ডেস্ক রিপোর্ট : দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল জঙ্গল সলিমপুর কার্যত একটি ‘নিষিদ্ধ এলাকায়’ পরিণত হয়েছিল। পাহাড়ি এই বিস্তীর্ণ এলাকায় রাষ্ট্রের আইন কার্যকর না হয়ে বরং আধিপত্য ছিল সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যুদের। তবে সম্প্রতি পরিচালিত যৌথ বাহিনীর একটি বড় অভিযানে সেই অন্ধকার অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে।
প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই)-এর সূক্ষ্ম গোয়েন্দা তথ্য ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই অভিযানে অংশ নেয় সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির প্রায় তিন হাজার সদস্য।
সোমবার (৯ মার্চ) ভোর থেকে শুরু হওয়া প্রায় ১০ ঘণ্টাব্যাপী ‘কর্ডন অ্যান্ড সার্চ’ অভিযানের মাধ্যমে জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর এলাকাকে সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্যেই পরিকল্পনার ভিত্তি
নিরাপত্তা সূত্র জানায়, প্রায় তিন হাজার একর দুর্গম পাহাড়ি এলাকাজুড়ে সন্ত্রাসীদের গোপন আস্তানা, অস্ত্র তৈরির কারখানা এবং গোপন পথসমূহের বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি করে ডিজিএফআই। দীর্ঘদিন গোপনে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে তারা ভূমিদস্যুদের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে।
গোয়েন্দা তথ্যে নিশ্চিত হওয়া যায় যে পাহাড়ের ভেতরে অবৈধ লেদ মেশিন ব্যবহার করে অস্ত্র তৈরির একটি কারখানাও পরিচালিত হচ্ছিল। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই সেনাবাহিনী অভিযানের কৌশলগত পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে।
অভিযানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার
অভিযান চলাকালে বাহিনীর সদস্যদের বিভিন্ন কৌশলগত দলে ভাগ করে পুরো পাহাড়ি এলাকা ঘিরে ফেলা হয়। আকাশপথে নজরদারির জন্য ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় এবং পাহাড়ের গহীনে লুকানো অস্ত্র ও গোলাবারুদ খুঁজে বের করতে বিশেষ প্রশিক্ষিত ডগ স্কোয়াড মোতায়েন করা হয়।
বড় ধরনের অস্ত্র উদ্ধার
অভিযানে তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধার করা হয়েছে—
২৭টি পাইপগান
২টি পিস্তল
১১টি ককটেল
এক হাজারের বেশি রাউন্ড গুলি
অস্ত্র তৈরির লেদ মেশিনসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম
নিরাপত্তা বাহিনীর মতে, গত জানুয়ারিতে র্যাব সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনার পর এলাকাটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল। তবে সাম্প্রতিক এই অভিযানের মাধ্যমে পুরো অঞ্চল এখন নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে এসেছে। একই সঙ্গে প্রায় তিন হাজার একর অবৈধভাবে দখল করা জমিও ভূমিদস্যুদের হাত থেকে মুক্ত করা হয়েছে।
স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিতের উদ্যোগ
অভিযানের পর বর্তমানে এলাকায় সেনাবাহিনী, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মোবাইল টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মুক্ত হওয়া জমিতে সরকারি অবকাঠামো ও ভূমি অফিস স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, জঙ্গল সলিমপুরের এই অভিযান শুধু একটি আইনশৃঙ্খলা অভিযান নয়, বরং রাষ্ট্রের সার্বভৌম কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সন্ত্রাস, অবৈধ দখল ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির অংশ হিসেবেই ভবিষ্যতেও এমন অভিযান অব্যাহত থাকবে।














