দর্পণ ডেস্ক
স্কটল্যান্ডের মূলধারার রাজনীতিতে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও কমিউনিটি নেত্রী সিলেটের আফিফা খানম। প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে আগামী মে মাসে অনুষ্ঠিতব্য স্কটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচনে লেবার পার্টির প্রার্থী (এমএসপি) মনোনীত হয়েছেন তিনি। বিভাগীয় ভ্রমণ গাইড
মিড ফাইফ ও গ্লেনরথিস আসন থেকে তার এই প্রার্থিতা স্কটল্যান্ডে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য এক মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আফিফা খানম পেশায় একজন শিক্ষক। তিনি গ্লেনরথিস হাইস্কুলের সাবেক প্রিন্সিপাল টিচার এবং অকটার্ডার কমিউনিটি স্কুলের ডেপুটি হেডটিচার ও বিজনেস ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব¡ পালন করেছেন।
আফিফা সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়নের বারকোট এলাকার আব্দুল কুদ্দুছের মেয়ে। আবদুল কুদ্দুছ ছিলেন সহকারী পোস্টমাস্টার জেনারেল ও মা সৈয়দা নেহার বেগম গৃহিণী। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তার শিক্ষা জীবন শুরু নিজ এলাকায় অবস্থিত বারকোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ঢাকাদক্ষিণ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পড়াশোনা শেষ করে তিনি ১৯৮২ সালে বিবাহসূত্রে স্কটল্যান্ডে পাড়ি জমান।
জানা যায়, তিন কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জননী আফিফা খানম প্রবাসে যাওয়ার পর বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে পুনরায় তিনি শিক্ষা জীবন শুরু করেন স্থানীয় কাউন্সিলের ESOL ক্লাসের মাধ্যমে। পরে ক্ল্যাকম্যান কলেজে অধ্যয়ন শেষে ইউনিভার্সিটি অব স্টার্লিং থেকে স্নাতক ডিগ্রি এবং একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এডুকেশনাল লিডারশিপে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন।
এছাড়া স্কুটিশ কোয়ালিফিকেশন অথরিটি থেকে উচ্চতর হেডচিপ অ্যাওয়ার্ড ও অ্যাডাল্ট লার্নার অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন।
গ্লেনরথিস হাইস্কুলে প্রিন্সিপাল টিচার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা উচ্চশিক্ষিতা ও প্রগতিশীল এই নারীর আন্তর্জাতিক শিক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। ব্রিটিশ কাউন্সিলের কানেক্টিং ক্লাসরুম প্রকল্পের মাধ্যমে স্কটল্যান্ড ও বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে শিক্ষা বিনিময় ও সহযোগিতা গড়ে তুলতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
বিগত এক দশকের বেশি সময় থেকে স্কটিশ শিক্ষকদের সংগঠন ট্রেড ইউনিয়ন ‘এনএএসইউডব্লিওটি, ওয়ার্কপ্লেস, হেলথ অ্যান্ড সেফটি অফিসার ও ইকুয়ালিটি’ অফিসার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। পেশাগত ও সামাজিক ক্ষেত্রে অবদানের জন্য তাকে স্কুটিশ পার্লামেন্টে স্কুটিশ পাবলিক সার্ভিস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড পদক প্রদান করা হয়।
সম্প্রতি তিনি প্রবাসে নারীদের অনুপ্রেরণামূলক ভূমিকার জন্য সিলেট জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘প্রবাসী সম্মাননা অ্যাওয়ার্ডে’ ভূষিত হন। মিড ফাইফ ও গ্লেনরথিস লেবার পাটির সি এল পি কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা উচ্চশিক্ষিতা ও প্রগতিশীল এই নারী স্কটল্যান্ডে আগামী মে মাসে অনুষ্ঠিতব্য স্কটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচনে এমএসপি প্রার্থী হিসেবে লেবার পার্টি থেকে মিড ফাইফ ও গ্লেনরথিস আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
স্কটল্যান্ড পার্লামেন্টে নির্বাচন করায় স্কটল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করা প্রবাসী ও বাংলাদেশি জনগণের মধ্যে ব্যাপক আনন্দ বিরাজ করছে।
শিক্ষকতার পাশাপাশি মানবাধিকার, কমিউনিটি উন্নয়ন ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়ভাবে ভূমিকা রেখে চলেছেন। নারীর অধিকার নিশ্চিতকরণে তিনি স্কটল্যান্ডে ইন্টারন্যাশনাল উইমেন গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১৮ সাল থেকে গ্লেনরথিসভিত্তিক চ্যারিটি প্রতিষ্ঠান ‘লেইটার লাইফ চয়েসের’ বোর্ড পরিচালক এবং এক দশকের বেশি সময় থেকে স্কটিশ শিক্ষকদের ট্রেড ইউনিয়ন NASUWT– এবং স্কটিশ ট্রেড ইউনিয়ন কাউন্সিলের ব্ল্যাক ওয়ার্কার কমিটির সঙ্গে যুক্ত থেকে কাজ করে যাচ্ছেন। এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে তার নির্বাচনী আসন স্কটল্যান্ডের মিড ফাইফ ও গ্লেনরথিস এলাকায় ব্যাপক সুপরিচিত লাভ করেছেন।
আফিফা খানম বলেন, এমএসপি নির্বাচিত হলে তার পাঁচ বছরের মেয়াদে তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়ন, দারিদ্র্য দূরীকরণ, জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলা, পরিবহন ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং স্থানীয় অবকাঠামো শক্তিশালী করার বিষয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করবেন।
৩০ বছরের শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিটি শিশুর মানসম্মত শিক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে, এবং সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি আন্তরিকভাবে কাজ করতে চান। একই সঙ্গে তিনি স্কটল্যান্ডের শ্রমবাজারে জনশক্তির ঘাটতি পূরণ এবং প্রয়োজনীয় অভিবাসন নীতির বিষয়েও কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, জনগণের সমর্থন ও সহযোগিতা থাকলে একটি শক্তিশালী, ন্যায়ভিত্তিক এবং সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। এজন্য তিনি তার নির্বাচনী এলাকার ভোটারসহ সবার সহযোগিতা ও সমর্থন কামনা করেন।
এদিকে প্রথমবারের মতো আফিফা খানমের এই অগ্রযাত্রাকে শুধু ব্যক্তিগত অর্জন বলা যাবে না, এটি সবার জন্য গৌরবের এবং বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য অনুপ্রেরণার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। অধ্যবসায় এবং স্বপ্নের শক্তি থাকলে সাফল্যের চরম শিখরে পৌঁছা যায় বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্টজনরা।
উল্লেখ্য মিড ফাইফ ও গ্লেনরথিস নিয়ে গঠিত এই আসনে ৫৫ হাজার ভোটার রয়েছেন। এই আসনে ৭ মে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আফিফা খানমসহ ৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দিতা করছেন।











