ঢাকা ১২:৩৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
গ্রেটার সিলেট কমিউনিটি ইউকে’র কেন্দ্রীয় সম্মেলন সম্পন্ন ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন জোরালো, সমর্থনে রাজপথে হাজারো মানুষ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ইউরোপে নির্মিত হচ্ছে প্রামাণ্যচিত্র, শুটিং শুরু ১৯ অক্টোবর নিউইয়র্কে ড. ইউনূসকে হেনস্তায় যেসব আ. লীগ নেতার নাম আলোচনায় আট মাসে বিদেশে গেছেন সাড়ে ৪ লাখ কর্মী সরকারবিরোধী চক্রান্ত : সাবেক ২ সেনা কর্মকর্তা ৪ দিনের রিমান্ডে সৌদিতে বাংলাদেশিদের ছবি-ভিডিও প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা ইইউর বিভিন্ন দেশে প্রায় পাঁচ লাখ বাংলাদেশি বৈধভাবে বসবাস করছেন প্যারিস বিমানবন্দরে ইসরায়েলি কোম্পানির সামরিক চালান আটকে দিলেন কর্মীরা ‎সিলেট বিভাগ গণদাবি পরিষদ ফ্রান্স শাখার কমিটি গঠন

লন্ডন থেকে বার্সেলোনা—বন্ধুত্বের কাছে ফিরে আসার এক অনন্য গল্প

  • আপডেট সময় ০৮:২০:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬
  • ১০৬ বার পড়া হয়েছে

শামীম আহমেদ : কিছু ভ্রমণ শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তার রেশ শেষ হয় না।
কিছু পথ পেরিয়ে আসার পরও মনে হয়—আসলে আমরা কোথাও যাইনি; বরং ফিরে এসেছি বহু দূরেফেলে আসা কোনো এক সময়ে।

লন্ডন ও বার্সেলোনার এই সফরটিও তেমনই।

এটি শুধু কয়েকটি শহর ঘুরে দেখার গল্প নয়। এটি ৩২ বছর পর আবার বন্ধুদের কাছে ফিরে আসারগল্প। সময়ের স্রোতে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া কিছু মানুষকে আবার একই টেবিলে, একইআড্ডায়, একই হাসিতে খুঁজে পাওয়ার গল্প।

কী দিয়ে শুরু করব, কাকে দিয়ে শুরু করব—ভাবতে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে, এই গল্পের শুরুকোথায়? স্কুলের সেই দিনগুলোতে?

নাকি ৩২ বছর পর লন্ডনের কোনো এক দুপুরে, যখন একে একে পরিচিত মুখগুলো সামনে এসেদাঁড়াল?

শেষ পর্যন্ত মনে হলো, গল্পের শুরু আসলে কোনো একটি দিনে নয়। এই গল্পের শুরু সেই কৈশোরে, যেদিন বন্ধুত্বের বীজ বোনা হয়েছিল। আর লন্ডন–বার্সেলোনার এই সফর ছিল সেই বন্ধুত্বের বৃক্ষে নতুনকরে ফুল ফোটার একটি মুহূর্ত।

দিনটি ছিল ২১ আগস্ট।

সকাল থেকেই একে একে বন্ধুরা জড়ো হতে শুরু করল। আমেরিকা থেকে বাবর ও হারুন, রচেস্টারথেকে সাবুল, অক্সফোর্ড থেকে ফয়সল, সাউথএন্ড থেকে জিয়াউল শাহীন, মাইল্যান্ড থেকে মুনাইম, হোয়াইটচ্যাপেল থেকে সদা হাস্যোজ্জ্বল আব্দুন নূর এবং বেডফোর্ড থেকে আলবাব। আর লন্ডনবাসী শামসুল আর লায়েক তো ইতিমধ্যেই উপস্থিত।

আমেরিকা আর আয়ারল্যান্ড থেকে আসা বন্ধুদের বরণ মুহুর্ত

একসময় মনে হলো, লন্ডনের কোনো একটি ঠিকানায় আমরা আটকে নেই; বরং সময়ের কোনো একপুরোনো দরজা খুলে গেছে।

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো যেন ৩২ বছর আগের সেই বন্ধুরাই—শুধু চেহারায় সময়ের কিছুস্বাক্ষর।

চুলে একটু রূপালি আভা এসেছে, মুখে বয়সের কিছু রেখা পড়েছে, জীবনের অভিজ্ঞতা আমাদেরঅনেক দূর নিয়ে গেছে; কিন্তু হাসিটা সেই একই।

বন্ধুকে দেখলে যে হাসি আপনা থেকেই চলে আসে—সেই হাসির বয়স হয় না।

লায়েকের ঘরে বন্ধুত্বের প্রথম আসর

এই মিলনমেলার কথা বলতে গেলে প্রথমেই যার নাম আসে, তিনি আমাদের বন্ধু লায়েক।

মজা করে আমি তাকে বলি—ব্যাচ ৯৪-এর ইউরোপের কেন্দ্রবিন্দু।

লায়েকের আতিথেয়তা দেখে মনে হয়েছে, কিছু মানুষ হয়তো জন্মই নেয় অন্যকে আপন করে নেওয়ারজন্য।

বন্ধুরা একে একে এসে জড়ো হলো তাঁর আয়োজিত বুফে লাঞ্চে। টেবিলে নানা রকম খাবার ছিল, কিন্তুআমাদের আসল খাবার ছিল গল্প।

একজন পুরোনো কোনো ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছে, আরেকজন সেটার সঙ্গে নতুন গল্প যোগ করছে।কেউ হাসছে, কেউ প্রতিবাদ করছে, কেউ বলছে—“ওটা কিন্তু ঠিক এমন ছিল না!”

৩২ বছর পরও বন্ধুরা একে অন্যের পুরোনো কীর্তি ভুলে যায়নি—এটাই বোধহয় সত্যিকারের বন্ধুত্ব।

সেদিন বুঝলাম, সময় অনেক কিছু কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু একসঙ্গে কাটানো স্মৃতিগুলোকে মুছেফেলতে পারে না।

এরপর ব্যাচ ৯৪–এর পক্ষ থেকে লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেট কাউন্সিলের স্পিকার ব্যারিস্টার মুস্তাক ভাইকে ক্রেস্ট প্রদান করা হলো। মুহূর্তটি ছিল সম্মান ও আবেগে ভরা। মুস্তাক ভাই কেবল জালালপুরের কৃতি সন্তানই নন, তিনি আমাদের বন্ধু মোনায়েমের সহোদর।

এরপরই এলো আরেকটি চমক।

ব্যাচ ২০০০–এর পক্ষ থেকে বিশাল আকৃতির কেক নিয়ে হাজির হলো আমাদের প্রিয় ছোট ভাইকামরুল, জিলানি, মামুন, ফয়েজ ও ফরিদ। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল আমি (শামীম) বাবর ও হারুনকেলন্ডনে স্বাগত জানানো।

টাওয়ার হ্যামলেটে কাউন্সিলের স্পিকার মোস্তাক ভাইকে নিয়ে কেক কাটার মুহুর্ত

কেকটি ছিল বড়, কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল ভালোবাসা।

ব্যাচ ২০০০–এর ছোট ভাইদের প্রতি তাই রইল আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।

আর এই পুরো আয়োজনের নেপথ্যে, দৃশ্যমান কিংবা অদৃশ্যভাবে, যিনি ছিলেন—তিনি আমাদেরলায়েক।

এরই মধ্যে হঠাৎ এসে হাজির হলেন আমাদের বড় ভাই, ৯৩ ব্যাচের ফয়জুল ইসলাম সায়েম ভাই।

তাঁর মধ্যে আমি আমার অগ্রজ শাহ আলম রাজন ভাইয়ের অনেকটা মিল খুঁজে পাই।

সায়েম ভাইকে দেখলেই মনে হয়, জালালপুরের মাটি থেকে যেন হাসি–আনন্দের কোনো এক প্রতিনিধিউঠে এসেছেন। তাঁর আগমনে আড্ডায় যেন আরও একটু প্রাণ ফিরে এলো।

শাহীন-এর ঘরে আরেক অধ্যায়-

দিন শেষে যখন রাত নেমে এলো, তখন শুরু হলো আতিথেয়তার দ্বিতীয় অধ্যায়।

যারা ব্রিটেনের বাইরে থেকে এসেছি, আমাদের থাকার ব্যবস্থা করলেন বন্ধু জিয়াউল শাহীন।

আমি, বাবর, হারুন ও ফয়সল গিয়ে উঠলাম সাউথএন্ডে শাহীন–এর বাসায়।

তারপর শুরু হলো শাহীন–এর ‘খিদমত’।

মনে হচ্ছিল, লায়েক আর শাহীন–এর মধ্যে যেন এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলছে—

“বন্ধুকে কে একটু বেশি আপন করে নিতে পারে?”

আমরা অতিথিরা অবশ্য সেই প্রতিযোগিতার বিচারক হতে রাজি নই। কারণ, দুই পক্ষেরভালোবাসাতেই আমরা সমানভাবে ঋণী!

শাহীন–এর আতিথেয়তা আমাকে আবার মনে করিয়ে দিল—বন্ধুত্বের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, এখানে দরজার সঙ্গে হৃদয়ের দরজাটিও খুলে যায়।

বার্সেলোনার পথে-

পরদিন আমরা রওনা হলাম বার্সেলোনার উদ্দেশে। এক শহর থেকে আরেক শহরে যাওয়া—ভ্রমণেরদৃষ্টিতে হয়তো খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা। কিন্তু আমাদের কাছে এর অর্থ ছিল আরও বড়। কারণ, সামনে ছিল নতুন শহর, আর সেই শহরে অপেক্ষা করছিল আরেক বন্ধু।

বার্সেলোনা এয়ারপোর্টে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন মিনহার মাহমুদ আর আমাদের জন্য দুই দিন পর্তুগাল থেকে  বার্সিলোনায় আসা বন্ধু শরীফ আহসান।

এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করা দিয়ে তাঁর দায়িত্ব শুরু। এরপর ট্যুরের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ছিলেনআমাদের ছায়ার মতো।

কে কোথায় যাবে, কীভাবে যাবে, কার কী প্রয়োজন—সবকিছুর প্রতি তাঁর ছিল আন্তরিক নজর।

মনে হচ্ছিল, আমরা কোনো পর্যটকদল নই; আমরা যেন এক পরিবারের মানুষ, আর মিনহার সেইপরিবারের অভিভাবকের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে।

সাগরের নোনা জলে বন্ধুদের সাথে

ব্যস্ততার মাঝেও মানুষকে সময় দেওয়া যায়, চাইলে মানুষের জন্য নিজের সময়টুকু আলাদা করে রাখাযায়—মিনহার তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

আমরা যারা নিজেদের খুব সামাজিক মনে করি, লায়েক, শাহীন ও মিনহারের কাছ থেকে আমাদেরঅনেক কিছু শেখার আছে।

বার্সেলোনার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে, শহরের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে, কোথাও বসে গল্প করতে করতেবারবার মনে হচ্ছিল—শহর আসলে যতই সুন্দর হোক, ভ্রমণের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য মানুষ।

আর আমাদের মানুষগুলো ছিল অসাধারণ।

বন্ধুত্বের কাছে হার মানল দূরত্ব ও ব্যস্ততা

এই সফরের আরেকটি হৃদয়ছোঁয়া অধ্যায় আমাদের বিনোদন সম্রাট শরীফ আহসান।

শরীফ তাঁর ভাগ্নে জুমেলকে সঙ্গে নিয়ে সুদূর পর্তুগাল থেকে নিজের গাড়িতে প্রায় ১৭–১৮ ঘণ্টা ড্রাইভ করে, মাদ্রিদ হয়ে বার্সেলোনায় এসে হাজির!

কেউ তাকে ডাকেনি বাধ্যতামূলকভাবে। কোনো আনুষ্ঠানিক দায়িত্বও ছিল না।

ছিল শুধু বন্ধুত্ব।

ছিল বন্ধুদের সঙ্গে কিছু সময় কাটানোর আকাঙ্ক্ষা।

যারা শরীফকে কাছ থেকে চেনেন, তারা জানেন—কতটা ব্যস্ত তাঁর জীবন। কিন্তু সেদিন মনে হলো, মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ক আছে, যাদের সামনে ব্যস্ততার অজুহাতও ছোট হয়ে যায়।

    বার্সেলোনা দর্শনের এক মুহূর্ত

বন্ধুত্বের কাছে ব্যস্ততাও যে হার মানতে পারে, শরীফ যেন তারই এক উজ্জ্বল প্রমাণ।

আর আমাদের আমেরিকান বন্ধু বাবর—তাকে নিয়ে দু–একটি কথা না বললে এই গল্প অসম্পূর্ণ থেকেযাবে।

বাবর যেন ব্যাচ ৯৪–এর বহু প্রতিভার অধিকারী এক অঘোষিত সম্রাট!

তাকে দেখলে মাঝে মাঝে সত্যিই মনে হয়—

“আমি কেন বাবর হলাম না!”

তার মধ্যে এমন এক প্রাণচাঞ্চল্য আছে, যা খুব সহজেই অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন পরদেখা হলেও তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মনে হয়নি ৩২ বছর কেটে গেছে।

মনে হয়েছে, গতকালই যেন স্কুলের করিডোরে দেখা হয়েছিল।

এটাই বন্ধুত্বের জাদু।

আর ছিলেন আমাদের বহু প্রতিভাবান প্রফেসর বন্ধু শামসুল ইসলাম।

এই সফরে তাঁর ভূমিকা ছিল অনেকটা আমাদের ‘যোগাযোগমন্ত্রীর’ মতো।

লন্ডনের ট্রান্সপোর্টেশন থেকে শুরু করে বন্ধুদের এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করা, কোথা থেকে কোথায়যেতে হবে—সবকিছুর ব্যাপারেই তাঁর ছিল চমৎকার পরিকল্পনা।

বার্সেলোনা সফরটাকেও সফল ও নির্বিঘ্ন করতে তাঁর গাইডলাইন ছিল নিখুঁত।

তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল—

এ যেন শুধু কলেজের প্রফেসর নন, যোগাযোগ ব্যবস্থাপনারও প্রফেসর!

শেষে হিসাব মেলাতে গিয়ে

সফরের শেষদিকে এসে হঠাৎ মনে হলো—এত কিছু লিখলাম, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটিই তোবলা হয়নি।

কেউ যদি আমাকে প্রশ্ন করেন—

“এই সফরে কার অবদান সবচেয়ে বেশি?”

আমি বলব—

সবাই ছিল সেরাদের সেরা।

কেউ আতিথেয়তায়, কেউ ব্যবস্থাপনায়, কেউ বিনোদনে, কেউ পরিকল্পনায়, কেউ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে, কেউ সময় দিয়ে, কেউ শুধু নিজের উপস্থিতি দিয়ে—প্রত্যেকেই এই সফরকে স্মরণীয় করে তুলেছে।

শুধু আমি—

সবার কাছ থেকে নিয়েছি,
দিতে পারিনি কিছুই।

হয়তো এটাই সত্যি।

কারণ বন্ধুত্বের সম্পর্ক কখনো হিসাবের খাতায় লেখা যায় না।

লেখক: আয়ারল্যান্ড প্রবাসী, সমাজকর্মী ।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

লক ডাউন পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় ফ্রান্সে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি

যুক্তরাজ্যে করোনার মধ্যেই শিশুদের মাঝে নতুন রোগের হানা

গ্রেটার সিলেট কমিউনিটি ইউকে’র কেন্দ্রীয় সম্মেলন সম্পন্ন

লন্ডন থেকে বার্সেলোনা—বন্ধুত্বের কাছে ফিরে আসার এক অনন্য গল্প

আপডেট সময় ০৮:২০:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬

শামীম আহমেদ : কিছু ভ্রমণ শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তার রেশ শেষ হয় না।
কিছু পথ পেরিয়ে আসার পরও মনে হয়—আসলে আমরা কোথাও যাইনি; বরং ফিরে এসেছি বহু দূরেফেলে আসা কোনো এক সময়ে।

লন্ডন ও বার্সেলোনার এই সফরটিও তেমনই।

এটি শুধু কয়েকটি শহর ঘুরে দেখার গল্প নয়। এটি ৩২ বছর পর আবার বন্ধুদের কাছে ফিরে আসারগল্প। সময়ের স্রোতে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া কিছু মানুষকে আবার একই টেবিলে, একইআড্ডায়, একই হাসিতে খুঁজে পাওয়ার গল্প।

কী দিয়ে শুরু করব, কাকে দিয়ে শুরু করব—ভাবতে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে, এই গল্পের শুরুকোথায়? স্কুলের সেই দিনগুলোতে?

নাকি ৩২ বছর পর লন্ডনের কোনো এক দুপুরে, যখন একে একে পরিচিত মুখগুলো সামনে এসেদাঁড়াল?

শেষ পর্যন্ত মনে হলো, গল্পের শুরু আসলে কোনো একটি দিনে নয়। এই গল্পের শুরু সেই কৈশোরে, যেদিন বন্ধুত্বের বীজ বোনা হয়েছিল। আর লন্ডন–বার্সেলোনার এই সফর ছিল সেই বন্ধুত্বের বৃক্ষে নতুনকরে ফুল ফোটার একটি মুহূর্ত।

দিনটি ছিল ২১ আগস্ট।

সকাল থেকেই একে একে বন্ধুরা জড়ো হতে শুরু করল। আমেরিকা থেকে বাবর ও হারুন, রচেস্টারথেকে সাবুল, অক্সফোর্ড থেকে ফয়সল, সাউথএন্ড থেকে জিয়াউল শাহীন, মাইল্যান্ড থেকে মুনাইম, হোয়াইটচ্যাপেল থেকে সদা হাস্যোজ্জ্বল আব্দুন নূর এবং বেডফোর্ড থেকে আলবাব। আর লন্ডনবাসী শামসুল আর লায়েক তো ইতিমধ্যেই উপস্থিত।

আমেরিকা আর আয়ারল্যান্ড থেকে আসা বন্ধুদের বরণ মুহুর্ত

একসময় মনে হলো, লন্ডনের কোনো একটি ঠিকানায় আমরা আটকে নেই; বরং সময়ের কোনো একপুরোনো দরজা খুলে গেছে।

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো যেন ৩২ বছর আগের সেই বন্ধুরাই—শুধু চেহারায় সময়ের কিছুস্বাক্ষর।

চুলে একটু রূপালি আভা এসেছে, মুখে বয়সের কিছু রেখা পড়েছে, জীবনের অভিজ্ঞতা আমাদেরঅনেক দূর নিয়ে গেছে; কিন্তু হাসিটা সেই একই।

বন্ধুকে দেখলে যে হাসি আপনা থেকেই চলে আসে—সেই হাসির বয়স হয় না।

লায়েকের ঘরে বন্ধুত্বের প্রথম আসর

এই মিলনমেলার কথা বলতে গেলে প্রথমেই যার নাম আসে, তিনি আমাদের বন্ধু লায়েক।

মজা করে আমি তাকে বলি—ব্যাচ ৯৪-এর ইউরোপের কেন্দ্রবিন্দু।

লায়েকের আতিথেয়তা দেখে মনে হয়েছে, কিছু মানুষ হয়তো জন্মই নেয় অন্যকে আপন করে নেওয়ারজন্য।

বন্ধুরা একে একে এসে জড়ো হলো তাঁর আয়োজিত বুফে লাঞ্চে। টেবিলে নানা রকম খাবার ছিল, কিন্তুআমাদের আসল খাবার ছিল গল্প।

একজন পুরোনো কোনো ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছে, আরেকজন সেটার সঙ্গে নতুন গল্প যোগ করছে।কেউ হাসছে, কেউ প্রতিবাদ করছে, কেউ বলছে—“ওটা কিন্তু ঠিক এমন ছিল না!”

৩২ বছর পরও বন্ধুরা একে অন্যের পুরোনো কীর্তি ভুলে যায়নি—এটাই বোধহয় সত্যিকারের বন্ধুত্ব।

সেদিন বুঝলাম, সময় অনেক কিছু কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু একসঙ্গে কাটানো স্মৃতিগুলোকে মুছেফেলতে পারে না।

এরপর ব্যাচ ৯৪–এর পক্ষ থেকে লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেট কাউন্সিলের স্পিকার ব্যারিস্টার মুস্তাক ভাইকে ক্রেস্ট প্রদান করা হলো। মুহূর্তটি ছিল সম্মান ও আবেগে ভরা। মুস্তাক ভাই কেবল জালালপুরের কৃতি সন্তানই নন, তিনি আমাদের বন্ধু মোনায়েমের সহোদর।

এরপরই এলো আরেকটি চমক।

ব্যাচ ২০০০–এর পক্ষ থেকে বিশাল আকৃতির কেক নিয়ে হাজির হলো আমাদের প্রিয় ছোট ভাইকামরুল, জিলানি, মামুন, ফয়েজ ও ফরিদ। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল আমি (শামীম) বাবর ও হারুনকেলন্ডনে স্বাগত জানানো।

টাওয়ার হ্যামলেটে কাউন্সিলের স্পিকার মোস্তাক ভাইকে নিয়ে কেক কাটার মুহুর্ত

কেকটি ছিল বড়, কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল ভালোবাসা।

ব্যাচ ২০০০–এর ছোট ভাইদের প্রতি তাই রইল আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।

আর এই পুরো আয়োজনের নেপথ্যে, দৃশ্যমান কিংবা অদৃশ্যভাবে, যিনি ছিলেন—তিনি আমাদেরলায়েক।

এরই মধ্যে হঠাৎ এসে হাজির হলেন আমাদের বড় ভাই, ৯৩ ব্যাচের ফয়জুল ইসলাম সায়েম ভাই।

তাঁর মধ্যে আমি আমার অগ্রজ শাহ আলম রাজন ভাইয়ের অনেকটা মিল খুঁজে পাই।

সায়েম ভাইকে দেখলেই মনে হয়, জালালপুরের মাটি থেকে যেন হাসি–আনন্দের কোনো এক প্রতিনিধিউঠে এসেছেন। তাঁর আগমনে আড্ডায় যেন আরও একটু প্রাণ ফিরে এলো।

শাহীন-এর ঘরে আরেক অধ্যায়-

দিন শেষে যখন রাত নেমে এলো, তখন শুরু হলো আতিথেয়তার দ্বিতীয় অধ্যায়।

যারা ব্রিটেনের বাইরে থেকে এসেছি, আমাদের থাকার ব্যবস্থা করলেন বন্ধু জিয়াউল শাহীন।

আমি, বাবর, হারুন ও ফয়সল গিয়ে উঠলাম সাউথএন্ডে শাহীন–এর বাসায়।

তারপর শুরু হলো শাহীন–এর ‘খিদমত’।

মনে হচ্ছিল, লায়েক আর শাহীন–এর মধ্যে যেন এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলছে—

“বন্ধুকে কে একটু বেশি আপন করে নিতে পারে?”

আমরা অতিথিরা অবশ্য সেই প্রতিযোগিতার বিচারক হতে রাজি নই। কারণ, দুই পক্ষেরভালোবাসাতেই আমরা সমানভাবে ঋণী!

শাহীন–এর আতিথেয়তা আমাকে আবার মনে করিয়ে দিল—বন্ধুত্বের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, এখানে দরজার সঙ্গে হৃদয়ের দরজাটিও খুলে যায়।

বার্সেলোনার পথে-

পরদিন আমরা রওনা হলাম বার্সেলোনার উদ্দেশে। এক শহর থেকে আরেক শহরে যাওয়া—ভ্রমণেরদৃষ্টিতে হয়তো খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা। কিন্তু আমাদের কাছে এর অর্থ ছিল আরও বড়। কারণ, সামনে ছিল নতুন শহর, আর সেই শহরে অপেক্ষা করছিল আরেক বন্ধু।

বার্সেলোনা এয়ারপোর্টে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন মিনহার মাহমুদ আর আমাদের জন্য দুই দিন পর্তুগাল থেকে  বার্সিলোনায় আসা বন্ধু শরীফ আহসান।

এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করা দিয়ে তাঁর দায়িত্ব শুরু। এরপর ট্যুরের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ছিলেনআমাদের ছায়ার মতো।

কে কোথায় যাবে, কীভাবে যাবে, কার কী প্রয়োজন—সবকিছুর প্রতি তাঁর ছিল আন্তরিক নজর।

মনে হচ্ছিল, আমরা কোনো পর্যটকদল নই; আমরা যেন এক পরিবারের মানুষ, আর মিনহার সেইপরিবারের অভিভাবকের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে।

সাগরের নোনা জলে বন্ধুদের সাথে

ব্যস্ততার মাঝেও মানুষকে সময় দেওয়া যায়, চাইলে মানুষের জন্য নিজের সময়টুকু আলাদা করে রাখাযায়—মিনহার তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

আমরা যারা নিজেদের খুব সামাজিক মনে করি, লায়েক, শাহীন ও মিনহারের কাছ থেকে আমাদেরঅনেক কিছু শেখার আছে।

বার্সেলোনার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে, শহরের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে, কোথাও বসে গল্প করতে করতেবারবার মনে হচ্ছিল—শহর আসলে যতই সুন্দর হোক, ভ্রমণের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য মানুষ।

আর আমাদের মানুষগুলো ছিল অসাধারণ।

বন্ধুত্বের কাছে হার মানল দূরত্ব ও ব্যস্ততা

এই সফরের আরেকটি হৃদয়ছোঁয়া অধ্যায় আমাদের বিনোদন সম্রাট শরীফ আহসান।

শরীফ তাঁর ভাগ্নে জুমেলকে সঙ্গে নিয়ে সুদূর পর্তুগাল থেকে নিজের গাড়িতে প্রায় ১৭–১৮ ঘণ্টা ড্রাইভ করে, মাদ্রিদ হয়ে বার্সেলোনায় এসে হাজির!

কেউ তাকে ডাকেনি বাধ্যতামূলকভাবে। কোনো আনুষ্ঠানিক দায়িত্বও ছিল না।

ছিল শুধু বন্ধুত্ব।

ছিল বন্ধুদের সঙ্গে কিছু সময় কাটানোর আকাঙ্ক্ষা।

যারা শরীফকে কাছ থেকে চেনেন, তারা জানেন—কতটা ব্যস্ত তাঁর জীবন। কিন্তু সেদিন মনে হলো, মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ক আছে, যাদের সামনে ব্যস্ততার অজুহাতও ছোট হয়ে যায়।

    বার্সেলোনা দর্শনের এক মুহূর্ত

বন্ধুত্বের কাছে ব্যস্ততাও যে হার মানতে পারে, শরীফ যেন তারই এক উজ্জ্বল প্রমাণ।

আর আমাদের আমেরিকান বন্ধু বাবর—তাকে নিয়ে দু–একটি কথা না বললে এই গল্প অসম্পূর্ণ থেকেযাবে।

বাবর যেন ব্যাচ ৯৪–এর বহু প্রতিভার অধিকারী এক অঘোষিত সম্রাট!

তাকে দেখলে মাঝে মাঝে সত্যিই মনে হয়—

“আমি কেন বাবর হলাম না!”

তার মধ্যে এমন এক প্রাণচাঞ্চল্য আছে, যা খুব সহজেই অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন পরদেখা হলেও তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মনে হয়নি ৩২ বছর কেটে গেছে।

মনে হয়েছে, গতকালই যেন স্কুলের করিডোরে দেখা হয়েছিল।

এটাই বন্ধুত্বের জাদু।

আর ছিলেন আমাদের বহু প্রতিভাবান প্রফেসর বন্ধু শামসুল ইসলাম।

এই সফরে তাঁর ভূমিকা ছিল অনেকটা আমাদের ‘যোগাযোগমন্ত্রীর’ মতো।

লন্ডনের ট্রান্সপোর্টেশন থেকে শুরু করে বন্ধুদের এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করা, কোথা থেকে কোথায়যেতে হবে—সবকিছুর ব্যাপারেই তাঁর ছিল চমৎকার পরিকল্পনা।

বার্সেলোনা সফরটাকেও সফল ও নির্বিঘ্ন করতে তাঁর গাইডলাইন ছিল নিখুঁত।

তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল—

এ যেন শুধু কলেজের প্রফেসর নন, যোগাযোগ ব্যবস্থাপনারও প্রফেসর!

শেষে হিসাব মেলাতে গিয়ে

সফরের শেষদিকে এসে হঠাৎ মনে হলো—এত কিছু লিখলাম, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটিই তোবলা হয়নি।

কেউ যদি আমাকে প্রশ্ন করেন—

“এই সফরে কার অবদান সবচেয়ে বেশি?”

আমি বলব—

সবাই ছিল সেরাদের সেরা।

কেউ আতিথেয়তায়, কেউ ব্যবস্থাপনায়, কেউ বিনোদনে, কেউ পরিকল্পনায়, কেউ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে, কেউ সময় দিয়ে, কেউ শুধু নিজের উপস্থিতি দিয়ে—প্রত্যেকেই এই সফরকে স্মরণীয় করে তুলেছে।

শুধু আমি—

সবার কাছ থেকে নিয়েছি,
দিতে পারিনি কিছুই।

হয়তো এটাই সত্যি।

কারণ বন্ধুত্বের সম্পর্ক কখনো হিসাবের খাতায় লেখা যায় না।

লেখক: আয়ারল্যান্ড প্রবাসী, সমাজকর্মী ।