ড. মো: বিল্লাল হোসেন : বর্তমান বিশ্বে উন্নয়ন, প্রযুক্তি ও অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গণিত ভিত্তিক শিক্ষা। এই ক্ষেত্রগুলোকে সম্মিলিতভাবে বলাহয় STEM (Science, Technology, Engineering, Mathematics) Education.কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো,বিশ্বব্যাপী নারীদেরঅংশগ্রহণ এখনো এই ক্ষেত্রগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে কম। একবিংশশতাব্দীর এই সময়েও গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষায় নারীদের পিছিয়ে থাকাশিক্ষাব্যবস্থার এক অদৃশ্য সংকটই বলা যায়।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও প্রতিবেদনে দেখা যায় যে বিশ্বে STEM বিষয়ে স্নাতক শিক্ষার্থীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা মাত্র প্রায় ৩৫%। প্রযুক্তিনির্ভর কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ আরও কম। যেমন– কৃত্রিমবুদ্ধিমত্তা ও ডেটা সায়েন্স এইসব খাতে নারীর অংশ মাত্র ২৬%, প্রকৌশলে প্রায় ১৫%, আর ক্লাউড কম্পিউটিংয়ে মাত্র ১২%। গবেষণাআরও দেখায় বিশ্বব্যাপী গবেষকদের মধ্যে নারীর অংশ প্রায় ৩৩%। অর্থ্যাৎ শিক্ষা ব্যবস্থায় মেয়েরা সাধারণ শিক্ষায় এগিয়ে থাকলেও গণিতও বিজ্ঞান ভিত্তিক বিষয়ে তাদের উপস্থিতি এখনও সীমিত।
গবেষণায় দেখা গেছে যে গণিত দক্ষতায় মেয়েরা প্রায়শই ছেলেদের সমানবা কখনো বেশি ভালো ফলাফল করলেও আত্মবিশ্বাসের অভাবেঅনেক শিক্ষার্থী গণিতকে কঠিন বা “ছেলেদের বিষয়” হিসেবে মনে করে।ফলে STEM বিষয়গুলোতে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের অংশগ্রহণ কমদেখা যায়। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধ্যানধারণার কারনে অনেক সমাজেএখনও বিজ্ঞান, প্রযুক্তি বা প্রকৌশলকে পুরুষপ্রধান পেশা হিসেবে দেখাহয়। এই ধরনের সামাজিক ধারণা ছোটবেলা থেকেই মেয়েদেরমানসিকতায় প্রভাব ফেলে। পরিবার, শিক্ষক বা সমাজ নিজেদেরঅজান্তেই মেয়েদের প্রকৌশল বা প্রযুক্তি বিষয়ে কম উৎসাহ দেয়।
পাঠ্যবই ও শিক্ষাব্যবস্থায় একধরনের লুকানো পক্ষপাত থাকে যেমন– পাঠ্যক্রম ও শ্রেণিকক্ষের উপস্থাপনায় প্রায়শই পুরুষ বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকদের উদাহরণ বেশি থাকে। ফলে মেয়েরা নিজেদের জন্য রোলমডেল কম খুঁজে পায়। গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষায় মেয়েদের পিছিয়ে থাকাকেবল একটি সামাজিক সমস্যা নয় এটি শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগতসংকটও। STEM বিষয়ে নারী শিক্ষক ও গবেষকের সংখ্যা কম হওয়ায়মেয়েরা অনুপ্রেরণার উৎস কম পায়। যখন শিক্ষার্থীরা তাদের মতোকাউকে সফল হতে দেখে না, তখন সেই ক্ষেত্রের প্রতি আগ্রহও কমে যায়।
সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে শৈশব থেকেই শিশুদের গণিত ও বিজ্ঞানভীতিদূর করা, প্রাথমিক স্তর থেকেই অনুসন্ধানভিত্তিক ও আনন্দময় গণিত-বিজ্ঞান শিক্ষা চালু করা, গণিতকে কঠিন নয় বরং সমস্যা সমাধানেরআনন্দ হিসেবে উপস্থাপন করা জরুরি। নারী রোল মডেল তৈরি করাএবং মেয়েদের সামনে সফল নারী বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদেরউদাহরণ তুলে ধরতে হবে। এতে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে। মেয়েদেরজন্য STEM বিষয়ে বৃত্তি, গবেষণা অনুদান, প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ ও মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম চালু করা প্রয়োজন। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমেশ্রেণিকক্ষে লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষক যদি মেয়েদেরসমানভাবে উৎসাহ দেন, তাহলে অংশগ্রহণও বাড়বে।
বিশ্বের কিছু কিছু দেশে STEM শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণতুলনামূলকভাবে বেশি। এর প্রধান কারণ হলো—সুশৃঙ্খল শিক্ষা নীতি, লিঙ্গসমতার সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তি শিক্ষায় সরকারি উৎসাহ। যেমন – রোমানিয়া, পোল্যান্ড, গ্রিস, ইতালি। রোমানিয়ায় STEM গ্র্যাজুয়েটদেরমধ্যে নারীর হার প্রায় ৪২.৫%। দক্ষিণ এশিয়া, পূর্ব এশিয়া এবং এমনকি কিছু উন্নত দেশেও নারীরা গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষায় পিছিয়ে তথাSTEM শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এই পিছিয়েথাকার প্রধান কারণ হলো সামাজিক ধারণা অর্থাৎ বিজ্ঞান ও প্রকৌশলকে “পুরুষের পেশা” হিসেবে দেখা হয়। গণিতভীতি ও আত্মবিশ্বাসের অভাব, রোল মডেলের অভাব, নারী বিজ্ঞানীর সংখ্যাকম হওয়ায় অনুপ্রেরণা কম।
বাংলাদেশে মেয়েদের সাধারণ শিক্ষায় অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। স্কুল ও কলেজে মেয়েদের উপস্থিতি অনেক ক্ষেত্রে ছেলেদের সমান বা বেশি। তবেSTEM বিষয়ে এখনও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে যেমন – মাধ্যমিক পর্যায়েবিজ্ঞান বিভাগে মেয়েদের সংখ্যা তুলনামূলক কম। বিজ্ঞান গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি খাতে নারী গবেষকের সংখ্যা কম। গণিত ও বিজ্ঞানশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণের বৈষম্য একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা। কোথাওনীতি ও সামাজিক সহায়তার কারণে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে, আবারকোথাও সামাজিক মানসিকতা ও শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণেতারা পিছিয়ে পড়ছে। তাই ভবিষ্যতের শিক্ষা পরিকল্পনায় তিনটি বিষয়অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— শৈশব থেকেই গণিতভীতি দূর করা, নারী বিজ্ঞানীররোল মডেল তুলে ধরা, মেয়েদের জন্য প্রযুক্তি ও গবেষণা সুযোগ বৃদ্ধিকরা।তবে ইতিবাচক দিক হলো এসব ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ দ্রুতবাড়ছে।
গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষায় মেয়েদের পিছিয়ে থাকা কেবল একটিপরিসংখ্যানগত সমস্যা নয়, এটি সমাজের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সঙ্গেওগভীরভাবে জড়িত। আধুনিক বিশ্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানবসভ্যতারঅগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি। অতএব, গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষায়মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ানো কেবল নারী উন্নয়নের বিষয়ই নয় বরং এটিটেকসই উন্নয়ন, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনেরঅপরিহার্য শর্ত। এই অদৃশ্য সংকট চিহ্নিত করে শিক্ষাব্যবস্থায় কার্যকরপদক্ষেপ নেয়ার সময় এখনই।
লেখক : উপাধ্যক্ষ, মোশাররফ হোসেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কাঁচপুর, সোনারগাঁও, নারায়নগঞ্ ।


















