দর্পণ ডেস্ক
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে ব্রিটেনের বের হয়ে যাওয়ার দশক পূর্ণ হলো আজ। ২০১৬ সালের ২৩ জুন অনুষ্ঠিত গণভোটে ৫২ শতাংশ ভোটার ইইউ ছাড়ার পক্ষে এবং ৪৮ শতাংশ বিপক্ষে ভোট দেন।
১০ বছর আগের সেই সিদ্ধান্ত শুধু ইইউর সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্কই বদলে দেয়নি, বরং দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনেও নজিরবিহীন দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলা ও মেরুকরণ সৃষ্টি করে।
গণভোটের পরদিনই পদত্যাগ করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন, যিনি গণভোটের আয়োজন করলেও ইইউতে থাকার পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার দুই বছর ক্ষমতায় থাকার পর পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। এ নিয়ে মাত্র এক দশকে ৬ জন প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতা ছাড়তে বা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।
দেশটি এখন সপ্তম প্রধানমন্ত্রীর অপেক্ষায়।
দুর্বল অর্থনীতি, প্রশাসনিক অকার্যকারিতা এবং বিভক্ত জনমতের মতো সমস্যাগুলোকে ব্রেক্সিট-পরবর্তী বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এত বেশি নেতৃত্ব পরিবর্তনের নজির দেখা যায়নি।
নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার প্রতিশ্রুতি
ব্রেক্সিটপন্থীরা দাবি করেছিলেন, ইইউ ছাড়লে ব্রিটেন তার আইন, অর্থনীতি ও সীমান্তের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন গণভোটের আগে বলেছিলেন, ‘আমাদের সামনে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত হচ্ছে।’
তবে ইতিহাসবিদ মার্গারেট ম্যাকমিলানের মতে, ব্রেক্সিটের পেছনে ছিল অভিবাসনবিরোধী মনোভাব, ইইউর বিধিনিষেধ নিয়ে অসন্তোষ এবং অতীতের ব্রিটিশ গৌরব ফিরিয়ে আনার আকাঙ্ক্ষা।
কিং
এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ব্রেক্সিটের বাস্তব পরিণতি কী হতে পারে, তা কখনোই পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি।’
বাস্তবতা ও প্রতিশ্রুতির ধাক্কা
গণভোটের পর ব্রিটেন ও ইইউর বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল হয়ে ওঠে। ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ ত্যাগ করে যুক্তরাজ্য।
কিন্তু বাণিজ্য, অভিবাসন ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে জটিলতা থেকেই যায়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে গ্রহণযোগ্য বিচ্ছেদ চুক্তি করতে ব্যর্থ হয়ে পদত্যাগ করেন। বরিস জনসন ‘গেট ব্রেক্সিট ডান’ স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এলেও তার করা সীমিত বাণিজ্য চুক্তি দুই পক্ষের সম্পর্ককে দীর্ঘ সময়ের জন্য শীতল করে দেয়।
এরপর ঋষি সুনাক কিছুটা সম্পর্ক স্বাভাবিক করলেও বড় কোনো পরিবর্তন আনেননি। সর্বশেষ কিয়ার স্টারমারও সম্পর্ক ‘রিসেট’ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও ইইউর অভিন্ন বাজারে পুনরায় যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, কনজারভেটিভ পার্টিতে ইউরোপপন্থী অনেক নেতাকে কোণঠাসা করা হয়। অন্যদিকে লেবার পার্টিতেও ইইউর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কিংবা পুনরায় সদস্যপদ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে।
এর ফলে অনেক ভোটার বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির দিকে ঝুঁকেছেন। বিশেষ করে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী ‘রিফর্ম ইউকে’ বর্তমানে জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছে।
অর্থনীতি ও অভিবাসন বিতর্ক
ব্রেক্সিটের পর ব্রিটিশ অর্থনীতি প্রত্যাশিত গতি পায়নি। ব্যবসায়ীরা ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যে নতুন বাধার মুখে পড়েছেন। যদিও করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
অন্যদিকে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ব্রেক্সিটের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু বাস্তবে ব্রেক্সিটের পর অভিবাসন বরং বেড়ে যায় দেশটিতে। ২০২৩ সালে নিট অভিবাসন ৯ লাখ ছাড়িয়ে যায়, যদিও তা গত বছর কমে ১ লাখ ৭১ হাজারে নেমে এসেছে।
ব্রেগ্রেট’ বা ব্রেক্সিট-অনুশোচনা
সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, এখন ৫২ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক আবার ইইউতে যোগ দেওয়ার পক্ষে, যেখানে ৩৩ শতাংশ এর বিরোধী।
সম্প্রতি লন্ডনে ইউরোপীয় ইউনিয়নে পুনরায় যোগদানের দাবিতে একটি মিছিলও অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বিষয়টি এখনও রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর। ব্রিটেন পুনরায় ইইউতে ফিরতে চাইলে দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
এক দশক পরও ব্রেক্সিট ব্রিটেনের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজে গভীর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। অনেকের মতে, দেশটি এখনও সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের পূর্ণ মূল্য ও পরিণতির সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছে।


















