ঢাকা ০৭:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ৩০ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
ধাতব দ্বৈততার মূল্য-ভ্রান্তি মেশকাতুন নাহার গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষায় নারীর পিছিয়ে থাকা: একঅদৃশ্য সংকট অহংকারের অদৃশ্য ভুঁড়ি ও নিঃসঙ্গতার নীরব জ্যামিতি ব্রেক্সিট-পরবর্তী নিয়মে কিছু ক্ষেত্রে ইইউ নাগরিকদের আবাসিক অধিকার বাতিল শুরু করতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ইউকে ওয়েলস আওয়ামী লীগ নবকন্ঠ ক্ষুদে ফুটবল টুর্নামেন্টে ফ্রান্স টাইগারকে হারিয়ে ফ্রান্স লায়ন বিজয়ী ইরান-যুক্তরাষ্ট্র প্রথম দফার আলোচনা ‘ইতিবাচক’ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ  নিয়ে এরদোয়ানের সঙ্গে ম্যাক্রোঁর আলোচনা বাংলাদেশিদের ভিসা নিয়ে ভিসা নিয়ে ইউরোপের ১৩ দেশের যৌথ নির্দেশনা ইরানের দেওয়া ১০ দফা প্রস্তাবকে ‌‘বাস্তবায়নযোগ্য’ বললেন ট্রাম্প

অহংকারের অদৃশ্য ভুঁড়ি ও নিঃসঙ্গতার নীরব জ্যামিতি

  • আপডেট সময় ০৯:০৯:০৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬
  • ৯ বার পড়া হয়েছে

Screenshot

মেশকাতুন নাহার : অহংকার এক অন্তর্লীন বিস্তার—তার কোনো দৃশ্যমান অবয়ব নেই, তবুও সে মানুষের চেতনার ভেতরে এমনভাবে বৃদ্ধি পায়, যেন অদৃশ্য কোনো ভুঁড়ি ক্রমাগত স্ফীত হচ্ছে। এই স্ফীতি শরীরের নয়, বরং অস্তিত্বের; এটি এমন এক ভার, যা বহন করা হয় অনুভূতির গভীরে, কিন্তু যার উপস্থিতি সচেতন দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায়। মানুষ আয়নায় নিজেকে দেখে, কিন্তু সে কেবল বাহ্যিক আকৃতি পর্যবেক্ষণ করে; অন্তর্গত এই স্ফীতির প্রতিফলন সেখানে ধরা পড়ে না। ফলে এক ধরনের অস্তিত্বগত বিভ্রম জন্ম নেয়—যেখানে ব্যক্তি নিজেকে অপরিবর্তিত মনে করে, অথচ তার ভেতরে এক নীরব রূপান্তর ঘটে চলেছে।
এই রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে “আমি”—মানবচেতনার সেই মৌলিক বিন্দু, যা থেকে সমস্ত অভিজ্ঞতার সূচনা। কিন্তু যখন এই “আমি” নিজের পরিসর অতিক্রম করে একক আধিপত্যের দিকে অগ্রসর হয়, তখন তা আর স্বাভাবিক আত্মপরিচয় থাকে না; বরং তা অহংকারে রূপান্তরিত হয়। এই অহংকার নিজেকে উচ্চকিত করে না, বরং অন্য সব সত্তাকে প্রান্তিক করে তোলে। ফলে অস্তিত্বের সমতল ভেঙে যায়, এবং সেখানে এক অদৃশ্য জ্যামিতি গড়ে ওঠে—যেখানে দূরত্বগুলো পরিমাপ করা হয় অনুভূতির বিচ্ছিন্নতায়, আর নৈকট্য নির্ধারিত হয় বিনয়ের পরিসরে।
সমসাময়িক সময় এই অন্তর্গত স্ফীতিকে এক নতুন পরিসর দিয়েছে। ভার্চুয়াল বাস্তবতার বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে মানুষ নিজের একটি নির্মিত প্রতিরূপ উপস্থাপন করে—যেখানে নির্বাচিত সাফল্য, পরিশীলিত অনুভূতি এবং প্রক্ষিপ্ত সৌন্দর্য মিলিয়ে এক বিকল্প সত্তা গড়ে ওঠে। এই সত্তা বাস্তবের চেয়ে অধিক গ্রহণযোগ্য, অধিক প্রশংসিত। প্রতিটি স্বীকৃতি সেখানে একেকটি প্রতীকী পুষ্টি, যা অহংকারের অদৃশ্য ভুঁড়িকে আরও স্ফীত করে তোলে। কিন্তু এই পুষ্টি বাস্তবতার মাটিতে প্রোথিত নয়; এটি ভাসমান, ক্ষণস্থায়ী, এবং প্রায়শই বিভ্রমমূলক।
এই বিভ্রমই মানুষকে নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন করে। সে ধীরে ধীরে নিজের প্রকৃত সত্তা থেকে সরে গিয়ে এক নির্মিত পরিচয়ের সঙ্গে সংলাপে আবদ্ধ হয়। তখন তার কথোপকথন আর অন্যের সঙ্গে নয়; বরং নিজের প্রতিচ্ছবির সঙ্গে। এই আত্মমুখী সংলাপের ভেতরেই সম্পর্কের স্বাভাবিক প্রবাহ থেমে যায়। কারণ যেখানে অন্যের জন্য স্থান নেই, সেখানে সংযোগের সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে পড়ে।
অহংকারের জ্যামিতি এক ধরনের দূরত্ব-নির্মাণের প্রক্রিয়া। এটি দৃশ্যমান দেয়াল তোলে না, কিন্তু এমন এক পরিসর তৈরি করে, যেখানে অন্যরা প্রবেশ করতে সংকোচ বোধ করে। এই সংকোচ প্রথমে সূক্ষ্ম—কথার ভঙ্গিতে, দৃষ্টির ভেতরে, আচরণের সূক্ষ্ম ইঙ্গিতে। কিন্তু ধীরে ধীরে এটি স্থায়ী রূপ নেয়, এবং একসময় তা এমন এক ব্যবধানে পরিণত হয়, যা আর সহজে অতিক্রম করা যায় না। এই ব্যবধানই নিঃসঙ্গতার জন্ম দেয়—একটি নিঃসঙ্গতা, যা কোলাহলের মধ্যেও গভীরভাবে অনুভূত হয়।
বর্তমান সমাজে এই প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। পদমর্যাদা, সম্পদ, জনপ্রিয়তা—এসবই মানুষের আত্মপরিচয়ের উপাদান হয়ে উঠেছে। কিন্তু যখন এই উপাদানগুলো আত্মমর্যাদার সীমা অতিক্রম করে, তখন তারা অহংকারের খাদ্যে পরিণত হয়। মানুষ তখন নিজের উচ্চতা পরিমাপ করে অন্যদের তুলনায়, এবং এই তুলনাই তাকে বিচ্ছিন্ন করে তোলে। কারণ তুলনার ভেতরে সবসময়ই এক ধরনের দূরত্ব নিহিত থাকে—যেখানে সমতা অনুপস্থিত।
অপরদিকে, বিনয় এক ভিন্ন জ্যামিতির জন্ম দেয়। এটি সংকোচন নয়, বরং বিস্তার—যেখানে ব্যক্তি নিজের পরিসর এমনভাবে নির্মাণ করে, যাতে অন্যদের জন্য জায়গা তৈরি হয়। বিনয়ী মানুষের ভেতরে কোনো অদৃশ্য প্রাচীর থাকে না; বরং সেখানে এক ধরনের উন্মুক্ততা বিরাজ করে, যা অন্যদের আহ্বান জানায়। এই উন্মুক্ততাই সংযোগের ভিত্তি, এবং এই সংযোগই মানুষের অস্তিত্বকে পূর্ণতা দেয়।
অহংকার হ্রাসের কোনো বাহ্যিক পদ্ধতি নেই, কারণ এটি বাহ্যিক নয়; এটি সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ। এটি কমাতে হয় সচেতনতার আলোয়, আত্মসমালোচনার সাহসে, এবং আত্মপর্যালোচনার নীরবতায়। মানুষ যখন নিজেকে প্রশ্ন করতে শেখে—“আমি কি অন্যদের জন্য পরিসর রাখছি?”—তখনই সে এই অদৃশ্য স্ফীতির অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে পারে। এই উপলব্ধিই পরিবর্তনের সূচনা।
দার্শনিকভাবে, মানুষের প্রকৃত পরিমাপ তার উচ্চতায় নয়, বরং তার পরিসরে। সে কতটা জায়গা দখল করেছে, তা নয়; বরং সে কতটা জায়গা ছেড়ে দিয়েছে—এই পরিমাপই তার মানবিকতার মান নির্ধারণ করে। কারণ যে ব্যক্তি নিজের জন্য সবকিছু সংরক্ষণ করে, সে শেষ পর্যন্ত নিজের মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি নিজের পরিসরকে উন্মুক্ত রাখে, সে অন্যদের সঙ্গে এক অবিচ্ছিন্ন সংযোগে আবদ্ধ থাকে।
এই সংযোগের সবচেয়ে সরল প্রতীক হলো কোলাকুলি—একটি শারীরিক ক্রিয়া, যা আসলে গভীর মানসিক সেতুবন্ধনের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু এই সেতু তখনই নির্মিত হয়, যখন দুইজন মানুষের মধ্যে কোনো অদৃশ্য বাধা থাকে না। অহংকার সেই বাধা তৈরি করে, এবং তা এতটাই সূক্ষ্ম যে, আমরা প্রায়শই তার উপস্থিতি অনুভব করতে পারি না।
অতএব, আমাদের প্রয়োজন এক অন্তর্মুখী যাত্রা—যেখানে আমরা নিজের ভেতরের এই অদৃশ্য ভুঁড়ির দিকে তাকাবো। আমরা বুঝতে চেষ্টা করব, আমাদের স্ফীতি কি আমাদের বিস্তৃত করছে, নাকি সংকুচিত করছে। কারণ প্রকৃত বিস্তার সেই, যা অন্যদের জন্য স্থান তৈরি করে; আর প্রকৃত সংকোচন সেই, যা নিজের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে।
সময়ের দাবি আজ এই—আমরা আমাদের অস্তিত্বের জ্যামিতি নতুন করে আঁকি। এমন এক জ্যামিতি, যেখানে দূরত্ব কমে আসে, এবং নৈকট্য বৃদ্ধি পায়। যেখানে “আমি” শব্দটি “আমরা”-তে রূপান্তরিত হয়। কারণ এই রূপান্তরই মানুষের প্রকৃত বিবর্তন—একক সত্তা থেকে সমষ্টিগত চেতনার দিকে অগ্রসর হওয়া।
শেষ পর্যন্ত, মানুষ বড় হয় না তার প্রাপ্তিতে, বরং তার প্রদানেই। সে উঁচু হয় না তার অবস্থানে, বরং তার উন্মুক্ততায়। আর এই উন্মুক্ততার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো অহংকার—এক অদৃশ্য ভুঁড়ি, যা মানুষকে ভেতর থেকে ভারী করে তোলে, এবং ধীরে ধীরে তাকে তার নিজের তৈরি নিঃসঙ্গতার জালে আবদ্ধ করে।
তাই হয়তো প্রয়োজন—শুধু বাহ্যিক নয়, অন্তর্গত এক সংযম। অহংকারের স্ফীতি কমিয়ে, বিনয়ের জন্য স্থান তৈরি করা। কারণ যেখানে বিনয় থাকে, সেখানে সংযোগ জন্ম নেয়; আর যেখানে সংযোগ থাকে, সেখানে মানুষ কখনো একা থাকে না।
লেখক : প্রভাষক সমাজকর্ম , কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ,
চাঁদপুর।
ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

লক ডাউন পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় ফ্রান্সে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি

যুক্তরাজ্যে করোনার মধ্যেই শিশুদের মাঝে নতুন রোগের হানা

ধাতব দ্বৈততার মূল্য-ভ্রান্তি মেশকাতুন নাহার

অহংকারের অদৃশ্য ভুঁড়ি ও নিঃসঙ্গতার নীরব জ্যামিতি

আপডেট সময় ০৯:০৯:০৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬
মেশকাতুন নাহার : অহংকার এক অন্তর্লীন বিস্তার—তার কোনো দৃশ্যমান অবয়ব নেই, তবুও সে মানুষের চেতনার ভেতরে এমনভাবে বৃদ্ধি পায়, যেন অদৃশ্য কোনো ভুঁড়ি ক্রমাগত স্ফীত হচ্ছে। এই স্ফীতি শরীরের নয়, বরং অস্তিত্বের; এটি এমন এক ভার, যা বহন করা হয় অনুভূতির গভীরে, কিন্তু যার উপস্থিতি সচেতন দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায়। মানুষ আয়নায় নিজেকে দেখে, কিন্তু সে কেবল বাহ্যিক আকৃতি পর্যবেক্ষণ করে; অন্তর্গত এই স্ফীতির প্রতিফলন সেখানে ধরা পড়ে না। ফলে এক ধরনের অস্তিত্বগত বিভ্রম জন্ম নেয়—যেখানে ব্যক্তি নিজেকে অপরিবর্তিত মনে করে, অথচ তার ভেতরে এক নীরব রূপান্তর ঘটে চলেছে।
এই রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে “আমি”—মানবচেতনার সেই মৌলিক বিন্দু, যা থেকে সমস্ত অভিজ্ঞতার সূচনা। কিন্তু যখন এই “আমি” নিজের পরিসর অতিক্রম করে একক আধিপত্যের দিকে অগ্রসর হয়, তখন তা আর স্বাভাবিক আত্মপরিচয় থাকে না; বরং তা অহংকারে রূপান্তরিত হয়। এই অহংকার নিজেকে উচ্চকিত করে না, বরং অন্য সব সত্তাকে প্রান্তিক করে তোলে। ফলে অস্তিত্বের সমতল ভেঙে যায়, এবং সেখানে এক অদৃশ্য জ্যামিতি গড়ে ওঠে—যেখানে দূরত্বগুলো পরিমাপ করা হয় অনুভূতির বিচ্ছিন্নতায়, আর নৈকট্য নির্ধারিত হয় বিনয়ের পরিসরে।
সমসাময়িক সময় এই অন্তর্গত স্ফীতিকে এক নতুন পরিসর দিয়েছে। ভার্চুয়াল বাস্তবতার বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে মানুষ নিজের একটি নির্মিত প্রতিরূপ উপস্থাপন করে—যেখানে নির্বাচিত সাফল্য, পরিশীলিত অনুভূতি এবং প্রক্ষিপ্ত সৌন্দর্য মিলিয়ে এক বিকল্প সত্তা গড়ে ওঠে। এই সত্তা বাস্তবের চেয়ে অধিক গ্রহণযোগ্য, অধিক প্রশংসিত। প্রতিটি স্বীকৃতি সেখানে একেকটি প্রতীকী পুষ্টি, যা অহংকারের অদৃশ্য ভুঁড়িকে আরও স্ফীত করে তোলে। কিন্তু এই পুষ্টি বাস্তবতার মাটিতে প্রোথিত নয়; এটি ভাসমান, ক্ষণস্থায়ী, এবং প্রায়শই বিভ্রমমূলক।
এই বিভ্রমই মানুষকে নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন করে। সে ধীরে ধীরে নিজের প্রকৃত সত্তা থেকে সরে গিয়ে এক নির্মিত পরিচয়ের সঙ্গে সংলাপে আবদ্ধ হয়। তখন তার কথোপকথন আর অন্যের সঙ্গে নয়; বরং নিজের প্রতিচ্ছবির সঙ্গে। এই আত্মমুখী সংলাপের ভেতরেই সম্পর্কের স্বাভাবিক প্রবাহ থেমে যায়। কারণ যেখানে অন্যের জন্য স্থান নেই, সেখানে সংযোগের সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে পড়ে।
অহংকারের জ্যামিতি এক ধরনের দূরত্ব-নির্মাণের প্রক্রিয়া। এটি দৃশ্যমান দেয়াল তোলে না, কিন্তু এমন এক পরিসর তৈরি করে, যেখানে অন্যরা প্রবেশ করতে সংকোচ বোধ করে। এই সংকোচ প্রথমে সূক্ষ্ম—কথার ভঙ্গিতে, দৃষ্টির ভেতরে, আচরণের সূক্ষ্ম ইঙ্গিতে। কিন্তু ধীরে ধীরে এটি স্থায়ী রূপ নেয়, এবং একসময় তা এমন এক ব্যবধানে পরিণত হয়, যা আর সহজে অতিক্রম করা যায় না। এই ব্যবধানই নিঃসঙ্গতার জন্ম দেয়—একটি নিঃসঙ্গতা, যা কোলাহলের মধ্যেও গভীরভাবে অনুভূত হয়।
বর্তমান সমাজে এই প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। পদমর্যাদা, সম্পদ, জনপ্রিয়তা—এসবই মানুষের আত্মপরিচয়ের উপাদান হয়ে উঠেছে। কিন্তু যখন এই উপাদানগুলো আত্মমর্যাদার সীমা অতিক্রম করে, তখন তারা অহংকারের খাদ্যে পরিণত হয়। মানুষ তখন নিজের উচ্চতা পরিমাপ করে অন্যদের তুলনায়, এবং এই তুলনাই তাকে বিচ্ছিন্ন করে তোলে। কারণ তুলনার ভেতরে সবসময়ই এক ধরনের দূরত্ব নিহিত থাকে—যেখানে সমতা অনুপস্থিত।
অপরদিকে, বিনয় এক ভিন্ন জ্যামিতির জন্ম দেয়। এটি সংকোচন নয়, বরং বিস্তার—যেখানে ব্যক্তি নিজের পরিসর এমনভাবে নির্মাণ করে, যাতে অন্যদের জন্য জায়গা তৈরি হয়। বিনয়ী মানুষের ভেতরে কোনো অদৃশ্য প্রাচীর থাকে না; বরং সেখানে এক ধরনের উন্মুক্ততা বিরাজ করে, যা অন্যদের আহ্বান জানায়। এই উন্মুক্ততাই সংযোগের ভিত্তি, এবং এই সংযোগই মানুষের অস্তিত্বকে পূর্ণতা দেয়।
অহংকার হ্রাসের কোনো বাহ্যিক পদ্ধতি নেই, কারণ এটি বাহ্যিক নয়; এটি সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ। এটি কমাতে হয় সচেতনতার আলোয়, আত্মসমালোচনার সাহসে, এবং আত্মপর্যালোচনার নীরবতায়। মানুষ যখন নিজেকে প্রশ্ন করতে শেখে—“আমি কি অন্যদের জন্য পরিসর রাখছি?”—তখনই সে এই অদৃশ্য স্ফীতির অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে পারে। এই উপলব্ধিই পরিবর্তনের সূচনা।
দার্শনিকভাবে, মানুষের প্রকৃত পরিমাপ তার উচ্চতায় নয়, বরং তার পরিসরে। সে কতটা জায়গা দখল করেছে, তা নয়; বরং সে কতটা জায়গা ছেড়ে দিয়েছে—এই পরিমাপই তার মানবিকতার মান নির্ধারণ করে। কারণ যে ব্যক্তি নিজের জন্য সবকিছু সংরক্ষণ করে, সে শেষ পর্যন্ত নিজের মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি নিজের পরিসরকে উন্মুক্ত রাখে, সে অন্যদের সঙ্গে এক অবিচ্ছিন্ন সংযোগে আবদ্ধ থাকে।
এই সংযোগের সবচেয়ে সরল প্রতীক হলো কোলাকুলি—একটি শারীরিক ক্রিয়া, যা আসলে গভীর মানসিক সেতুবন্ধনের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু এই সেতু তখনই নির্মিত হয়, যখন দুইজন মানুষের মধ্যে কোনো অদৃশ্য বাধা থাকে না। অহংকার সেই বাধা তৈরি করে, এবং তা এতটাই সূক্ষ্ম যে, আমরা প্রায়শই তার উপস্থিতি অনুভব করতে পারি না।
অতএব, আমাদের প্রয়োজন এক অন্তর্মুখী যাত্রা—যেখানে আমরা নিজের ভেতরের এই অদৃশ্য ভুঁড়ির দিকে তাকাবো। আমরা বুঝতে চেষ্টা করব, আমাদের স্ফীতি কি আমাদের বিস্তৃত করছে, নাকি সংকুচিত করছে। কারণ প্রকৃত বিস্তার সেই, যা অন্যদের জন্য স্থান তৈরি করে; আর প্রকৃত সংকোচন সেই, যা নিজের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে।
সময়ের দাবি আজ এই—আমরা আমাদের অস্তিত্বের জ্যামিতি নতুন করে আঁকি। এমন এক জ্যামিতি, যেখানে দূরত্ব কমে আসে, এবং নৈকট্য বৃদ্ধি পায়। যেখানে “আমি” শব্দটি “আমরা”-তে রূপান্তরিত হয়। কারণ এই রূপান্তরই মানুষের প্রকৃত বিবর্তন—একক সত্তা থেকে সমষ্টিগত চেতনার দিকে অগ্রসর হওয়া।
শেষ পর্যন্ত, মানুষ বড় হয় না তার প্রাপ্তিতে, বরং তার প্রদানেই। সে উঁচু হয় না তার অবস্থানে, বরং তার উন্মুক্ততায়। আর এই উন্মুক্ততার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো অহংকার—এক অদৃশ্য ভুঁড়ি, যা মানুষকে ভেতর থেকে ভারী করে তোলে, এবং ধীরে ধীরে তাকে তার নিজের তৈরি নিঃসঙ্গতার জালে আবদ্ধ করে।
তাই হয়তো প্রয়োজন—শুধু বাহ্যিক নয়, অন্তর্গত এক সংযম। অহংকারের স্ফীতি কমিয়ে, বিনয়ের জন্য স্থান তৈরি করা। কারণ যেখানে বিনয় থাকে, সেখানে সংযোগ জন্ম নেয়; আর যেখানে সংযোগ থাকে, সেখানে মানুষ কখনো একা থাকে না।
লেখক : প্রভাষক সমাজকর্ম , কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ,
চাঁদপুর।