমি আমাদের মতোই হবে”—তাহলে তার স্বপ্নের ওপর অদৃশ্য একটি ছাদ তৈরি হয়। অথচ সন্তানের প্রয়োজন কখনো কখনো পরিবারের অনুকরণ নয়; প্রয়োজন পরিবারের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার স্বাধীনতা।
প্রজন্মের অন্ধকার ভাঙতে তাই প্রয়োজন বিদ্রোহ নয়, প্রয়োজন বোধের বিপ্লব।
একটি নদী তার উৎসকে অস্বীকার করে না; কিন্তু সে উৎসের কাছে স্থিরও থাকে না। পাহাড়ের বুক থেকে জন্ম নিয়ে সে পথের পাথর ভাঙে, বাঁক নেয়, জনপদ অতিক্রম করে, শেষে সাগরের সঙ্গে মিলিত হয়। মানুষের জীবনও তেমন। পূর্বপুরুষ আমাদের সূচনা দিতে পারেন, কিন্তু আমাদের গন্তব্য নির্ধারণ করার অধিকার কেবল তাঁদের হাতে থাকা উচিত নয়।
অতীত আমাদের শিকড়; ভবিষ্যৎ আমাদের দিগন্ত।
শিকড় ছাড়া বৃক্ষ টেকে না, আবার শুধু শিকড় আঁকড়ে থাকলে বৃক্ষ আকাশও ছুঁতে পারে না।
আজকের পৃথিবীতে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি মানুষের হাতে পৃথিবী এনে দিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জ্ঞানের ভাণ্ডারকে হাতের মুঠোয় এনেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথ্যের স্রোত তৈরি করেছে। কিন্তু তথ্যের প্রাচুর্য আর জ্ঞানের প্রাচুর্য এক বিষয় নয়। ভুল তথ্য, গুজব, কুসংস্কার ও অর্ধসত্যের যুগে সুশিক্ষা এখন শুধু প্রয়োজনীয় নয়—অপরিহার্য।
একজন অভিভাবক যদি সন্তানকে বলেন, “ইন্টারনেটে যা দেখবে, সব বিশ্বাস করবে না; যাচাই করবে”—তবে তিনি শুধু একটি শিশুকে শিক্ষা দিচ্ছেন না; তিনি ভবিষ্যতের একজন সচেতন নাগরিক তৈরি করছেন।
একটি কম্পাস যেমন নাবিককে পথ চিনতে সাহায্য করে, সুশিক্ষা তেমনি মানুষকে তথ্যের সমুদ্রে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে শেখায়।
তবে পরিবারের অজ্ঞতার বেড়াজালে জন্ম নেওয়া কোনো সন্তানকে আজীবন সেই বেড়াজালের বন্দী থাকতে হবে—এমন কোনো বিধান প্রকৃতিতে নেই। ইতিহাসে বহু মানুষ প্রতিকূল পরিবেশ থেকে উঠে এসে নিজেদের ভাগ্যের ভাষা বদলেছেন। তাঁদের কেউ বইকে সঙ্গী করেছেন, কেউ শিক্ষককে পথপ্রদর্শক করেছেন, কেউ নিজের কৌতূহলকে জ্বালানি বানিয়েছেন। একজন মানুষের জাগরণ কখনো কখনো একটি পরিবারের বহু বছরের ঘুম ভাঙাতে পারে।
একটি আগুনের স্ফুলিঙ্গ যেমন শুকনো অরণ্যে দাবানলের সূচনা করতে পারে, তেমনি একটি জাগ্রত মন একটি পরিবারের চিন্তার কাঠামো পাল্টে দিতে পারে।
তাই পরিবারপ্রধানের অজ্ঞতা যদি সন্তানদের পথে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেই দেয়াল ভাঙার প্রথম হাতুড়ি হতে পারে শিক্ষা। কিন্তু সেই আঘাত হতে হবে ঘৃণার নয়, যুক্তির; অবজ্ঞার নয়, প্রজ্ঞার; সংঘাতের নয়, আলোর।
কারণ মানুষকে অজ্ঞতার জন্য অপমান করলে সে আরও শক্ত করে তার দরজা বন্ধ করতে পারে; কিন্তু তাকে সম্মান দিয়ে জ্ঞানের দরজা খুলে দিলে সে হয়তো নিজেই একদিন আলোকে ঘরে আমন্ত্রণ জানাবে।
একটি পরিবারের সত্যিকারের উন্নতি তখনই শুরু হয়, যখন সেখানে প্রশ্ন করার অধিকার জন্ম নেয়। সন্তান যখন বাবাকে প্রশ্ন করতে পারে, বাবা যখন সন্তানের কাছ থেকেও কিছু শিখতে প্রস্তুত থাকেন, মা যখন মেয়ের স্বপ্নকে নিজের অসম্পূর্ণ স্বপ্নের উত্তরাধিকার না বানিয়ে তার নিজস্ব আকাশটি নির্মাণে সাহায্য করেন—তখনই পরিবার একটি জীবন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
শেষ পর্যন্ত মানুষ তার পূর্বপুরুষের ভুলের জন্য দায়ী নয়; কিন্তু সেই ভুলকে পরবর্তী প্রজন্মের ভাগ্য বানিয়ে দেওয়ার দায় এড়াতে পারে না।
আমরা প্রত্যেকে কোনো না কোনো বৃক্ষের ফল। আমাদের শিকড়ে পূর্বপুরুষের মাটি, কিন্তু আমাদের ডালে ভবিষ্যতের পাখিরা বসবে। তাই প্রশ্ন শুধু—আমরা কী পেয়েছি? প্রশ্ন হলো—আমরা পরবর্তী প্রজন্মকে কী দিয়ে যাচ্ছি?অজ্ঞতার অন্ধকার, নাকি জ্ঞানের প্রদীপ?কুসংস্কারের শিকল, নাকি মুক্ত চিন্তার ডানা?ভয়ের উত্তরাধিকার, নাকি প্রশ্ন করার সাহস?
সুশিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য এখানেই—মানুষকে শুধু শিক্ষিত করা নয়, তাকে এমন এক আলোকিত মানুষে রূপান্তরিত করা, যে নিজের অন্ধকার চিনতে পারে এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি উন্মুক্ত আকাশ রেখে যেতে পারে। কারণ একটি পরিবারের ভাগ্য বদলাতে কখনো কখনো সম্পদের পাহাড় প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন হয় মাত্র একজন জাগ্রত মানুষের।
আর সেই একজন মানুষটি—হয়তো আপনার পরিবারেই জন্ম নিচ্ছে।।
লেখক:প্রভাষক সমাজকর্ম, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ,
চাঁদপুর।