দর্পণ ডেস্ক
ফ্রান্সে ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-পীড়ন ও চাপ বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দেশটির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলিস্তিনপন্থি আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বহিষ্কার, গ্রেফতার, পুলিশি অভিযান ও আইনি হয়রানির মুখে পড়ছেন বলে জানিয়েছে শিক্ষার্থী সংগঠন ও মানবাধিকারকর্মীরা।
তিনি জানান, তার পরিবার আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিল। তবে ২০২৪ সালের মে মাসে তার বাবা-মা তাকে ফিলিস্তিনের প্রতীক কেফিয়েহ ও ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ ব্যানার সরিয়ে রাখতে এবং আন্দোলন থেকে দূরে থাকতে অনুরোধ করেন।
কিলিয়ানের ভাষ্য, তার বাবা-মা আশঙ্কা করেছিলেন যে আন্দোলনে যুক্ত থাকলে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হতে পারেন কিংবা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হতে পারেন।
এদিকে, নান্তের বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৪ বছর বয়সি আইন বিভাগের শিক্ষার্থী লুইগি সোরবোনে এক বিক্ষোভে নিরাপত্তারক্ষীর ওপর হামলার অভিযোগে গ্রেফতার হন। যদিও সাক্ষ্যপ্রমাণে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি, তবুও তাকে ছয় মাসের স্থগিত কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে বহিষ্কার করে।
ফ্রান্সের শিক্ষার্থী সংগঠন ও শিক্ষকরা বলছেন, গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই ফিলিস্তিনের পক্ষে মত প্রকাশকারীদের বিরুদ্ধে চাপ ও দমননীতি বেড়েছে। তাদের দাবি, বিক্ষোভ, বক্তব্য প্রদান কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় ভবন দখলের মতো কর্মসূচিকে এখন অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্যারিসের খ্যাতনামা সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনের জেরে একাধিকবার পুলিশি অভিযান চালানো হয়েছে। গত এপ্রিল-মাসে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান নেওয়া ৭৬ শিক্ষার্থীকে পুলিশ গ্রেফতার করে। তারা ইসরাইলি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সায়েন্সেস পো’র অংশীদারিত্বের বিরোধিতা এবং বিতর্কিত ‘ইয়াদান বিল’-এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিলেন।
গ্রেফতার হওয়া শিক্ষার্থীদের প্রত্যেককে ৪০০ ইউরো জরিমানা করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক রেকর্ডও যুক্ত করা হয়।
ফ্রান্সের বামপন্থী রাজনৈতিক দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজের (এলএফআই) নেতা ম্যানুয়েল বমপার শিক্ষার্থীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন, গাজার প্রতি সংহতি প্রকাশের কারণেই তাদের বিরুদ্ধে পুলিশি দমন চালানো হচ্ছে।
ফ্রান্সের জাতীয় শিক্ষার্থী ইউনিয়ন ইউনেফের মহাসচিব মানোঁ মোরে বলেন, ফিলিস্তিনপন্থী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। তার অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাধারণ সভা বা আন্দোলন শুরু হলেই প্রশাসন নিরাপত্তার অজুহাতে ক্যাম্পাস বন্ধ করে দিচ্ছে, ফলে শিক্ষার্থীরা মত প্রকাশের সুযোগ হারাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, উচ্চশিক্ষায় ‘ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলা’ শিরোনামে নতুন আইন বাস্তবে ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলন দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, এই আইনের মাধ্যমে ইসরাইলের সমালোচনাকে ইহুদিবিদ্বেষের সঙ্গে এক করে দেখা হচ্ছে।
সোরবোনের শিক্ষার্থী তেবা বর্তমানে এমনই এক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন। সহপাঠীদের অভিযোগের ভিত্তিতে গত বছর তার বাড়িতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ তদন্তে তিনি দায়মুক্তি পান, তবুও প্রশাসন তার বহিষ্কারাদেশ বহাল রেখেছে।
ইউনেফের তথ্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনে যুক্ত থাকার অভিযোগে ইতোমধ্যে বহু শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পার্লামেন্টে নতুন একটি বিল উত্থাপন করা হয়েছে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় দখলকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বিলটি পাস হলে এ ধরনের কর্মসূচিতে অংশ নিলে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও ৭ হাজার ৫০০ ইউরো জরিমানার বিধান কার্যকর হতে পারে।
ফরাসি শ্রমিক ইউনিয়ন ফোর্স উভরিয়ের উচ্চশিক্ষা শাখা বলেছে, এ ধরনের আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সে ধীরে ধীরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের পরিসর সংকুচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ফিলিস্তিন ইস্যুতে সমর্থন জানানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান বিচারিক ব্যবস্থা ভবিষ্যতে দেশটির একাডেমিক পরিবেশকে আরও কঠোর ও নিয়ন্ত্রিত করে তুলতে পারে।


















