ভেনেজুয়েলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ২শ’
বিশ্বজুড়ে একদিনে তিন দেশে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে ভেনেজুয়েলায় ৭ দশমিক ৫ এবং ৭ দশমিক ২ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প, জাপানে ৬ দশমিক ৯ মাত্রার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ৫ দশমিক ৬ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে।
অল্প সময়ের ব্যবধানে ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাণহানির সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে, আহত হয়েছেন প্রায় এক হাজার মানুষ। ধসে পড়েছে অসংখ্য ভবন, ব্যাহত হয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ, আর আতঙ্কে ঘর ছেড়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিচ্ছেন হাজারো মানুষ। উদ্ধারকর্মীরা দিন-রাত কাজ করলেও ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও বহু মানুষ আটকে থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, শক্তিশালী এই ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত অন্তত প্রায় দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন প্রায় এক হাজার মানুষ। নিহত ও আহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, কারণ অনেক এলাকা এখনও পুরোপুরি উদ্ধার কার্যক্রমের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।
প্রধান ভূমিকম্পের পর থেকে দেশজুড়ে ২০টিরও বেশি আফটারশক অনুভূত হয়েছে। ফলে নতুন করে ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অনেক মানুষ নিরাপত্তার জন্য ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায়, খোলা মাঠে এবং অস্থায়ী তাঁবুতে রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। উদ্ধার সংস্থাগুলোও নাগরিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক এই ভূমিকম্প শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং দেশটির জন্য এক গভীর মানবিক সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে। শতাধিক প্রাণহানি, হাজারো মানুষের আহত হওয়া এবং ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি দেশটিকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছে। আফটারশকের আশঙ্কা এখনও কাটেনি, ফলে উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে। এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং দ্রুত পুনরুদ্ধার কার্যক্রম নিশ্চিত করা এখন ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে কারাকাস থেকে প্রায় ২৮৪ কিলোমিটার পশ্চিমে সান ফেলিপের কাছে ৭ দশমিক ২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে কারাকাস থেকে প্রায় ২৯৩ কিলোমিটার পশ্চিমে ইউমারের কাছে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি আঘাত হানে।
ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় ঝাঁকুনিটির উৎপত্তিস্থল ছিল ইউমারে থেকে ২৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব এবং ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে।
ভূমিকম্পকে ট্রুহিলো, কারাবাও, মিরান্ডা এবং লা গুয়াইরা রাজ্যসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এসব এলাকায় একের পর এক ভবন ধসে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতত্ত্ব জরিপ ও গবেষণা সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজারে পৌঁছানোর ৪৪ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে প্রাণহানি ১ লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ারও ৩০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে।
কারণ হিসেবে সংস্থাটি জানিয়েছে, যে এলাকায় ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে সেটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ওই এলাকার অনেক ভবন রিইনফোর্সড ইট এবং মাটির ব্লক দিয়ে তৈরি। ভূমিকম্পের তীব্রতার কারণে সেখানে ভবন ধ্বংস হওয়া এবং মৃত্যুর উচ্চ সম্ভাবনা রয়েছে।
এমতাবস্থায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ।
ডেলসি রদ্রিগেজ জানান, মাইকেতিয়ার সিমন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হওয়ার পর বিমানবন্দরটি বন্ধের এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এছাড়া, স্কুল ক্লাস বাতিল এবং মেট্রো ও রেলসেবা স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সব ধরনের অপ্রয়োজনীয় কার্যক্রমও বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জাপানের ভূমিকম্প বিষয়ে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, জাপানে আঘাত হানা ভূমিকম্পটির মাত্রা রিখটার স্কেলে ৬.৯। তবে কোনো ধরনের সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়নি।
এদিকে, জাপানের উত্তর-পূর্বে আঘাত হানা এই ভূমিকম্পে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
তবে দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি জরুরি দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য সরকারকে ‘ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জরুরিভাবে মূল্যায়ন’ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
মুখ্য মন্ত্রিসভা সচিব মিনোরু কিহারা বলেছেন, এই ভূমিকম্প থেকে সুনামির কোনো আশঙ্কা নেই। এই মুহূর্তে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, তবে আমরা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ মূল্যায়ন অব্যাহত রাখব। পারমাণবিক স্থাপনাগুলো থেকেও কোনো অস্বাভাবিকতার খবর পাওয়া যায়নি।
ভূমিকম্পটি কুজি থেকে ৩৫ কিলোমিটার (বা প্রায় ২১ মাইল) উত্তর-পূর্বে ৫১.৭ কিলোমিটার (বা প্রায় ৩২ মাইল) গভীরে আঘাত হানে।
ভূমিকম্পের পর জেআর ইস্ট নামে পরিচিত ইস্ট জাপান রেলওয়ে কোম্পানি, জাপানের মূল দ্বীপের উত্তর প্রান্ত শিন-আওমোরি এবং টোকিওর মধ্যে তাদের বুলেট ট্রেন পরিষেবা স্থগিত করেছে।
এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ায় বুধবার একটি মাঝারি ধরনের শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৫.৬।
সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরীয় সময় সকাল ৮টা ১০ মিনিটে ক্যালিফোর্নিয়ার রেডউড ভ্যালি থেকে প্রায় ৭ মাইল উত্তরে এই ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। উত্তরের ইউরেকা থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্বের স্যাক্রামেন্টো পর্যন্ত দূরবর্তী এলাকার মানুষও ভূমিকম্পের কম্পন অনুভব করেছেন বলে ইউএসজিএসকে জানিয়েছেন। উপকেন্দ্রের সবচেয়ে কাছে থাকা কিছু মানুষ এই কম্পনকে অত্যন্ত শক্তিশালী বলে বর্ণনা করেছেন।
ইউটিলিটি ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ‘পাওয়ারআউটেজ ডট কম’-এর তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পের পর মেন্ডোসিনো কাউন্টির প্রায় ৭ হাজার ৪০০ বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে।
উত্তর ক্যালিফোর্নিয়া এবং ওরেগন রাজ্যের মানুষের ফোনে ‘শেকঅ্যালার্ট’ থেকে বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়েছে। এটি ইউএসজিএসের একটি ব্যবস্থা, যা ভূমিকম্প শুরু হওয়া মাত্রই তা শনাক্ত করে এবং জনপ্রিয় ‘মাইশেক’ অ্যাপে তথ্য পাঠায়।
ইউসি বার্কলে সিসমোলজি ল্যাবের মাইশেক অ্যাপের ব্যবস্থাপক সুরেশ রমন বলেন, ‘এ ঘটনার জন্য মাইশেক অ্যাপটি পুরোপুরি কাজ করেছে এবং এটি খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষকে সতর্ক করেছে।’



















